বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত নল ও দময়ন্তীর উপাখ্যান বারংবার শিল্পসৃজনের ভিত্তি হয়েছে রাশিয়ায়. সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রখ্যাত রুশী কবি ভাসিলি ঝুকোভস্কি এই মর্মস্পর্শী প্রেমের কাহিনীর বর্ণনা দিয়েছিলেন. উনবিংশ শতকে সুদক্ষ সুরকার আন্তন আর্সেনস্কি ঐ কাব্যের ভিত্তিতে ‘নল ও দময়ন্তী’ নামক অপেরা রচনা করেছিলেন. ঐ অপেরা মঞ্চস্থ হয়েছিল রাশিয়ার প্রধান থিয়েটার – বিশ্ববন্দিত বলশোয় থিয়েটারে. ঐ অপেরার মঞ্চায়ণ বিংশ শতাব্দীতেও চালু ছিল. মুখ্য নায়িকা দময়ন্তীর সুর মাঝেমধ্যেই আধুনিক গায়কদের কন্ঠে ঝংকৃত হয়. আর গত এপ্রিল মাসের শেষ কয়েকদিন ধরে মস্কোর স্কুলপড়ুয়ারা রাজধানীতে অবস্থিত ভারতীয় সাংস্কৃতির কেন্দ্রে ‘বীজের যাত্রাপথ’ নামে নল ও দময়ন্তীর উপাখ্যান উপস্থাপন করলো. এরকম অস্বাভাবিক নাম কেন ?

আমরা শিক্ষা দান করি বিশেষ পদ্ধতিতে, যার অন্তর্ভুক্ত শুধুমাত্র পাঠ্য বিষয়গুলিই নয়, আরও অনেককিছু. – ব্যাখ্যা করে বলছেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা আল্লা কলেসনিকোভা.-

আল্লা কলেসনিকোভা বলে চলেছেন – আমাদের পাঠক্রমে বহু সৃজনশীল বিষয় রয়েছে, আমরা সঙ্গীত ও নাট্য চর্চা করি. এবং ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বের শিল্প ও সংস্কৃতি হৃদয়ঙ্গম করানোর চেষ্টা করি. বিশ্বসংস্কৃতির ঐশ্বর্য ভান্ডারে ভারতবর্ষ প্রচুর ধনরত্ন দান করেছে. স্কুলের থিয়েটারে আমরা ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের কোনো উপাখ্যান অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিই. ছেলেমেয়েরা বেছে নিল নল ও দময়ন্তীর কাহিনী ও তারা বিপুল মনোনিবেশের সঙ্গে মঞ্চায়নের কাজে পরিশ্রম করেছে.

সদ্যকিশোর কলাকুশলীরা কাহিনীর মুখ্য চরিত্রদের অনুভূতির আন্তরিকতা ও গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে. ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্য অধ্যয়ন করে আমাদের সে যুগের ভারতবর্ষ সম্পর্কে যে রকম ধারনা জন্মেছে, তা তারা তুলে ধরতে পেরেছে. নলওদময়ন্তীর কাহিনীতে ভারতীয় জাতীয় নৃত্য পরিবেশন করা হয়, ধ্বনিত হয় সঙ্গীত. এই নাটকে অভিনয় করার জন্য স্কুলে খোলা হয়েছে বিশেষ সঙ্গীত দল, যেখানে পাশাপাশি ঘাম ঝরাচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা – বাঁশিবাদক ও তবলচিরা এবং আজকাল বীনাবাদকরাও. অত্যন্ত সুন্দর এবং মোলায়েম ঝঙ্কারদায়ী এই বাদ্যযন্ত্রটি আমাদের উপহার দিয়েছেন রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত শ্রী অজয় মালহোত্র. তিনি বিভিন্ন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় রুশী শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতা ও অভিনয়ে মুন্সীয়ানার উচ্চ মূল্যায়ণ করেছেন, লক্ষ্য করেছেন ভারতীয় বাস্তবতার সাথে মঞ্চসজ্জা ও অভিনেতাদের সাজপোষাকের সর্বাত্মক সাদৃশ্য.

মঞ্চ ও সাজপোষাক আমরা নিজেরাই বানিয়েছি – সগর্বে উল্লেখ করছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ও নাটকে অন্যতম মুখ্য চরিত্রে অভিনয়রত আর্তিয়োম আস্তাখভ.-

আর্তিয়োম বলছে – আমরা স্কুলে ভারত চর্চা করেছি এবং এখনো করি. ইন্টারনেটে আমি এই দেশ সম্পর্কে আগ্রহোদ্দীপক বিষয়াবলী জানতে পেরেছি. মঞ্চায়ণের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বারবার পড়েছি নল ও দময়ন্তীর উপাখ্যান. আমি সুপ্রাচীন ভারত, গ্রীস ও মিশরের লোককাহিনীগুলি ভীষন ভালোবাসি. মহাভারত আমার নিত্যপাঠের একটি গ্রন্থ. মহাভারত আমার ও বন্ধুদের ভারতের সাথে পরিচয়ের পথ সন্ধান দিয়েছে. আমার স্বপ্ন কোনো একদিন ভারত সফর করার. আর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে আমরা মহাভারতের আরও অন্য কোনো উপাখ্যান মঞ্চস্থ করতে চাই.

এভাবেই সুপ্রাচীন দেশ ভারতবর্ষ ও তার সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানের অঙ্কুরোদ্গম ঘটছে নবীন শিক্ষার্থীদের. মস্কোস্থিত ‘বীজের যাত্রাপথ’ স্কুলের অনুসন্ধিত্সু ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ের ও মস্তিষ্কের উর্বর ভূমিতে ঘটছে ঐ বীজের বাড়বাড়ন্ত.