পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম সরকার বদল হতে চলেছে সংবিধান সম্মত ভাবেই: ১১ই মে দেশে সর্বজনীন পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা. বসন্তের শুরুতে পদত্যাগ করা মন্ত্রীসভা ছিল এই দেশের ইতিহাসে প্রথম অসামরিক প্রশাসন, যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে নিজেদের সংবিধান সম্মত মেয়াদের শেষ অবধি বহাল থাকা. কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলা ঠিক হবে যে, সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গুলিকে মেনে চলা হলেও, বর্তমানের নির্বাচনী প্রচার হয়েছে সারা দেশ জোড়া হিংসার প্রসার ও সন্ত্রাসের ঢেউয়ের কারণে অভূতপূর্ব. আর এটা মোটেও পাকিস্তানের রাজনীতির বর্তমানে একমাত্র প্যারাডক্স নয়.

এমন একটা দিনও যাচ্ছে না, যখন পাকিস্তানের নানা কোন থেকে সন্ত্রাসের বা রাজনৈতিক হত্যার খবর আসছে না. বিশেষ সক্রিয়তা এই ক্ষেত্রে দেখাচ্ছে পাকিস্তানের তালিবান আন্দোলনের জঙ্গীরা. পাকিস্তানের তালিবরা চায় না দেশের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থাকতে আর তারা রাজনৈতিক নেতাদের উপরে সত্যিকারের শিকার ঘোষণা করেছে, তাদের বাধ্য করতে চাইছে নির্বাচনের আগে গণ সমাবেশ মিছিল থেকে বিরত থাকতে.

এই ধরনের হিংসার প্লাবন স্বত্ত্বেও অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই এখনই বাস্তবে বলে দিতে চাইছেন যে, এই নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ঠিক রয়েছে: নিঃশর্ত ফেভারিট মনে করা হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে পাকিস্তান মুসলিম লীগ দলকে. বলা কঠিন এই ধরনের অপেক্ষা কতটা সত্য প্রমাণিত হবে. তবে আর বেশী অপেক্ষার দরকার নেই.

প্রসঙ্গতঃ সমাজতত্ত্ব সংক্রান্ত গবেষণা পাকিস্তানের মতো দেশে করা হলে, তার প্রতি অনেকখানি সাবধানী হয়েই দেখা উচিত্ হবে: ভোটের দিনে নির্বাচকদের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরে অনেক রকমের কিছুই নির্ভর করতে পারে – প্রজাতি সংক্রান্ত, পরিবার সংক্রান্ত. স্থানীয় ও অন্যান্য রকমের কারণ, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যে প্রশ্ন এখনও ততটা গভীর মনোযোগের কারণ হচ্ছে না, তা সম্ভাব্য আগামী বিজয়ীকে নিয়ে নয়, বরং যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে বহু দিনের জন্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে – আর সেটা হল, কে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে. স্রেফ জায়গা বদল হবে কিনা অর্থাত্ পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি তাদের সিন্ধ প্রদেশের নির্বাচনের ঘাঁটি থেকে স্রেফ নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগের জায়গায় বসবে, যারা বেশীর ভাগই পাঞ্জাব প্রদেশের উচ্চ কোটির লোকদের উপরে নির্ভরশীল, নাকি মঞ্চে উঠে আসবে, তৃতীয় শক্তি, যা পাকিস্তানে আজ কয়েক বছর ধরেই অপেক্ষা করা হচ্ছে?

এখানে কথা হচ্ছে ইমরান খান ও তাঁর নেতৃত্বে তেহরিক এ ইনসাফ দলের. ইমরান নিজে বলছেন যে, ১১ই মে তাঁর দলই জিতবে. কিন্তু এটা স্রেফ প্রাক্ নির্বাচনী স্লোগান মাত্র. সত্যিকারের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকায়, আর মূল কথা হল তাঁর দলের নীচু তলায় শাখা প্রশাখা সমেত সংগঠন না থাকায় তাঁর সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে খুবই অলীক. কিন্তু যদি তেহরিক এ ইনসাফ দলের পক্ষে দ্বিতীয় না হলেও যথেষ্ট পরিমানে সদস্য নিয়ে তৃতীয় শক্তিশালী দল হিসাবে পার্লামেন্টে আসা সম্ভব হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়াবে যে, দুটি ঐতিহ্য মেনে চলে আসা দলের একচেটিয়া ক্ষমতার শেষ হবে. আর তার মানে হল যে, আগামী নির্বাচনে অপেক্ষা করা যেতে পারে সিদ্ধান্ত মূলক পরিবর্তনের ও সেই পরম্পরা থেকে বেরিয়ে আসার, যাকে বলা হয়ে থাকে – “রাজনীতি যা সাধারণতঃ চলে আসছে” – যেমন আমেরিকাতে”.

নওয়াজ শরীফ, ভোটের অপেক্ষা না করেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করে ফেলেছেন, যেন দেশের আগামী নেতার পক্ষ থেকে করা. তিনি অংশতঃ, ঘোষণা করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে দ্বিতীয় সারিতে থাকতে রাজী নন, আর নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দেশের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব হাতে তুলে নেবেন. আর একই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক আবার করে দেখতে হবে, অংশতঃ, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে.

এই দুটি ঘোষণাতেই দেখা যাচ্ছে নিজের ভিতরেই পরস্পর বিরোধীতা ও প্যারাডক্স হয়েছে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত সমস্ত বছর গুলিতেই সামরিক বাহিনী দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে থেকেও খুব দৃষ্টি পড়ার মতো করেই রাজনীতির বাইরে থেকেছে. কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হতে চাওয়া প্রার্থীর মধ্যে এত বেশী করে নিজে সেনা বাহিনীতে প্রভূত্ব করতে চাওয়ায় বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে. যেই হোন না কেন – নওয়াজ শরীফ নিজে অন্তত ভাল করেই জানেন এটা – কারণ তিনিই পাকিস্তানের শেষ অসামরিক নেতা, যাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়েই.

আবার ততটাই আভ্যন্তরীণ পরস্পর বিরোধীতা রয়েছে তাঁর পাকিস্তান – আমেরিকা সম্পর্ক আবার করে দেখতে চাওয়ার মধ্যে. প্রাক্ নির্বাচনী লড়াইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে তা খুবই যুক্তিসঙ্গত: কারণ পাকিস্তানেই গ্যালাপ মিডিয়ার মতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশী আমেরিকা বিরোধী মানসিকতা রয়েছে. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্কট ক্লিষ্ট অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্পনসরও বটে, আর চিনের সঙ্গে বিগত বছর গুলিতে দেখার মতো করে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি স্বত্ত্বেও পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর জন্য প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ কারী দেশও তারাই”.

সুতরাং নওয়াজ শরীফকে - অথবা তাঁর মতো যে কেউই হোন না কেন, যিনি ১১ই মে নির্বাচনে জয়ী হবেন, - তাঁকেই দেশে আমেরিকা বিরোধী মানসিকতা বৃদ্ধির সাথে ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে ও সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে, যা পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন উচ্চ কোটির লোকদের জন্যই বেশী করে লাভজনক.