পাকিস্তান নিজের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পার হয়েছে. ১১ইমে তে হওয়া দেশ জোড়া নির্বাচন পথ খুলে ধরেছে এক অসামরিক প্রশাসনের হাত থেকে অন্য এক অসামরিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চলেছে. কোন রকমের চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবারে হয় নি. নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ দল প্রামাণ্য বিজয় লাভ করেছে. নির্বাচকরা ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পাকিস্তান যারা চায় সেই সমস্ত শক্তিকেই নিজেদের ভোট দিয়েছে, তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কোন রকমের চরমপন্থী ইসলাম তাঁদের কাম্য নয়, সামরিক শাসনও নয়, এই রকম মনে করে আমাদের পর্যবেক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পাকিস্তানের চারটি প্রদেশে গত শনিবারে হয়ে যাওয়া জাতীয় সভা ও বিধানসভা নির্বাচন বহু অর্থেই এক সংজ্ঞাবহ ঘটনা হয়েছে, যদি তা ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ নাও করা হয়, আর এখানে ব্যাপার এই রকমের নয় যে, এটা দেশের ইতিহাসে প্রথম ঘটল, যখন গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত এক সরকার নিজেদের পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত প্রশাসনে ছিল ও তারপরে স্বাধীন নির্বাচনের ব্যবস্থাও করেছে, যার ফলে একটি সামরিক প্রশাসন অন্য একটি প্রশাসনকে গদি ছেড়ে দিয়েছে”.

এই ধরনের উত্তেজনা পূর্ণ ও খুবই নাটকীয় নির্বাচন, যা ২০১৩ সালে হয়ে গেল, তা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার শুধু পরীক্ষাই হয় নি, যা ঐতিহাসিক হিসাবে এই কদিন আগেও সামরিক উর্দি পরেই ছিল, বরং এই নির্বাচন বহু লক্ষ নির্বাচকের জন্যই হয়েছে গণতন্ত্র নিয়ে এক কঠিন পরীক্ষা. কারণ নির্বাচন পূর্ব জন সমাবেশে অংশ নিয়ে অথবা সেই ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে গিয়ে তাঁরা নিজেদের কাছে মূল্যায়ণ না করে পারেন নি যে, রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাঁদের জীবনের মূল্য দিয়ে শোধ করতে হতে পারে.

এই নির্বাচন পাকিস্তানে সবচেয়ে রক্তাক্তও হয়েছে. কারণ এই নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান দল হুমকি দিয়েছিল যে, যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের হত্যা করা হবে. নিজেদের প্রধান শত্রু হিসাবে তালিবরা দেশের নেতৃস্থানীয় শক্তিকেই উল্লেখ করেছিল, যারা ধর্ম নিরপেক্ষ মতাদর্শে বিশ্বাসী. তাই তোমিন যোগ করে বলেছেন:

“এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়েছে যে, চরমপন্থী ঐস্লামিকেরা যারা লক্ষ্যণীয় ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, তারা দেশকে সেই মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি, যা তারা সবচেয়ে বেশী করে উঠতে পেরেছে, তা হল একটা সন্ত্রাসের প্রচার করতে পেরেছে, যাতে খালি ছিল হুমকি ও ভয় দেখানো – আর করাচী সহ অনেক জায়গায় ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে ভোট নিতে দেওয়া হয় নি. দেশের এই একটি অন্যতম বড় শহরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য ভোটের দিনে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয়ে ঘোষণা করেছে যে, চল্লিশটি কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে. সব মিলিয়ে তালিবরা সন্ত্রাসের যে কাজ কারবার শুরু করেছিল, তার থেকে একটা উল্টো ফলই দেখতে পাওয়া গিয়েছে: এই বারে ভোট দিতেও এসেছেন রেকর্ড সংখ্যক নির্বাচক”.

যদিও ভোটের ফল কোনও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিণত হয় নি, তবুও কিছু চমক ভোটে হয়েছে. পাকিস্তানের পিপলস্ পার্টি খুবই বড় রকমের পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে ও এবারে তারা বিরোধী পক্ষে যেতে বাধ্য হবে. ইমরান খানের দলও প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ক্রমে নিজেদের জন্য আগে ভাবতে না পারা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হতে পেরেছে, যার ফলে তারা ভবিষ্যতের জন্য এক ওজনদার অবস্থান নিতে পেরেছে. চমক হিসাবে সেই বাস্তবকেও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইমরান খানের দল খাইবার পাখতুনভা প্রদেশে বিধানসভায় সবচেয়ে বেশী আসন পেয়েছে, তাই তোমিন বলেছেন:

“এবারে প্রধান প্রশ্ন হল – প্রধানমন্ত্রীর পদ নিতে উদ্যত নওয়াজ শরীফের কাছ থেকে কি অপেক্ষা করা যেতে পারে, যার জন্য এবারে দ্বিতীয়, আর সঠিকভাবে বললে তৃতীয়বার রাজনৈতিক যৌবনের সঞ্চার হয়েছে. নিজের প্রাথমিক কর্তব্য হিসাবে নওয়াজ শরীফ ঘোষণা করেছেন দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উদ্ধার ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক সঠিক করা. তাঁর এখন একটা ক্ষুরের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হবে, একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঝগড়ায় না জড়ানো, আর অন্য দিকে - ভোটারদের আশা পূরণ, যাঁরা নতুন প্রশাসনের কাছ থেকে চেয়েছেন এমন রাজনীতি, যা বিগত বছর গুলিতে দেশকে বাধ্য হয়ে নত হয়ে থাকা থেকে উদ্ধার হতে দেখতে চেয়েছেন”.

আরও একটি তীক্ষ্ণ সমস্যা, যা নতুন প্রশাসনকে সমাধান করতে হবে, তা হল পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা. আজ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ চালাচ্ছে ঐস্লামিকেরা. কি করে এই সব চরমপন্থীদের শায়েস্তা করা যেতে পারে? আর কি করে আবারও সেই সমস্ত সামরিক জেনারেলদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে না পড়া যা, যাঁদের একজন সেই পারভেজ মুশারফ – যিনি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন.

ভোটের জয় নিয়ে উত্তেজনা খুব শীঘ্রই ফুরিয়ে যাবে, আর এই সমস্ত প্রশ্নই নওয়াজ শরীফের সামনে সম্পূর্ণ চেহারা নিয়ে এসে দাঁড়াবে. সুতরাং তাঁকে এখনও প্রমাণ করে দিতে হবে যে, সেই ফর্মুলা – “পুরনোই আসল সোনা” – এটা তাঁর সম্বন্ধেই বলা.