মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মস্কো শহরের দূতাবাসের তৃতীয় সেক্রেটারি রায়ান ক্রিস্টোফার ফগল কেন ধরা পড়ল তা নিয়ে কোন মন্তব্য সরকারি ভাবে প্রকাশ করা হয় নি, যদিও রাষ্ট্রদূত ম্যাকফল আজ রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরে প্রায় এক ঘন্টা সময় ছিলেন ও সাংবাদিকদের কোন রকমের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই শুধু নিজের লিমুজিন গাড়ী থেকে সাংবাদিকদের দিকে হাত নেড়ে চলে গিয়েছেন. গণতান্ত্রিক ও প্রকাশ্য রাজনীতির সাধক মার্কিন প্রশাসন আর তাঁদের রুশ দেশে মুক্তির বাণী বিতরণে সিদ্ধহস্ত প্রফেসর ম্যাকফলের কাছ থেকে এমনকি খোদ মার্কিন সাংবাদিকরাও এই রকমের অবজ্ঞা আশা করতে পারেন নি. যদিও সাংবাদিকদের কাছে কিছু বলতে তিনি আইনত বাধ্য নন, যেমন আগেও ছিলেন না মস্কোতে হওয়া বিরোধী মিছিল ইত্যাদি বিষয়ে. আপাততঃ মার্কিন মুলুক ও তাদের ভারত সহ অন্যান্য দেশের সংবাদ মাধ্যমে খুবই কম শোরগোল তোলা হচ্ছে এই বিষয় নিয়ে.

রাশিয়ার গুপ্তচর প্রতিরোধ সংস্থার কর্মীরা রায়ানকে গ্রেপ্তার করেছে, যখন সে চেষ্টা করেছিল এক রুশ গোয়েন্দা বাহিনীর লোককে আমেরিকার পক্ষে কাজ করার জন্য দলে টানতে চেয়েছিল. এই তৃতীয় সেক্রেটারির কাছে পাওয়া গিয়েছে রেকর্ড করার যন্ত্রপাতি, পরচুলা, বড় নোটে অনেক ইউরো ও সম্ভাব্য গুপ্তচরের জন্য নির্দেশ. বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সাংবাদিক রমান মামোনভ.

খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্য জ্বলে ওঠা আরও একটি গুপ্তচর সংক্রান্ত স্ক্যান্ডাল নিয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছে যেমন হোয়াইট হাউস থেকে, তেমনই পররাষ্ট্র মন্ত্রক ও সিআইএ থেকেও. শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রকে স্বীকার করা হয়েছে যে, রায়ান ক্রিস্টোফার ফগল মস্কো রাষ্ট্রদূতাবাসের কর্মী.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই পুরো ঘটনাই খুব কম আলোকপাত করা হচ্ছে. তার মধ্যে যাঁরা বিশেষজ্ঞ, তাঁদের সাংবাদিকরা সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করতে শুরু করেছিলেন, আর তাঁরা নিজেদের মূল্যায়নে একে অপরের সঙ্গে মেলে না এমন সব কথা বলেছেন. ঠিক এই দিন গুলিতেই মস্কো ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা কার্যকরী ভাবে শুরু হয়েছিল সন্ত্রাসের মোকাবিলা নিয়ে, বিশেষ করে বস্টন বিস্ফোরণের পরেই, কাজ শুরু হয়েছিল সিরিয়া সংক্রান্ত সম্মেলন নিয়ে, বারাক ওবামা ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে তাঁর বার্তার উত্তর অপেক্ষা করছেন, আর সবে মাত্র গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি সোচী শহরে রুশ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন.

আর এবারে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বিষয়টাই আবার একটা বিপদের সামনে পড়তে চলেছে স্রেফ একটা একেবারেই ফালতু ব্যাপারের জন্য, মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার পক্ষ থেকে রুশ গুপ্তচরকে দলে টানার চেষ্টা দিয়ে. এই ব্যাপারে রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা দ্য অ্যানসার কোয়ালিশনের প্রতিনিধি ব্রায়ান বেকার মন্তব্য করে বলেছেন:

“প্রত্যেক দেশই একে অপরের উপরে গোয়েন্দাগিরি করে থাকে. কিন্তু রাশিয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এটা বেশী করেই রাজনীতির প্রশ্ন, যত না শিল্প বা সামরিক কাজকর্ম সংক্রান্ত গুপ্তচর বৃত্তি. দেখাই যাচ্ছে যে, আমেরিকার লোকরা চাইছে রাশিয়ার মন্ত্রীসভায় দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করার. আর তার কারণ হল যে, পুতিন ও রাশিয়ার প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রশ্নে মার্কিন দৃষ্টিকোণ মানতে চাইছেন না. আর সেই কারণে নিয়মিত ভাবে পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক পরস্পর বিরোধ চলছে, যার উদাহরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি নিকট প্রাচ্যে. আর সেই বাস্তব ঘটনা যে, রাশিয়ার প্রশাসন এই ঘটনা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে, তার থেকে বোঝা যায় যে, মস্কো সেই সমস্ত ছায়া যুদ্ধের পদ্ধতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে”.

আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা, যাঁদের রেডিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁরাও স্বীকার করেছেন যে, দূতাবাসের কর্মীর কাজকর্ম, যিনি আবার একাধারে সিআইএ সংস্থার কর্মীও বটে, খুব কম করে হলেও আশ্চর্য বলে মনে হতে পারে. এই সমস্ত পরচুলা, কালো চশমা, বড় সাইজের যন্ত্রপাতি, নগদ অর্থ, আর একেবারেই অর্থহীণ নির্দেশ, ব কিছুই. তাছাড়া বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে. ফগল – বিগত দশক গুলির মধ্যে আমেরিকার প্রথম কূটনীতিবিদ, যাঁকে গুপ্তচর বৃত্তির জন্য ধরা হয়েছে আর তার ধরা পড়া ও নাম ধান সবই প্রকাশ করে দেওয়া হয়েছে, সাধারণতঃ এই সব কাজ করা হয়ে থাকে আড়ালে, আর এটাকে তাই বলা যেতে পারে আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর একটা বড় রকমের বিফল হওয়া.

রায়ানকে গতকালই অননুমত ব্যক্তি বলে ঘোষণা করা হয়েছে ও তাকে আসন্ন সময়ের মধ্যেই মস্কো থেকে চলে যেতে হবে.

আমেরিকার পক্ষ থেকে এর প্রত্যুত্তর হতে পারে ওয়াশিংটন থেকে কোনও রুশ কূটনীতিবিদকে তাড়িয়ে দেওয়া দিয়ে. আবার কোনও উত্তর নাও দেওয়া হতে পারে. ফগলের বিরুদ্ধে প্রামাণ্য খুবই প্রকট ও দেখাই যাচ্ছে যে, সে এখানে কাজ করতে চেয়েছে একেবারেই হঠকারীর মতো. কিছু বিশেষজ্ঞ এমনকি মনে করেন যে, যুবক ফগলকে আমেরিকার লোকরাই ইচ্ছে করে ফাঁসিয়েছে. লক্ষ্য – রাশিয়ার গুপ্তচর বাহিনীকে পরীক্ষা করে দেখা, যাতে তারা কোন একটা প্রত্যুত্তর বিষয়ে কাজ করে ফেলে আর তা দিয়ে একটা গুপ্তচর সংক্রান্ত স্ক্যান্ডাল তৈরী করা যায়. যাতে দুই দেশের মধ্যে ভাল হতে যাওয়া সম্পর্কে আবারও ছেদ আসে.

রাশিয়ার রাজনীতিবিদ বরিস মেঝুয়েভ বিশ্বাস করেন না যে, এই গুপ্তচর নিয়ে ঘটনা কোনও একটা স্ক্যান্ডালে পরিণত হবে, যা মস্কো ও ওয়াশিংটনের মদ্যে আগেও বহুবার ঘটেছে. তাই তিনি বলেছেন:

“এখন একেবারেই অন্য রকমের একটা সময়. এখন এমন একটা অনুভূতি রয়েছে যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক নানা রকমের পাশাপাশি চলা একে অপরকে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে সমান্তরাল ভাবেই হচ্ছে. অর্থাত্ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এটা একটা ব্যাপার – আর নানা রকমের স্ক্যান্ডাল, তার মধ্যে আবার এই গুপ্তচর সংক্রান্ত স্ক্যান্ডালও - একেবারেই অন্য বিষয়. বিশ্বে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে কোন পক্ষেরই, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া কারোরই ইচ্ছা নেই প্রচণ্ড কঠোর মনোভাব দেখানোর”.

অন্য এক রুশ বিশেষজ্ঞ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক পাভেল জোলোতারিয়েভ এক প্যারাডক্স বলে উল্লেখ করা যেতে পারে এমন ধারণা সেই বিষয় নিয়ে বলেছেন, যে এই ঘটনা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে ঠাণ্ডা যুদ্ধের উত্তরাধিকার থেকে উদ্ধার পেতে. এখন সময় এসেছে এই ধরনের ঘটনাকে শান্ত ভাবে নেওয়ার. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া আপাততঃ স্রেফ সহকর্মী, আর তারা জোটবদ্ধ নয় ও দুই পক্ষই ভবিষ্যতেও এই সব কাজ কারবার করবে, তাই তিনি বলেছেন:

“অন্য ব্যাপার হল যে, উচ্চপদস্থ নেতাদের এই ঘটনা ভাবতে বাধ্য করবে. তাদের ভাবতে বাধ্য করবে যে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে এবারে সময় হয়েছে অন্য রকম করে তৈরী করার. যাতে ঠাণ্ডা যুদ্ধের পরে চলা প্রক্রিয়া বন্ধ হয় ও আমরা যেন একে অপরকে শুধু প্রতিপক্ষ বলেই না ভাবি. একে অপরকে আটকে রাখার পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া দরকার, তার মধ্যে পারমানবিক ক্ষেত্রেও. এই ঘটনা যে দুই রাষ্ট্রপতির মধ্যে সাক্ষাত্কারের একমাস আগে ঘটেছে, তা এবারে একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিতে পারে সম্পর্কের বিষয়ে অন্য রকম হওয়ার”.

জানা রয়েছে যে, ১৭-১৮ই জুন উত্তর আয়ারল্যান্ডে বৃহত্ অষ্ট দেশের শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বারাক ওবামা দেখা করবেন. তারপরে আবার তারা সেন্ট পিটার্সবার্গে জি -২০ দেশ সমূহের শীর্ষ বৈঠকে দেখা করবেন.