মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি দুই দিনের সফরে ৭ই মে মস্কো আসছেন. ৭ ও ৮ই মে তিনি নিজের সহকর্মী সের্গেই লাভরভ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দেখা করবেন. কেরির নিজের মন্তব্য অনুযায়ী এই সফর অনেক দিন আগেই হওয়া দরকার ছিল এবং বলা যেতে পারে যে, দেরীই হয়ে গিয়েছে. পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন রাশিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ, সুস্থ, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ব্যবস্থা করা দরকার.

মস্কো সফরে সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে, পারমানবিক অস্ত্র প্রসার রোধ নিয়ে ও তারই সঙ্গে “বড় আট” দেশের শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা করা হবে. এই বৈঠক হতে চলেছে এই বছরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের পর্যটন কেন্দ্র লখ-এর্ন নামক জায়গায় ১৭ ও ১৮ই জুলাই তারিখে. “বড় আট” দেশের শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতিদের সাক্ষাত্কার হতে চলেছে. আর সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, এই সাক্ষাত্কারের প্রস্তুতিই প্রধান উদ্দেশ্য হয়েছে মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের মস্কো আসার.

দুই দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা গত বছরের জুন মাসে মেক্সিকোর লস-কাবোস শহরে “বড় আট” দেশের শীর্ষ বৈঠকের নেপথ্যে দেখা করেছিলেন. বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন যে, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে ওবামা ও পুতিনের সরাসরি সাক্ষাত্কারে স্পষ্ট ভাবে টের পাওয়া যাবে, কোন দিকে রুশ-মার্কিন সম্পর্ক উন্নতি করবে. কিন্তু এই সাক্ষাত্কার হয়েছিল একেবারেই দেখিয়ে দেওয়ার মতো করেই ঠাণ্ডা.

এবারে রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা আশা করেছেন যে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে দ্বিতীয় প্রচেষ্টা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে পুনরুদ্ধারের চেষ্টাকে আবার করে প্রাণ সঞ্চার করবে. যদিও রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশাবাদীদের চেয়েও নৈরাশ্যবাদীদের সংখ্যা অনেক বেশী. সেই ভাবেই “টেরা আমেরিকা” নামের বিশ্লেষণ সাইটের বিশেষজ্ঞ বরিস মেঝুয়েভ মনে করেন, ওবামা মনে তো হয় না যে, রাশিয়ার জন্য ইউরোপের রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোন রকমের ছাড় দেবেন অথবা সিরিয়ার বিষয়ে. তাই তিনি বলেছেন:

“আমি আমাদের দুই দেশের সম্পর্ককে মনে করি না ট্র্যাজেডি বলে উল্লেখ করার মতো খারাপ বলে. তা এখন রয়েছে এক ঠাণ্ডা শান্তির পরিস্থিতিতে. আমি অন্যান্য অনেকের মতো, মোটেও মনে করি না যে, এই সম্পর্ক “রিসেট” করাতে কোনও লাভ হয় নি. কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন যেমন ইউক্রেন ও জর্জ্জিয়ার ন্যাটো জোটে যোগদানের মতো প্রশ্ন এখন দ্বিতীয় সারিতে গিয়েছে. আর সেই গুলি খুবই বড় ধরনের বিরোধের কারণ হতে পারত. আবার অন্য দিক থেকে আপাততঃ, আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে উন্নতির কোন ভবিষ্যত সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না. প্রাথমিক ভাবে এটা অবশ্যই হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই অবস্থানের জন্য”.

আদর্শ হত রাশিয়ার জন্য, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিরিয়ার চরমপন্থী বিরোধীদের সমর্থন করা বন্ধ করা হত, যাদের বিজয়ের ফলে মস্কোর জন্য উত্তর ককেশাসে খুবই বৃহত্ সমস্যার সূচনা হতে পারে. চাওয়া যেতে পারে যে, ওয়াশিংটন ইউরোপে রকেট বিরোধী ব্যবস্থা গুটিয়ে নেবে. কিন্তু মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের প্রফেসর মিখাইল ত্রইতস্কি মনে করেন যে, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে মুখ্য রকেট বিরোধী ব্যবস্থা বা সিরিয়া নয়, তিনি তাই বলেছেন:

“সমস্যা হল যে, এই সম্পর্কের মধ্য থেকে দেশ দুটির নেতারা নিজেদের জন্য কি চান. তাদের ইতিবাচক গতি প্রকৃতি কতটা নিজেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ. অথবা তাঁরা নিজেরাই নিজেদের দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও সংলাপের প্রকৃতির কাছে কতখানি বাঁধা রয়েছেন. তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে রাশিয়ার জন্য কোনও রকমের বিশেষ অবস্থান তাদের নিজেদের বিশ্ব চিত্রায়ণে উল্লেখ করে নি. এটাও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য কোন সুফল দিতে পারছে না”.

একই সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে, মস্কো ও ওয়াশিংটন সন্ত্রাসের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়ে একে অপরের আরও বেশী কাছাকাছি হতে পেরেছে. রাষ্ট্রপতি ওবামা তাঁর শেষ সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন যে, বস্টন শহরে ১৫ই এপ্রিল ট্র্যাজেডি হওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিশেষ করেই ফলপ্রসূ ভাবে বেড়ে চলেছে, তাই তিনি বলেছেন:

“বস্টন বিস্ফোরণের সময় থেকে রুশীরা আমাদের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করছে. এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, পুরনো অভ্যাস খুবই কঠিন ভাবে ছাড়াতে হচ্ছে. আমাদের দেশ গুলির মধ্যে গোয়েন্দা ও শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে এখনও রয়েছে একে অপরকে সন্দেহ করার প্রবণতা, যার মূল রয়েছে আজ থেকে ১০, ২০, ৩০ বছরেরও বেশী সময় আগে থেকে, যখন থেকে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চালু ছিল. কিন্তু এখন নিয়মিত ভাবেই ভালো হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে. আমি সরাসরি ভাবে পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছি. তিনি খুবই স্থির প্রতিজ্ঞ হয়ে তৈরী আছেন আমার সঙ্গে এই ধরনের পরিষেবার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে. এটা শুধু এই বস্টনের তদন্তের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সব মিলিয়ে সন্ত্রাস বিরোধী প্রশ্নের সমাধানের ক্ষেত্রেও”.

মস্কো শহরে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রকেট বিরোধী ব্যবস্থা নিয়ে আরও বেশী করেই ইতিবাচক সঙ্কেত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আর তারই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সমস্যা নিয়েও. কিন্তু ক্রেমলিনে চাওয়া হয়েছে এই ধরনের সঙ্কেতের সঙ্গে নির্দিষ্ট কাজ কর্মকেও. প্রসঙ্গতঃ, জুন মাসে “বড় আটের” শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে দেখা হওয়ার পরে পুতিন ও ওবামা আবার দেখা করতে চলেছেন ৫-৬ সেপ্টেম্বর, তখন তাঁদের আলাদা করে বৈঠক হবে সেন্ট পিটার্সবার্গে “বড় কুড়ি” দেশের শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে.