ঠিক অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের মতোই ইলেনা ব্লাভাত্স্কায়ার জীবন পরিপূর্ণ ছিল রহস্য ও হেঁয়ালিতে. তাঁর ব্যক্তিত্বের পরস্পরবিরোধী মূল্যায়ণ করা হয়ে থাকলেও, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সংস্কৃতি ঘনিষ্ঠতর করার ক্ষেত্রে তাঁর বিপুল অবদান সর্বজনস্বীকৃত.

ইলেনা ব্লাভাত্স্কায়ার(কুমারী জীবনে গান)জন্ম হয়েছিল ১৮৩১ সালে এক সুপরিচিত অভিজাত পরিবারে. একদা ছোট্টইলেনা ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখেছিল এক হিন্দুকে, যে ভাবী মহতী মিশন সম্পর্কে ভবিষ্যত্বাণী করেছিল. পরবর্তীতে ঐ স্বপ্নসত্য হয়েছিল.

১১ বছর বয়সে ইলেনা তার মাকে হারায়, যিনি শেষনিঃশ্বাসত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে একটি রহস্যময় কথা উচ্চারন করেছিলেন –“হয়তোআমার পক্ষে মৃত্যুই বরণীয়, অন্ততঃ ইলেনার ভাগ্যবিভ্রান্তির জন্য আমাকে কষ্ট পেতে হবে না.আমি নিশ্চিতভাবে জানি, যে ওকে বহু দুঃখকষ্ট পোহাতে হবে.” একেবারে ভবিষ্যত্দ্রষ্টার কথা.

ইলেনা মধ্যযুগীয় ওকুলটিজমের বইপত্র গোগ্রাসে আত্মস্থ করতে লাগলো, বিভিন্ন ভাষা চর্চা করতেলাগলো, সুদক্ষা পিয়ানো বাদিকা হয়ে উঠলো. ১৭ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে স্বধীন হওয়ার লক্ষ্যে ইলেনা তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক বড় এরেভানের ডেপুটি গভর্ণরের অঙ্কশায়িনী হন. কিন্তু বিয়ের মাত্র তিনমাস পরেই স্বামীর কাছ থেকে পালিয়ে ইস্তাম্বুল যাত্রা করেন. উনবিংশ শতাব্দীর রুশী নারীর পক্ষে এটা ছিল অভাবনীয় কর্ম.

এই মুহুর্ত থেকে শুরু হচ্ছে তার ভ্রমণ বিশ্ব জুড়ে. পরবর্তী ৩০ বছরে ব্লাভাত্স্কায়া তিন তিনবার বিশ্ব পরিক্রমা করেন. তবে তাঁর জীবনালেখ্যতে কোথায় সত্য আর কোথায় জনশ্রুতি, তা আজ বোঝা দুষ্কর. তবে তাঁর সমসাময়িক লোকেদের স্মৃতিচারণা ও স্বয়ং ব্লাভাত্স্কায়ার লেখা বইপত্রকে বিশ্বাস করলে বলতে হয়, যে তিনি অনেককিছুর সাক্ষী ছিলেন ও তাঁকে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল. ইলেনা ইতালিতে ঐ দেশকে অস্ট্রিয়ার রাজত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য লড়াই করেছিলেন ও গুরুতর আহত হয়েছিলেন. বহুকষ্টে মৃতদেহের স্তুপের মধ্য থেকে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল. গ্রীস থেকে সামুদ্রিক পর্যটনের সময় ইলেনাদের জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে ও জাহাজটির সলিলসমাধি হয়. ব্লাভাত্স্কায়া অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন.তিনি দুবার দীর্ঘসময় বেহুঁশ হয়েছিলেন, যার মধ্যেএকবার টানা পাঁচদিন. সেবার ইলেনা গত হয়েছেন, বলে ধরে নিয়ে যখন তাঁর দেহ সত্কারের আয়োজন চলছিল, সে সময়ে তাঁর জ্ঞান ফেরে.রাশিয়ায় ব্লাভাত্স্কায়া আত্মা আহ্বানের শোয়ের আয়োজন করে পিটার্সবার্গের উচ্চসমাজকে তার অনুরক্ত করে তুলেছিলেন. কিন্তু অচিরেই তিনি সেই কাজ থেকে বিরত হলেন এই বলে, যে মৃত আত্নাদের সাথে কথাবার্তাজীবনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক. ইংল্যান্ডে ব্লাভাত্স্কায়ার উপর রাশিয়ার গুপ্তচরের তকমা আঁটা হয়েছিল আর ভারতবর্ষেতাকে হাতুড়ে বলে অপবাদ দেওয়া হতো. ব্লাভাত্স্কায়ার জীবনে কোনোকিছুই বাদ যায়নি.

