যেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরের ম্যারাথন দৌড়ের সময়ে বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল শহর ও তিন জনের নিহত হওয়ার খবর এসেছিল, সেই একই দিনে আফগানিস্তানে, সিরিয়াতে, ইরাকে আর বিশ্বের আরও বহু জায়গায় বহু লোকের প্রাণ হানী হয়েছিল, যা নিয়ে পশ্চিমের সমাজ এক বিন্দু অশ্রু বিসর্জন করতেও রাজী হয় নি. বিশেষজ্ঞরা এই রকমের নিত্য নিয়মিত ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন পশ্চিমের দেশ গুলির নাগরিক ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জীবনের মূল্যের মধ্যে এক বিপর্যয় কারী পার্থক্য দিয়েই.

এই সমস্যা বহুদিন হল রয়েছে. পশ্চিমের দেশ গুলিতে যে কোন রকমের ট্র্যাজেডি পশ্চিমেরই সংবাদ মাধ্যমের কারণে বিশ্বের অন্য যে কোন জায়গাতে তার থেকেও অনেক বেশী দুঃখের ঘটনাকে ছাপিয়ে যায়. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যম গুলি এখানে খুবই লক্ষ্য স্থির করে কাজ করে থাকে, এই রকমই মনে করেছেন রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের কর্মী ইগর খখলভ, তিনি বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিসরে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী ঘটনা, - এটা আমেরিকার জনগনেরই উপরে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণতম কারণ: “এটা সবার সঙ্গেই হতে পারে”, “এটা সেই রকম লোকের সঙ্গেও হতে পারে, যে এসেছে খেলাধূলার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অথবা বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে সুপার মার্কেটে জিনিষ কিনতে”. কোন সন্দেহ নেই যে, লোকে ভয় পাচ্ছে. আর তারা রাষ্ট্রকে নিজেদের পরিত্রাতার ভূমিকায় ভরসা করছে. রাজনৈতিক ও আর্থিক ভাবে স্বার্থান্বেষু লোকরা এই ভীতিকেই নিজেদের জন্য বাজেট বরাদ্দ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সুবিধা আদায়ের জন্য পুরোদমে ব্যবহার করছে. আমেরিকার জমিতেই সন্ত্রাস – এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি ক্যাপিটাল হিলসে হতে যাওয়া আগামী লড়াইয়ের জন্য”.

আধুনিক সন্ত্রাসবাদীরা বুঝতে পারে, সরকার কতটা সামাজিক মতামতের উপরে নির্ভর করে রয়েছে. তাই আজ সন্ত্রাসের বিচার কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা দিয়ে করা হয় না, করা হয় সংবাদ মাধ্যমে কতটা পরিসর জুড়ে তার উপস্থিতি, তা দিয়ে. প্রসঙ্গতঃ এই ক্ষেত্রে সাধারন মার্কিন নাগরিকের জন্য সাধারন আফগান নাগরিকের জীবনের মূল্য সব মিলিয়ে, নগণ্য.

বাক্ স্বাধীনতা নিয়ে চালাকি করা গণতান্ত্রিক দেশ গুলিতে নাগরিকদের এক ধরনের শো এর নীরব দর্শকে পরিণত করে দেয়, যে শো কি দিয়ে তৈরী হবে ও তার পরিণতি কি হবে, তা ঠিক করে সংবাদ মাধ্যমই.

খুব সম্ভবতঃ, এখানে সমস্যা ততটা পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যম নিয়ে নয়, যতটা পশ্চিমের থেকে বিশ্ব ভাবনার. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার সাংবাদিক ও সমাজ কর্মী আলেক্সেই চাদায়েভ বলেছেন:

“আমি মনে করি যে, এখানে ব্যাপার শুধু সংবাদ মাধ্যমের নয়. স্রেফ ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ইত্যাদি দেশের এলাকা এখন আর নিরাপদ বলে ভাবা হয় না. এখানে প্রধান প্রশ্ন হল – কোথায় সন্ত্রাসের কাজ কারবার হচ্ছে. পশ্চিমের সভ্যতার কেন্দ্রে বিস্ফোরণকে অন্য ভাবে দেখা হয় আর সংবাদ মাধ্যম এটা থেকেই সম্পূর্ণ মানের ইতিহাস রচনা করে ফেলে”.

পশ্চিমের তরফ থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়ে যা ঘোষণা করা হয়েছে, তা একটা ভাল কারণ হয়েছে অন্যান্য দেশকে শেখাতে যাওয়ার জন্য. এই সব ক্ষেত্রে পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যম সব সময়েই নিজেদের রাজনীতিবিদদের সমর্থন করে থাকে. তারই মধ্যে, সেই সমস্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের জীবনের দাম, আর যে কোনও ধরা যাক, এশিয়ার দেশের নাগরিকরে জীবনের দাম, একেবারেই সমান. কিন্তু এই ক্ষেত্রে পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যমে সাম্যের নীতি মেনে চলার চেষ্টা দেখাই যাচ্ছে যে কেউই করতে যাচ্ছে না.