রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নতুন জীবন দিতে যাচ্ছে। আর আগামী জুন এবং সেপ্টেম্বরে এই পুনর্জন্মের কাজে নিয়েজিত থাকবেন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ও বারাক ওবামা। আগামী ৭ মে দুইদিনের জন্য মস্কো সফরে আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। এ সময়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরভ ও ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাত করবেন।

আগামী ১৭-১৮ জুন উত্তর আয়্যারল্যান্ডে জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে ওই সাক্ষাতে আলোচনা হবে। আর পরবর্তি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে আগামী সেপ্টেম্বররে সেন্ট-পিটার্সবুর্গে।

দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্জন্ম অধ্যায় অন্তত একমাস আগে শুরু হয়। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মস্কো আসেন মার্কিন রাষ্ট্রপতির জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা টম দানিলোন। তিনি বারাক ওবামার একটি বিশেষ চিঠি পুতিনের কাছে পৌঁছে দেন। ৩০ এপ্রিল ক্রেমলিন ও হোয়াইট হাউস ইউরোপে মার্কিন রকেটবিরোধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করে। ২ মে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ এক বিবৃতিতে বলেন, ওবামার চিঠির উত্তর দিতে মস্কো তৈরী আছে। সম্প্রতি মার্কিন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনকে দেয়া সাক্ষাতকারে ল্যাভরোভ বলেন, রকেটবিরোধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যে ঐক্যমতে পৌঁছেছে তা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অংশিদারিত্ব জোট গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

তবে সম্পর্কের ওই পর্যায়ে পৌঁছাতে খুব একটা সহজ কাজ হবে না। ইউরোপে রকেটবিরোধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তা রাশিয়ার স্ট্রাটিজিক স্বার্থের ওপর কোন প্রভাব ফেলবে না তা নিশ্চত করতে ওয়াশিংটনের কাছে আইনগত নথিপত্র চাচ্ছে মস্কো। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রশ্নের কোন যথাযথ উত্তর নিজের কাঁধে নিবে না। এমনটি মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের পরিচালক পাবেল জোলোতারেভ। রেডিও রাশিয়াকে তিনি বলেন, "ইউরোপে মার্কিন রকেট স্থাপনের মূল টার্গেট হচ্ছে উত্তর কোরিয়া ও ইরান (যদি ইরান কখনো পারমানবিক অস্ত্র তৈরীর পথে অগ্রসর হয়)।ওই সব রকেটের কার্যকারিতা শুধুমাত্র ওই নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপনের উপর নির্ভর করছে। রাশিয়ার সাথে যৌথ সহযোগিতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওই উদ্দেশ্য সফল হবে না।"

এদিকে মার্চে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল এক ঘোষণায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ৪র্থ ধাপের রকেট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম দুই ধাপের কর্মসূচি আগামী ২০১৫ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে এবং তৃত্বীয় ধাপ হবে ২০১৫ সালের পরে। ইউরোপে এসএম-৩-২আ কমপ্লেক্স রকটে স্থাপনের চিন্তা করা হচ্ছে। আর ২০১৮ সালের পরে চতুর্থ ধাপে আরো আধুনিক এসএম-৩-২বি রকেট স্থাপন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পোল্যান্ডে রকেটগুলো স্থাপন করতে। কিন্তু বাজেট ঘাটতি থাকায় ওয়াশিংটনকে ওই রকেটগুলো তৈরী করা থেকে সড়ে আসতে হচ্ছে।

তবে চতুর্থ ধাপের রকেট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে ঝুঁকি থেকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এমনটি মনে করছেন রাশিয়ার রাজনৈতিক গবেষণা সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইভগেনি বুঝিনস্কী। তিনি বলেন, "মার্কিনীদের উচিত পোল্যান্ডের ভূখন্ডে রকেটবিরোধী ক্ষেপনাস্ত্র স্থাপন পুরোপুরি বাতিল করা। সেই সাথে বাল্টিক ও উত্তর সাগরেও। তার মানে, তৃত্বীয় ধাপ থেকেও সড়ে আসতে হবে।"

রকেটবিরোধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে মতানৈক্যের অভাব প্রভাব ফেলছে সিরিয়া সংকট ও ইরানের পরমাণু সমস্যায়। মার্কিন আইন মাগনিস্কী ও এর জবাবে রাশিয়ার উত্তর যা উভয় দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়নের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ার অস্ত্রধারী বিরোধীদের সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকে তাহলে রাশিয়া হয়ত সন্তুষ্টি থাকবে। আর সবচেয়ে ভাল হতো যদি ওয়াশিংটন ইউরোপে রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি ত্যাগ করে। এমনটি মনে করছেন মস্কো রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক ইনস্টিটিউটের প্রফেসর মিখাইল তোরোইসিকি। রেডিও রাশিয়াকে তিনি বলেন, "আমি মনে করি রুশ-মার্কিন সম্পর্কে মূল অন্তরায় রকেটবিরোধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা সিরিয়া নিয়ে নয়। বর্তমানে যে সম্পর্ক রয়েছে সেখান থেকে কি চাচ্ছে দুই দেশের রাষ্ট্র নেতারা। সম্পর্ক উন্নতির ক্ষেত্রে তা কতোটুকে প্রভাব রাখছে। তা না হলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ পথে বাঁধা হয়ে দাড়াবে।"

গতবছর জুনে মেক্সিকোতে জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে সর্বশেষ সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সময়ে বিশেষজ্ঞরা অপেক্ষা করেছিল যে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে কোন পথে অগ্রসর হবে দুই দেশের সম্পর্ক। ওই সময়ে আলোচনায় তেমন প্রাণ ছিল না, তবে এবার দ্বিতীয় ধাপে অনেক বেশি প্রাণের সঞ্চার থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।