১৮৫১ সালের ১২ই আগস্ট তাঁর বিশতম জন্মদিনে লন্ডনের হাইড পার্কে ব্লাভাত্স্কায়া সাক্ষাত্ পান ভারতীয় হিন্দুএল মোরিয়ার. ইলেনার মতে, একেই তিনি দেখেছিলেন তাঁর শৈশবের স্বপ্নে.মোরিয়া তাঁকে বলেন, যে তাঁকে তিব্বত যেতে হবে গুরুত্বপূর্ণ এক টাস্ক পূর্ণ করার প্রস্তুতি নিতে. ইউরোপীয়দের (বিশেষতঃ মহিলাদের) জন্য নিষিদ্ধ সে আমলের তিব্বতে ইলেনা ৭ বছর অতিবাহিত করেছিলেন.এর এক শতক পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে সিংহলের প্রথম রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘে সিংহলের প্রতিনিধি ও সারাবিশ্বের বৌদ্ধদের ভ্রাতৃত্বের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার গুণাপালা মালালাশেখরা ব্লাভাত্স্কায়া সম্পর্কে লিখেছিলেন–“তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের সাথে তাঁর গাঢ় পরিচয় সম্মন্ধে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, যেমন নেই তাঁর দ্বারা বিশেষ বৌদ্ধ রীতির ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে.”

তিব্বত থেকে ব্লাভাত্স্কায়া পুণরায় লন্ডনে ফেরেন. সেখানে তিনি আবার সাক্ষাত্ করেন তাঁর গুরু এল মোরিয়ার সাথে.গুরুর ইচ্ছা শিরোধার্য করে তিনি আমেরিকায় পাড়ি দেন ১৮৭৩ সালে এবং সেখানে থিওসফিক্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন. তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন ও তারপর আবার পথে বেরিয়ে পড়েন. এবার তিনি বম্বে এসে পৌঁছান. সেবারের ভারতভ্রমণের স্মৃতিকথা ইলেনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তাঁর লেখা ‘ভারতবর্ষের গুহা ও সুড়ঙ্গ থেকে’ নামক গ্রন্থে.১৮৮২ সালে ইলেনা ব্লাভাত্স্কায়া মাদ্রাজের উপকন্ঠে আদিয়ারা নামক স্থানে থিওসফিক্যাল সোসাইটির সদর-দপ্তরের পত্তনকরেছিলেন.

১৮৮৮ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁরজীবনের মুখ্য রচনা –‘সিক্রেট ডকট্রিন’ – বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শনের সংশ্লেষ. প্রাচীণ মিশরীয়, হাদিস, হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের পবিত্র সব বয়ান বিশ্লেষণ করে ব্লাভাত্স্কায়া সব ধর্মের অভিন্ন সারমর্মের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন. পরম সত্যের সন্ধান, আত্নার শুদ্ধিকরণ, দুঃখযাতনার লাঘব ও মানবজাতির ভ্রাতৃত্বের মুলনীতি পালনকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন.

১৮৯১ সালে ব্লাভাত্স্কায়া দেহত্যাগ করেন. তাঁর চিতাভস্ম তাঁরই প্রতিষ্ঠিত থিওসফিক্যাল সোসাইটির তিনটি কেন্দ্র, যথাঃ লন্ডন, নিউ-ইয়র্ক ও আদিয়ারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল. এখনো ইলেনা ব্লাভাত্স্কায়ার মৃত্যুদিবস তাঁর অসংখ্য অনুগামীরাপ্রতিবছর ‘শ্বেতপদ্ম দিবস’ নামে পালনকরে.