চুমার এলাকার উঁচু পাহাড়ী সীমান্ত অঞ্চলে তিন সপ্তাহ ধরে চিন ও ভারতের সেনাবাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার পরে রক্তক্ষয় ছাড়াই বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে দুই দেশের সেনা প্রত্যাহার করা দিয়ে শেষ হয়েছে. এই সমঝোতা হওয়ার কারণ হয়েছে সম্ভবতঃ মে মাসে চিনের রাষ্ট্রীয় সভার প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এর সফর, যা নিয়ে যেমন বেজিংয়ে, তেমনই দিল্লীতেও আশা করা হয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভাল হওয়া নিয়ে. যদিও আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরেই দুই পক্ষ থেকেই বলা হবে যে, এই ঘটনা শেষ হয়েছে, তবুও বরং উল্টো ভাবেই এটা দুই দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য ভবিষ্যত পরিকল্পনার কারণে খুবই সংজ্ঞাবহ পরিণতি নিয়ে আসবে, - এই রকম মনে করে স্ট্র্যাটেজি ও টেকনলজি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ ভাসিলি কাশিন বলেছেন:

“বিগত দশক গুলি ধরেই হিমালয় এলাকায় শক্তির ভারসাম্য খুবই গুরুতর ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে. চিন নিজেদের সামরিক শক্তিকে এই অঞ্চলে খুবই প্রসারিত ভাবে নতুন করে সমৃদ্ধ করেছে এবং সামরিক কারণে ও দুই ভাবেই ব্যবহার যোগ্য পরিকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে.

ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে এই কারণে যে, ১৯৬২ সালের যুদ্ধের ফলাফল অনুযায়ী চিনের লোকদের হাতে চলে গিয়েছে স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতা গুলি আর সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ী গিরিপথ গুলিও. ভারতের পদাতিক বাহিনীর জন্য যুদ্ধের কাজকর্ম শুরু হলে সীমান্ত এলাকা থেকে অনেকখানি সরে আসাই হবে একমাত্র বের হওয়ার পথ. ভারতের সঙ্গে সংলগ্ন চিনের চেন্দু সামরিক বাহিনীর সৈন্যরা বিগত সময়ে অনেক আধুনিক অস্ত্র পেয়েছে, তার মধ্যে নতুন ধরনের ট্যাঙ্ক, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নতুন ধরনের লেসার লক্ষ্য নির্ণয় ব্যবস্থা সমেত কামানের গোলা.

গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের আভ্যন্তরীণ বাহিনীকে যোগ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে এই এলাকায় সৈন্য সংখ্যা বহুলাংশে বৃদ্ধি করা নিয়েও অনেক গুলি মহড়া ও সফল পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে. কিছু মহড়ার সময়ে অসামরিক বিমান বাহিনীর থেকে নেওয়া বিমান ব্যবহার করে দেখা হয়েছে, যেগুলি পাহাড়ী এলাকার বিমানবন্দরে সফল ভাবেই সামরিক মালপত্র পৌঁছে দিতে পেরেছে, তার মধ্যে বিতর্কিত অক্ষয় চিন উপত্যকাও রয়েছে. ঝিনান সামরিক ঘাঁটি থেকে আসা পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরাও সফল ভাবে দেখিয়ে দিতে পেরেছে তাদের ক্ষমতা, যারা পূর্ব চিনে সাধারণতঃ কাজ করে, আর তারা দেখিয়েছে, পৌঁছনোর ৭২ ঘন্টা পরেই উঁচু পাহাড়ী এলাকায় সামরিক কাজ কারবার তারা করতে সক্ষম.

চিন যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করেছে যাতে তাদের বিমান বাহিনী হিমালয়ের পাহাড়ী এলাকায় যুদ্ধ করার মতো প্রস্তুতি পেতে পারে. চিনের বিমান বাহিনীর জন্য তৈরী নতুন যুদ্ধ বিমান জে – ১০ ও জে- ১১ এই ধরনের কাজের জন্য প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে.

ভারত নিজেদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছে নিজেদের সীমান্ত বরাবর শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করার. এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক পরিবহনের বিমান সি- ১৭ কেনা হয়েছে, যেগুলি ওঠা নামার জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষমতা রাখে. বিগত বছর গুলিতে ভারত চিনের সঙ্গে পাহাড়ী সীমান্ত এলাকায় নিজেদের পরিকাঠামো তৈরী করার বিষয়েও মন দিয়েছে, মে মাসের শুরুতে সেখানে আরও সম্মিলিত ভাবে ৮০৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৭টি নতুন রাস্তা তৈরী করা হচ্ছে. পাহাড়ী এলাকায় কাজের দরকারে বিমান বাহিনীর জন্যও যুদ্ধের প্রযুক্তি কেনা বাড়ানো হচ্ছে.

কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই ভারতের শক্তি প্রয়োগ হয়ে দাঁড়াচ্ছে দেরীতে করা. ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াকে করে দেয় খুবই কম বাস্তব সম্মত. বিখ্যাত ভারত থেকে করা বিশ্বজোড়া টেন্ডার, যা ১২৬টি নতুন বহুমুখী ফাইটার এরোপ্লেন ক্রয়ের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল, তা এই ধরনের বিষয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে. এই টেন্ডারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল সেই ২০০১ সালে, তা স্বত্ত্বেও বাণিজ্যিক চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয় নি, যদিও ২০১১ সালে ফরাসী রাফালে যুদ্ধ বিমানকে এই টেন্ডারে জয়ী বলে ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে.

যত দিনে ভারত এই টেন্ডার তৈরী করেছে, চিনের সামরিক বাহিনী দুটি ধরনের জে – ১১ বি ও জে -১০ আধুনিক যুদ্ধ বিমান সামরিক বাহিনীতে গ্রহণ করে বহু পরিমানে তৈরী করা শুরু করে দিয়েছে, আর তারই সঙ্গে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমানের দুটি উদাহরণ তৈরী করে দেখাতে পেরেছে. ভারতের পক্ষ থেকে এই বহুমুখী যুদ্ধ বিমান নিয়ে টেন্ডারের সময়ের মধ্যে চিনের সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ইতিহাসে এক যুগান্তর ঘটা সম্ভব হয়েছে.

সীমান্তে পারস্পরিক বিরোধের ঘটনা, যা মাত্র কয়েক দিন আগেই শেষ হয়েছে, তা ভারতের রাজনীতিবিদদের নীতিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বেশী ফলপ্রসূ করার জন্য চিন্তা করতে বাধ্য করবে”.