১৯৪১-১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে আমাদের দেশের জনগণের জয়লাভ করার সম্মানে নামাঙ্কিত মস্কোর বিজয়ের পার্কে মে মাসের সূচনার একটি দিনে ধ্বনিত হয়েছে কবিগুরুর সুরেলা গান ও কবিতা. মর্মগ্রাহী বিজয় দিবস আমরা উদযাপন করি ৯ই মে. কিন্তু ৭ই মে তেই যেন ফরমায়েশ পেয়ে সুদীর্ঘ ও বরফসঙ্কুল শীত ও বসন্তের বৃষ্টির পরে পার্কটি ঢেকে গিয়েছিল মোলায়েম সবুজে. সবুজ হয়ে উঠতে থাকা ফুলের ঝোঁপঝাড়, গাছগুলি পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপটের সঙ্গে এমন ঐকতানের সৃষ্টি করে, যে সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিমূর্তি চমত্কার খাপ খায়. ঐ স্মৃতিমূর্তি যেন পার্কে বেড়াতে আসা লোকজনদের চুম্বকের মতো আকর্ষন করে.রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবসে তাঁর স্মৃতিমূর্তির পাদতল হয়ে উঠেছিল গোলাপ, অ্যাস্টার ফুলের স্তবকে বোঝাই. সেগুলি অর্পন করেছে রুশবাসীরা, প্রবাসী ভারতীয়রা. রাশিয়ার তরুন সম্প্রদায় সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছে. .

এটা এত স্বাভাবিক, এটা এত যুক্তিযুক্ত, যে মানবতাবাদী, আলোকবাহী শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিকতাবাদী রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিমূর্তি স্থাপণ করা হয়েছে বিজয়ের পার্কে, যে এই মহামনীষির জন্মতিথি রুশবাসীদের জন্য সর্বাপেক্ষা পবিত্র উত্সব – বিজয় দিবসের ঠিক প্রাক্কালে উদযাপিত হয়,- উল্লেখ করছেন মস্কোস্থিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় উচ্চ শিক্ষায়তনে বাংলার অধ্যাপিকা ও রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী জনপ্রিয়করণে অগ্রণী ইরিনা প্রকোফিয়েভা. তিনি বলছেন – আমি নিজের ছাত্রছাত্রীদের গল্প করি, যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কবিগুরু রাশিয়ার ফ্রন্টগুলিতে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য মস্কো থেকে বেতার সংবাদ পাওয়ার অধীর প্রতীক্ষায় থাকতেন এবং তাঁর অটল বিশ্বাস ছিল যে রাশিয়াই ফ্যাসিবাদের পাঁজর ভেঙে দেবে.

ইরিনা প্রকোফিয়েভা বলছেন – আমি ভাগ্যবতী, যে উচ্চ শিক্ষায়তনে ভর্তি হয়ে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করেছিলাম. আমি বরাবরই রবীন্দ্রনাথের কাব্য ভালোবাসতাম, তবে আরও ঘনিষ্ঠভাবে তাঁর রচনাবলীর রসগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায় আমার সামনে খুলে গেল সারা ভারতবর্ষের বৈভবশালী ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সিংহদুয়ার, যা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিতে. আমার স্থির বিশ্বাস, যে আমার ছাত্রছাত্রীদেরও ভাগ্য ভালো. তারা সাগ্রহে অধ্যয়ন করে রবীন্দ্রনাথের কাব্য, দার্শনিক চিন্তাভাবনার প্রকাশনা, সমাজজীবন ভিত্তিক প্রবন্ধাবলী, পরিচিত হয় তাঁর আঁকা ছবির সঙ্গে. আমরা একসঙ্গে বসে দেখি বিশ্ববরেণ্য চিত্র পরিচালক সত্যজিত রায় নির্মিত রবীন্দ্র রচনাবলীর ওপর তোলা ছায়াছবি, একসাথে নিবিষ্ট হয়ে শুনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঐতিহ্যের সুযোগ্য ধারাবাহক ওস্তাদ বিলায়েত খান ও ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের রেকর্ডিং.

রাশিয়ায় গুরুদেবের রচনাবলী বহু লক্ষ কপিতে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে. এখনো আধুনিক পাঠকদের কাছে সে সবের চাহিদা রয়েছে. কবিগুরুর ১৫০-তম জন্মজয়ন্তীতে রবীন্দ্রনাথ ভিত্তিক আরও নতুন সব প্রকাশনা দিনের আলোয় এসেছে. তাদের মধ্যে অন্যতম - ইরিনা প্রকোফিয়েভা ও সঙ্গীত বিশারদ তাতিয়ানা মরোজোভা কর্তৃক গীতাঞ্জলীর কিছু গানের পশ্চিমী শৈলীতে স্বরলিপি সংকলন.

মস্কোর বিজয়ের পার্কে আয়োজিত গুরুদেবের জন্মদিবসের প্রতি উত্সর্গীত অনুষ্ঠানে রুশ ফেডারেশনে ভারতের রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্র স্মরণ করিয়ে দেন, যে রবি ঠাকুর বরাবর রাশিয়ার প্রতি অকৃত্রিম আগ্রহ প্রকাশ করতেন.

রাশিয়ার প্রতি গভীর মুগ্ধতা ও আকর্ষন ছিল রবীন্দ্রনাথের. এবং রাশিয়া দর্শনের বহুদিনের সাধ অবশেষে তাঁর পূরণ হয়েছিল ১৯৩০ সালে. ‘রাশিয়ার চিঠি’ বইয়ে তিনি লিখেছিলেন –“এখানে না এলে আমার জীবনের পুণ্য তীর্থভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যেত”. খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়া যে বিশাল প্রগতি তখন অর্জন করেছিল, তা তাকে অভিভূত করেছিল এবং তিনি একে যুক্ত করেছিলেন বৃহত্তর জনসমাজের মধ্যে শিক্ষার ঢালাও বিস্তারের সাথে. “দুর্দম শক্তি প্রয়োগ করে রাশিয়ার রোগব্যাধি ও নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে”র ও “অজ্ঞানতা ও দারিদ্রকে নির্মূল করার ব্রতে একাগ্র কর্মধারা”র তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন. ভারতের রাষ্ট্রদূত শ্রী অজয় মালহোত্রের দৃঢ় বিশ্বাস, যে প্রথাগতভাবে রাশিয়ায় গুরুদেবেরপ্রতিটি জন্মদিন উদযাপন,

সেখানে বয়স নির্বিশেষে তাঁর অনুরাগীদের যোগদান -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রেখে যাওয়া সুবিশাল আধ্যাত্মিক ও শিল্প সম্পদের প্রতি রুশবাসীদের অকৃত্রিম আগ্রহের সাক্ষ্য দেয়.

আপনারা শুনছেন কবিগুরুর কবিতা. পাঠ করেছেন ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র স্মৃতিমূর্তির পাদতলে মস্কোর ‘হিন্দুস্তানি সমাজের’ সক্রিয় সদস্য ও ‘রেডিও রাশিয়া’য় আমাদের বহুদিনের সহকর্মী রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়.

রাশিয়ার রাজধানীতে রবীন্দ্রনাথের প্রতি উত্সর্গীত অনুষ্ঠানাদি চলতে থাকবে. মে মাসের শেষে মস্কোস্থিত ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আয়োজিত হবে কবিগুরুর কাব্যের প্রতি উত্সর্গীত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা.