রবিবারে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে ও অন্যান্য কয়েকটি শহরে বিগত বছর গুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক লোকের উপস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে. বহু সহস্র প্রতিবাদী লোক ঢাকার কেন্দ্র বন্ধ করেছে ও আরও প্রায় এক লক্ষ লোক দেশের উত্তরের অংশের সঙ্গে রাজধানীর সড়ক পথ ও রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছিল. পুলিশ ও মিছিলের লোকের মধ্যে সংঘর্ষে কুড়ি জনের বেশী লোকের মৃত্যু হয়েছে, যদিও বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছে যে, মৃতের সংখ্যা অনেক বেশী. সোমবার সকালের দিকে পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর লোকদের পক্ষে তুলনামূলক ভাবে আইন শৃঙ্খলা বজায় করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বিস্ফোরণের ক্ষমতা এখনও থেকেই যাচ্ছে, আর এর পরে কি ঘটতে চলেছে, তা আজ কেউই আগে থেকে বলতে চাইবে না.

সামান্য কিছু আগে তৈরী হওয়া এক গোষ্ঠী হেফাজত-এ-ইসলাম (ইসলামের রক্ষী) এই বিক্ষোভ আয়োজন করেছিল. বিরোধীদের প্রধান দাবী – ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর আইন নিতে হবে, যা হজরতের অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড অবধি দিতে পারে. মিছিল হয়েছে আবার এই দাবীকেই স্লোগান করে – ধর্ম অবমাননার জন্য ফাঁসী চাই!

শেখ হাসিনার সরকার নিজেদের ধর্ম নিরপেক্ষ বলে অবস্থান দেখাতে চেয়ে আজ থেকে একমাস আগেই নতুন আইন প্রণয়ন করতে অস্বীকার করেছিল, এই ঘোষণা করে যে, বর্তমানে থাকা আইন যথেষ্ট, যাতে ধর্মীয় পবিত্র জায়গা ও ধর্মভীরুদের অনুভূতিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়. তা স্বত্ত্বেও, বিরোধী পক্ষের সম্ভব হয়েছে যথেষ্ট সহজেই রাস্তায় এত সংখ্যায় ক্ষুব্ধ লোকের জমায়েত করানোর আর তাদের উস্কানি দেওয়া, যাতে তারা শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে হিংসার পথ নেয়. মনে রাখতে হবে যে, মৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মীও রয়েছেন. আর তাই এখানে প্রশ্নের উদয় হয়: এত বড় একটা সংঘর্ষের কারণ কি শুধু ধর্মোন্মাদ লোকের কাণ্ড কারখানা? এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বর্তমানে হওয়া পরিস্থিতিকে দেশের সমগ্র সামাজিক- রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেখা ঠিক হবে না, আর মুসলমান লোকদের মধ্যে চরমপন্থী মনোভাবের বৃদ্ধির কারণও দেখতে হবে পশ্চিমের তরফ থেকে মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বের উপরে কোন রকমের সমীহ না করে প্রবল চাপ সৃষ্টি করার মধ্যে. অনেকেরই এটাকে খ্রীষ্টান ও ঐস্লামিক সভ্যতার মধ্যে সংঘর্ষ বলে দেখাতে ইচ্ছে হলেও বা প্রায় নতুন করে ক্রুসেড বলে নাম দিতে চাওয়া হলেও, বাস্তবে ইসলাম ও খ্রীষ্ট ধর্মের মধ্যে কোনও গভীর বিরোধ দেখতে পাওয়া যায় না. আর যা বর্তমানে হচ্ছে – এটা ঐতিহ্য মেনে চলা সমাজের পক্ষ থেকে আধুনিক পশ্চিম বিশ্বে যে সব ধারণা ও আদব কায়দা মেনে চলা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই একটা প্রতিক্রিয়া মাত্র, যা যে কোনও ধর্মের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে”.

এত বড় মাপের আরও জোরালো প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়েছে বাংলাদেশে ইন্টারনেটে কিছু ব্লগারের পক্ষ থেকে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু পোস্ট, আর সে বিষয়ে চরমপন্থী ঐস্লামিকদের ধারণা মতো, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া. কিন্তু এটা শুধু বাইরের কারণ: আসলে বিরোধী পক্ষের অসন্তোষ অনেক আগে থেকেই হয়েছে ও তা অনেক কারণেই হয়েছে.

এর মধ্যে মুখ্য হয়েছে যে সরকার, দেশের উপরে বোধহয় নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মাস দুয়েক আগে শেখ হাসিনার সরকার গত শতকের সত্তর দশকের স্বাধীনতার জন্য করা গৃহযুদ্ধের সময়ে করা অপরাধের জন্য অপরাধীদের বিচার করার কাজ কারবার নতুন করে শুরু করেছিল. আর বিচারের তলোয়ারের কোপে শুধু তখন পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করা ঐস্লামিকরাই পড়ে নি, বরং দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনীতিবিদরাও পড়েছিল, যারা এই সব ঘটনার সঙ্গে একেবারেই যুক্ত নয়.

সুতরাং ঐস্লামিকদের এবারের ডাক এসে পড়েছে বলা যেতে পারে খুবই ভাল করে তৈরী হওয়া জমিতেই. আর সন্দেহ নেই যে, এটা অনেক খানিই সরকারের চাপের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রত্যুত্তর হয়েছে আর তারই সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়েক দিন আগের সাভারে ভেঙে পড়া অট্টালিকার তলায় বহু শত লোকের মৃত্যুর ঘটনা, যাতে আবারও দায়ী করা হয়েছে সেই ক্ষমতাসীন সরকারকেই, তাদের স্থানীয় সক্রিয় প্রভাবশালী কর্মী সোহেল রানা সেই বাড়ীর মালিক ছিল বলে.”

সুতরাং এমনকি মিছিলের লোকদের তাড়িয়ে দিয়েও (আর তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার কাজে লাগানো হয়েছিল বহু সহস্র পুলিশ কর্মী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকেও) বাংলাদেশের প্রশাসন মনে হয় না যে, নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারেন. এই অসন্তোষের কারণই দূর করা হয় নি. আর পরবর্তী কালে এই বিরোধ বেড়ে বিস্ফোরণে পরিণত হতে পারে, যার পরিণাম কারোরই জানা নেই.