রবিবারে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলিতে সাত দিন ব্যাপী সফর শুরু করতে চলেছেন – ভারত ও পাকিস্তানে. প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে চিনের সামাজিক বিজ্ঞান একাডেমী থেকে “নীল বই” প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের আভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে. লেখকরা এখানে চেষ্টা করেছেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমস্যা গুলিকে নরম করতে. প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং নিজে বেজিংয়ে আসা ভারতীয় যুব প্রতিনিধি দলের সামনে বক্তৃতা করতে গিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, ভারত ও চিনের উচিত্ “একে অপরের করমর্দন করে” এশিয়াকে “বিশ্ব অর্থনীতির এঞ্জিন” তৈরী করা. সুতরাং সম্পর্ক ভাল করার ইচ্ছা দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে. শুধু প্রশ্ন হল যে, এই ধরনের শুভেচ্ছা কবে কাজে পরিণত হবে আর কি ভাবে এটাকে আঞ্চলিক ও বিশ্বের ক্রীড়নকরা গ্রহণ করবে.

ইউনানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ভারত নিয়ে লেখা “নীল বইতে” উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতের প্রশাসন বর্তমানে খুবই বড় সঙ্কটের সম্মুখীণ তবুও ঠিক তার পরেই আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে ভারত খুব শীঘ্রই এই ধরনের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে ও ফলে আরও শক্তিশালী হবে. তার ওপরে, এই বইয়ের লেখকরা বাস্তবে হয় নীরব থেকে অথবা সবচেয়ে বেশী করে নরম করার চেষ্টা করেছেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তীক্ষ্ণ বিষয় গুলিকে – তাতে শুধু আলতো করে বলা হয়েছে চিনের পক্ষ থেকে পুরনো দাবীর কথা – ভারতের অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে, যেটাকে চিনারা নিজেদের “দক্ষিণ তিব্বত” বলে মনে করে. এই বই প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদের চিন সফরের সময়ে এক সপ্তাহ আগে.

এই বইয়ের এক লেখিকা মা জিয়ালি ভারতের “টাইমস অফ ইন্ডিয়া” পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সব মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁদের কাজ ছিল “চিনের পাঠকদের কাজকর্মের প্রবাহের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, কোন ভাবেই নেতিবাচক আবেগের উদ্রেক করা নয়”.

একই ধরনের সুরে বুধবারে চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং প্রায় ১০০ জনেরও বেশী লোকের ভারতীয় যুব প্রতিনিধি দলের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে কথা বলেছেন. তিনিও ২৭ বছর আগে নিজের অল্প বয়সে ভারত ভ্রমণের কথা তুলেছেন ও দুই পক্ষই এবারে হাত বাড়িয়ে ধরতে বলেছেন যাতে একই সঙ্গে এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতি করে বিশ্বের এই অংশকে অন্য অংশের জন্য একটা চালিকা শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হয়. সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে, সুপ্রতিবেশী ও মিত্র সুলভ সম্পর্ক তৈরী করার ইচ্ছা অন্তত রাজনৈতিক ঘোষণার স্তরে রয়েছে. কিন্তু এক সারি বাস্তব বিষয়, তা যেমন দ্বিপাক্ষিক ক্ষেত্রে, তেমনই বহু পাক্ষিক ক্ষেত্রে রয়েছে, যা আমাদের বলতে বাধ্য করে যে, চিন ও ভারতের কাছাকাছি আসার সম্ভবনা ততটা রঙীণ দেখাচ্ছে না, যতটা রাজনীতিবিদরা দেখাতে চাইছেন. রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক ইনস্টিটিউটের এক বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি এই বিষয়ে তাঁর মন্তব্য যোগ করে বলেছেন:

“সীমান্ত সংক্রান্ত ঘটনা, যা সদ্য লাদাখ এলাকায় ঘটেছে, তা আপাততঃ কোন রকমের রক্তক্ষয় না করে ভাল ভাবেই শেষ হলেও তার স্মৃতি অটুট রয়েছে. তার ওপরে ভারতেও কোন কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গী নেই যে, কি ধরনের পররাষ্ট্র নীতি দেশের জন্য সবচেয়ে গ্রহণ যোগ্য হবে. যথেষ্ট প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা, যারা প্রমাণ করতে চাইছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই ভারতের উচিত্ হবে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা বাড়ানোর, তারা এই নৈকট্য সহ্য করতে পারছেন না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এটা চায় না ও নিজেদের আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকা সমস্ত পথই তারা নেবে ভারত ও চিনকে ঘনিষ্ঠ না হতে দেওয়ার জন্য”.

তার ওপরে খুবই স্পষ্ট নয় যে, ভারতে আগামী লোকসভা নির্বাচনের পরে কি ধরনের রাজনৈতিক নীতি বেশী গুরুত্ব পাবে, যা আগামী বসন্তেই হওয়ার কথা. আর এমনও তো হতে পারে যে, যা এখন এই “নীল বইতে” লেখা রয়েছে, সেটাকেই তখন ভারতের নতুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো হয়েছে বলে দেখা হতে পারে?

আবার লি কেকিয়াংয়ের এই সফরের মধ্যেও এমন ভাবে ঘটনা পরম্পরা তৈরী করা হচ্ছে, যা ভারতেই অনেকের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে তাঁর ঘোষণা গুলিকে নিয়ে, এই রকম মনে করেছেন ভলখোনস্কি. ভারতের পরেই প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন পাকিস্তানে, আর তার মানে হল যে, “সমস্ত ঋতুতেই বন্ধুত্বের” অভ্যাস যা বেজিং ও ইসলামাবাদের মধ্যে রয়েছে, তা আবার নতুন করে গতি পাবে.

কোন রকমের সন্দেহ নেই যে, ভারত ও চিনের মধ্যে পারস্পরিক ভাবে লাভজনক সহযোগিতা ও সহকর্মী হওয়াতে শুধু এই দুটি দেশেরই ভাল হবে না, বরং সমস্ত এশিয়ারই তাতে লাভ. কিন্তু এই ধরনের ইচ্ছাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ঘোষণা দিলেই চলবে না.