আপনারা পড়ছেন ও শুনছেন আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান –‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’.

অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকভা.

এই অনুষ্ঠানে আমরা শুধু আপনাদের জন্য রাশিয়া সম্পর্কে আগ্রহোদ্দীপক বিষয়গুলি নিযে গল্প করি.

সেইজন্যই আমরা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসে বসবাসকারী আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের অনুরোধ করছি যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠাতে. লিখুন, কি আপনারা সবচেয়ে বেশি করে জানতে চান.

আজ আমরা আমাদের বহুদিনের নিবেদিতপ্রাণ শ্রোতা উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গোরখপুর শহরের বাসিন্দা বদ্রীপ্রসাদ ভার্মার অনুরোধ পূরণ করবো ও রাশিয়ার স্বনামধন্য এক অঙ্কনশিল্পী সম্পর্কে জানাবো.

এবং উত্তর দেব কলকাতা থেকে তরুন কুমার মন্ডলের পাঠানো নিম্নোক্ত প্রশ্নটিরঃ রাশিয়ায় এমন মিউজিয়াম আছে কি, যেখানে দর্শকরা, বিশেষতঃ শিশুরা প্রদর্শিত সামগ্রীগুলি স্পর্শ করে দেখতে পারে?

বদ্রীপ্রসাদ শর্মা আমাদের সামনে কঠিন কর্তব্য পেশ করেছেনঃ রাশিয়ার একজন মহান চিত্রশিল্পী সম্পর্কে তাকে জানাতে হবে. যদি তিনি মহান কবি সম্পর্কে জানতে চাইতেন, তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় আলেক্সান্দর পুশকিনের নাম করতাম. লেখকদের মধ্যে তেমন ছিলেন লেভ তলস্তোয়, আর সুরকারদের মধ্যে পেওতর চাইকোভস্কি. কিন্তু এককথায় রাশিয়ার মহত্তম চিত্রশিল্পীর নাম আমরা করতে পারছি না. কারো ভালোলাগে আন্দ্রেই রুবলোভের সৃষ্টি, আর অন্যদের পছন্দ ইলিয়া রেপিনের আঁকা ছবি– ইত্যাদি. জগদ্বিখ্যাত রুশী চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের সৃষ্ট হাজার হাজার শিল্পসামগ্রী সংরক্ষিত আছে দেশের অসংখ্য মিউজিয়ামে. মস্কোয় অবস্থিত ‘ত্রেতিকোভস্কায়া গ্যালারি’ ও সেন্ট-পিটার্সবার্গে অবস্থিত ‘রুশী মিউজিয়ামে’ সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা এরকম শিল্পকীর্তির.

আমাদের নিয়মিত শ্রোতারা নিকোলাই ও স্ভেতোস্লাভ রেরিখ, ভাসিলি ভেরেশাগিনের জীবনকাহিনী ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে যথেষ্টমাত্রায় অবহিত, কারণ তাঁদের জীবন ও সৃজন ছিল ভারতের সাথে জড়িত. কিন্তু শুধু উপরোক্ত শিল্পীরাই একমাত্র ভারতবর্ষের মানুষ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্যাবলী ছবির ক্যানভাসে তুলে ধরেননি. তাই আমরা ঠিক করেছি আমাদের শ্রোতা ও পাঠকদের আমাদের দেশের এরকম আরও কয়েকজন শিল্পীর সাথে পরিচয় করাবো. আজ আমরা জানাবো প্রখ্যাত সোভিয়েত চিত্রশিল্পী সেমেওন চুইকোভের সম্পর্কে.

সেমেওন চুইকোভ বিংশ শতাব্দীর একেবারে সূচনায় কির্গিজিয়ায় এক রুশী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন. শৈশব থেকেই তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যএশীয় প্রজাতন্ত্র কির্গিজিয়ার প্রকৃতি ও মানুষের সৌন্দর্যে অভিভূত ছিলেন. স্কুলেই অঙ্কনশিক্ষক কিশোর সেমেওনের মধ্যে প্রতিভার সন্ধান পেয়েছিলেন ও তাকে চিত্রশিল্প শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন. সেমেওন চুইকোভ বহুবছর অতিবাহিত করেন প্রথমে তাসকেন্তে শিল্প প্রযুক্তি ওয়ার্কশপগুলিতে ও পরে মস্কোয় উচ্চ কলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে. মস্কোয় বড় প্রদর্শনীতে চুইকোভ প্রথমবার অংশ নিযেছিলেন ২৫ বছর বয়সে. ঐ প্রদর্শনীটির নাম দেওয়া হয়েছিল –‘সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতিবৃন্দের শিল্পকলা’. সেমেওন সেখানে কির্গিজিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন. তার মাত্র দুই বছর পরেই তাঁর একটি ছবি কিনে নেয় ‘ত্রেতিকোভস্কায়া গ্যালারি’. এটা শিল্পীর প্রতিভার স্বীকৃতির সর্বোচ্চ প্রতীক.

ভারত শিল্পীর শিল্পজীবনের বড় এক খন্ড অধিকার করেছিল. চুইকোভের শিল্পকর্মে তা ছিল কির্গিজিয় বিষয়াবলীর স্বাভাবিক ক্রমোন্নয়ন ও প্রাচ্যের জাতিগুলির ভাগ্য সম্পর্কে আন্তরিক আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ. তাঁর প্রথম ভারত সফরের প্রাক্কালে চুইকোভের আশঙ্কা ছিল, যে ভারত তাঁর কাছে অবোধ্য ও পরদেশই থেকে যাবে. ভারতের মাটিতে পদার্পণ করে তিনি সে দেশের সাথে সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার ব্যাপক সাদৃশ্য আবিস্কার করে যুগপত্ বিস্মিত ও উল্লসিত হয়েছিলেন. সেমেওন চুইকোভ কয়েকবার ভারত ভ্রমণ করেন. তিনি দিল্লি, কোলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই,জয়পুর, বেনারস, আগ্রা ও অন্যান্য শহর সফর করেছিলেন. শহরগুলির রাস্তাঘাট ও সেখানকার বাসিন্দাদের ছবি আঁকা ছাড়াও তিনি রচনা করেছিলেন তিনটি বই. তাঁর অন্যতম একটি বইয়ের নাম –‘ভারতের রুপের বহিঃপ্রকাশ’. ভারতের সঙ্গে শিল্পী সেমেওন চুইকোভের সাক্ষাত্, তদজনিত অনুভূতি, যা তাকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিল, তা ব্যক্ত করা যেতে পারে তারই লেখা কথা দিয়ে –“হে মহান ও দুর্মরভারতীয় জনগণ! তোমার মধ্যে বিরাজ করছে কত যে সৌন্দর্য এবং মহানুভবতা!”

ভারত চুইকোভের শিল্পকর্মের উচ্চ মূল্যায়ণ করেছে. ১৯৬৭ সালে তিনি প্রথম রুশী শিল্পী হিসাবে জওহরলাল নেহেরু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন.

সেমেওন চুইকোভ পরলোকগমন করেন ৩৩ বছর আগে. ভারতের উপর আঁকা তাঁর অসংখ্য ছবি ‘ত্রেতিকোভস্কায়া গ্যালারি’ এবং সেন্ট-পিটার্সবার্গের ‘রুশী মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত রয়েছে.

আমাদের আগামী অনুষ্ঠানগুলিতে আমরা অন্যান্য সেইসব রুশী চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে আপনাদের জানাবো, যাদের সৃজন কর্মে ভারতবর্ষ গভীর ছাপ রেখেছে.

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ নামক অনুষ্ঠান শুনছেন আপনারা ‘রেডিও রাশিয়া’ থেকে.

কোলকাতা থেকে আমাদের শ্রোতা তরুন কুমার মন্ডল জিজ্ঞাসা করছেনঃ রাশিয়ায় এমন মিউজিয়াম আছে কি, যেখানে সমস্ত দর্শকদের, বিশেষতঃ শিশুদের প্রদর্শিত বস্তু স্পর্শ করে পরখ করে দেখার অনুমতি থাকে?

