বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষরা শাসক কর্তৃপক্ষের দিকে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে। সরকারবিরোধী বিপুল জনসমাবেশ কড়া হাতে ছত্রভঙ্গ করায় অগুন্তি মানুষ হতাহত হয়েছে। তারই প্রতিবাদে বিরোধীরা গোটা দেশ জুড়ে হরতালের ডাক দিয়েছে। বিএনপি ও তার মিত্র ইসলামী দলগুলি সমেত মোট ১৮টি রাজনৈতিক পার্টির তরফ থেকে হরতালের ডাক প্রমাণ করছে, যে বাংলাদেশ দুই আপোষবিহীন শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে খাদ ক্রমশঃ চওড়া হচ্ছে এবং কোনো পক্ষই সূচাগ্র জমি ছাড়তে রাজি নয়। আমাদের পর্যবেক্ষক সের্গেই তোমিনের মতে, পাশা খেলায় পণ রাখা হয়েছে শুধু আরও মানুষের প্রাণই নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের খোদ অস্তিত্বই। রাজনৈতিক আর্ম রেসলিংয়ের প্ররোচক হিসাবে থেকেই যাচ্ছেন বহুকাল ধরে যুঝুমান প্রতিদ্বন্দী দুই মহিলা – বর্তমানে দেশের ক্ষমতায় আসীন আওয়ামি লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া। সামনের বছর বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা এবং খালেদা জিয়া বাজি ধরেছেন শেখ হাসিনার কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর গদি ছিনিয়ে নেওয়ার। সেই জন্য তার দরকার আজই যত বেশি সম্ভব পরিস্থিতিকে টালমাটাল করে তোলা ও সামাজিক উত্তেজনার আগুনকে যথাসাধ্য উস্কে দেওয়া, নিজের রাজনৈতিক শিবিরে বিভিন্ন মতবাদ এবং অভিমুখের পার্টিগুলোকে এককাট্টা করা।

সেক্ষেত্রে যে খালেদা জিয়ার শিবিরে জড়ো হবে দেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে আস্তাকুঁড়েতে ছুঁড়ে ফেলার প্রয়াসী চরমপন্থী ইসলামীরা – সেটা যতদূর মনে হচ্ছে তাকে আদৌ ভাবাচ্ছে না। তিনি লড়াইয়ের জন্য তৈরি।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা, যার দখলে রয়েছে শাসন ক্ষমতার দমন যন্ত্র – সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা শক্তি, তিনিও কড়া ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। বিরোধীদের সাথে আলাপ-আলোচনা শাসক কর্তৃপক্ষের কাছে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে গত রবি ও সোমবার ইসলামীদের দ্বারা সংগঠিত প্রায় দুই লক্ষ মানুষের প্রতিবাদী আন্দোলন বীভত্স রক্তক্ষয়ী মারামারিতে পর্যবসিত হয়েছিল, যেখানে হতাহতের সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাগুলি বাংলাদেশের পুলিশের সূত্র ধরে যখন ৩৭ জন নিহত হওয়ার খবর জানাচ্ছে, তখন প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও সোস্যাল নেটওয়ার্কগুলিতে প্রকাশিত রেকর্ডিং অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হতে পারে, আর আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের গণনা হাজারে হাজারে।

শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কোন্দলের প্রেক্ষাপটে দেশের সমাজ ও রাজনীতিবিদরা গভীরতর বিচ্ছিন্ন শিবিরে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে চলেছে – এক শিবিরে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে অটুট রাখার প্রয়াসীরা, অন্য শিবিরে তারা, যারা আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে দেশকে ধর্মীয় অনুশাসন ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রে রুপান্তরিত করার জন্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে সর্বশেষ প্রতিবাদী আন্দোলনের উদ্যোক্তা ছিল ‘হিফাজত-ই-ইসলাম’ গোষ্ঠী, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ‘নাস্তিক শাসন’ ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে তাদের বিশ্বাস করে না। তারা চায় দেশের সবাইকে মৃত্যুদন্ড দিতে, যারা তাদের মতে ইসলামের অবমাননা করে, তারা বাংলাদেশের সংবিধানের ঐস্লামীকরণ ঘটাতে সংকল্পবদ্ধ, তারা লিঙ্গ অনুসারে মানুষের স্তর নির্ধারণ করার পক্ষপাতি। যদিও বিজেপি পার্টি তাদের চিন্তাধারার সাথে একমত নয়, তবুও তাদের মন যোগানোর জন্য বিজেপি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবাদী আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে।

শাসক কর্তৃপক্ষ নিজেই ইসলামীদের সক্রিয়তার তীব্র বৃদ্ধিতে প্ররোচনা যুগিয়েছে। গত কয়েকমাস ধরে তারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃত সামরিক অপরাধের অভিযোগে একের পর এক ‘জামাত-ই-ইসলাম’ দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছে।

বিরোধীরা এই ব্যাপারটিকে বাছাই করে দন্ডদান বলে গণ্য করেছে।