হ্যাঁ সেরকম মিউজিয়াম আছে এবং স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে তা অত্যন্ত জনপ্রিয়. মস্কোর তারামন্ডলের অভ্যন্তরে এরকম মিউজিয়াম আছে.

বোধহয় এমন একজনও মস্কোবাসী নেই, যে অন্ততঃ একবারও তারামন্ডলে যায়নি এবং সেখানে লেকচার শোনেনি. বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে তারামন্ডলের বড় হলের সুউচ্চ গম্বুজের ভেতরকার ছাদ জুড়ে নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশের হুবহু নমুনা প্রদর্শন করা হয় সেখানে. লেকচারে শ্রোতাদের জানানো হয় আমাদের ছায়াপথে অবস্থিত তারকামন্ডলী সম্পর্কে, গল্প করা হয় চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, শুক্রগ্রহ সহ আমাদের সৌরমন্ডলের সমস্ত গ্রহ সম্পর্কে. তারামন্ডলের মধ্যকার আর দুটি মিউজিয়ামও আগ্রহের উদ্রেক করে – দুইতলা জুড়ে উপস্থাপিত ইউরানিয়া ও লুনারিয়াম.

ইউরানিয়া মিউজিয়ামে দর্শকদের পরিচয় করানো হয় জোতির্বিদ্যা চর্চা বিকাশের ইতিহাসের সাথে ও মহাকাশ আয়ত্তকরণের সঙ্গে. সেখানে মধ্যযুগীয় সব দূরবীন, রাতের আকাশের গ্লোব ও বিবিধ ভৌগলিক মানচিত্র প্রদর্শন করা হয়. সেকালে নাবিকরাসীমাহীন মহাসাগরে ঐসব বস্তুর সাহায্যে দিক নির্ণয় করতো.

মিউজিয়ামটিতে আধুনিক দূরবীন ও কক্ষপথে কার্যরত কৃত্রিম উপগ্রহের ড্যামি মডেলও প্রদর্শিত হয়. আর অবশ্যই দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মডেল.

ওগুলো সবই কি হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়?

না. তবে দোতলায় স্কুলপড়ুয়াদের পৃথিবী, চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ ও শুক্রগ্রহের গ্লোবগুলিকে অক্ষের চারিপাশে ঘোরানোর অনুমতি দেওয়া হয়. তাদের সবচেয়ে বেশি শিহরিত করে মঙ্গলগ্রহের অলিম্পাস আগ্নেয়গিরি, যার উচ্চতা ২৬ হাজার মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়. এটা আমাদের সৌরমন্ডলে সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি.

সেখানেই প্রদর্শন করা হয় বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর মাটিতে খসে পড়া ধুমকেতুদের সংগ্রহ. তবে শুধুমাত্র বড় বড় খন্ডগুলিকেই স্পর্শ করার অনুমতি দেওয়া হয়.

আর দ্বিতীয় মিউজিয়াম, লুনারিয়ামের কাজের মূলনীতিই হচ্ছে দর্শকদের সবকিছু অবাধে হাতে ছুঁয়ে পরখ করার সুযোগ দেওয়া. অনুসন্ধিত্সু শিশুরা ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে এক প্রদর্শিত বস্তু থেকে অন্যটার কাছে যায়, সুইচ টিপে দ্যাখে, বিভিন্ন যন্ত্রপাতির হাতল ঘোরায়... তাই মস্কোর স্কুলপড়ুয়ারা অত্যন্ত খুশি হয়, যখন জোতির্বিদ্যার ক্লাস নেওয়া হয় তারামন্ডলে ও তার আভ্যন্তরীন দুটি মিউজিয়ামে. এবার আপনাদের একটা গান শুনিয়ে মেজাজ হালকা করার প্রস্তাব দিচ্ছি. ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’অনুষ্ঠানটি আজকের মতো এখানেই শেষ করছি. আমরা আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়ার সম্পর্কে প্রশ্নাবলী সম্বলিত নতুন নতুন চিঠির অপেক্ষায় থাকবো. আমাদের ঠিকানাঃ BroadcastingsectiontoIndia&Pakistan, RadioRussia, 25, Pyatnyatskist. Moscow, Russia. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru