মে মাসের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তানে এক লক্ষ্য স্থির করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বৃদ্ধি হয়েছে. দুঃসাহসী সব আক্রমণের লক্ষ্য যার দায়িত্ব নিয়েছে তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান বা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সন্ত্রাসবাদী দল, তারা রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধি বা স্বাধীন প্রার্থীদের, যারা সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছেন, তাঁদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করছে. তালিবরা গোপন করছে না যে, তাদের লক্ষ্য – ভোট না হতে দেওয়া ও পাকিস্তানের এক ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ার পথে বাদা দেওয়া. বর্তমানে, যখন ভোটে দাঁড়ানো হয়ে যাচ্ছে এক মৃত্যুভয় থাকার মতো বিপজ্জনক কাজে পরিণত হচ্ছে, তখন দেশ খুবই শেষ অবধি বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে যে, তালিবরা দেশের রাজনৈতিক আধুনিকীকরণের সবচেয়ে বড় শত্রু. তাদের সঙ্গে যে কোন ধরনের খেলা করতে যাওয়ার রাজনীতি দেশের স্বার্থেই অপরিমেয় ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে.

১১ই মে হওয়ার কথা থাকা দেশের লোকসভা ও প্রদেশ গুলির বিধানসভার নির্বাচনের যখন দুসপ্তাহেরও কম সময় রয়েছে, তখন পাকিস্তান এক রক্তাক্ত উইক এন্ড দেখতে বাধ্য হয়েছে. রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ম্যারাথন, যা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই দেশে শুধু ক্ষমতায় প্রবেশ করাই নয় এমনকি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নিতে চাওয়া এখন মৃত্যু হতে পারে এমন বিপজ্জনক কাজে পরিণত হতে পারে.

রবিবারে হিংসার কেন্দ্র বিন্দু হয়েছে পাকিস্তানের উত্তর –পশ্চিমে খাইবার পাখতুনভা প্রদেশের কোহাট শহর. প্রথমে বাম পন্থী আওয়ামী জাতীয় দলের দপ্তরের সামনে এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়েছিল. আর তারপরে দেশের লোকসভায় স্বাধীন প্রার্থী সাংসদ নুর আহবাক খানের অফিস বোমায় ধ্বংস করা হয়েছে. সব মিলিয়ে কোহাট শহরের এই ঘটনায় সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু লোক, তাঁদের মধ্যে নয় জন মৃত ও ২০ জনেরও বেশী আহত. পেশোয়ার শহরেও একই ধরনের অন্তর্ঘাতের কাণ্ড হয়েছে. সেখানে এক বিস্ফোরণ, যা স্বাধীন প্রার্থী নাসের খান আফ্রিদির অফিসে হয়েছে, তাতে কয়েক জনের মৃত্যুও হয়েছে.

এর ঠিক একদিন আগে শনিবারে করাচী শহরের রাজনৈতিক দল গুলির অফিসেও অনেক গুলি হামলা হয়েছে. পাঁচজন নিহত হয়েছেন ও জনা দশেক লোক আহত হয়েছেন.

এই সব আক্রমণের দায়িত্ব নিয়েছে তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান দল. তাদের প্রতিনিধি আনসানুল্লা হাসান এই সব রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কারণ খুবই নির্দিষ্ট করে বলেছে: আমরা সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরই বিরুদ্ধে, যারা গণতান্ত্রিক ধর্ম নিরপেক্ষ দেশের সরকারের অংশ হতে চায়.

মনে করিয়ে দিই যে, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শুরু এই বারের নির্বাচনী প্রচারের সময়ে শুরু হয়েছে এপ্রিল মাসের শুরুতে দেশের দক্ষিণে হায়দরাবাদ শহরে, যখন ধর্ম নিরপেক্ষ মত্তাহিদা কোমি আন্দোলনের প্রার্থীকে খুন করা হয়েছিল.তখনই তালিবরা নিজেদের প্রধান শত্রু হিসাবে ধর্ম নিরপেক্ষ পথে চলা তিনটি মুখ্য রাজনৈতিক দলের নামই করেছিল: ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি, আওয়ামী জাতীয় দল ও মত্তাহিদা কোমি আন্দোলন.

এই প্রসঙ্গে ভয় দেখানোর জন্য প্রচার শুধু রাজনীতিবিদদের জন্যই করা হচ্ছে না, বরং সাধারন ভোটারদের জন্যও করা হচ্ছে. নির্বাচনের আগে তালিবানের সক্রিয় কর্মীরা দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় দেশের লোকজনকে একই সঙ্গে মরার ভয় দেখিয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত করতে চাইছে. তাই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানকে ঐস্লামিক চরমপন্থার আঁতুড়ঘর হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষার গ্যারান্টি হয়েছিল দেশের সামরিক বাহিনী. কিন্তু এই ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তারা ও দেশের গুপ্তচর বাহিনীর নেতৃত্ব তালিবদের সঙ্গে অলক্ষ্যে খেলা করার নীতি নিয়ে চলেছিলেন, কারণ তাঁরা এদের দেখেছিলেন নিকট যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে, কোন না কোন সমস্যা সমাধানের দাওয়াই হিসাবেই. দেশ দেখতে পেয়েছে তালিবদের পোষ্য বানানোর চেষ্টা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে. কারণ যখন নির্বাচনে অংশ নেওয়াই হয়ে দাঁড়াচ্ছে মৃত্যুভয় সমান কাজের মতো, তখন কারও মনে সন্দেহের ছায়াও থাকতে পারে না যে, তালিবরা রাজনৈতিক আধুনিকীকরণের প্রধান শত্রু থেকেই যাচ্ছে, তারাই দেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে. আর তার মানে হল নেকড়েদের সঙ্গে যে কোন রকমের নৃত্যই যদি চলতে থাকে, তবে তা দেশের জাতীয় স্বার্থের উপরে অপরিমেয় ক্ষতির কারণ হতে পারে”.

খুব বেশী করেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, বর্তমানের নির্বাচন, যে সময়ে এই প্রথম পাকিস্তানের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে একটি অসামরিক ক্ষমতাসীন প্রশাসন অন্য একটিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চলেছে – তখন এটা শুধু রাজনীতিবিদদের প্রতিযোগিতাই নয়, যতই তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরের পার্থক্য থাকুক না কেন দৃষ্টিকোণের বিষয়ে. ১১ই মের নির্বাচন - এটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি পোক্ত হওয়ার পরীক্ষাও বটে. তাকে আরও প্রমাণ করতে হবে চরম ও খারাপ অবস্থার মধ্যেও কাজ করার মতো বলে, যা ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের শত্রুরা তৈরী করেছে – তালিবান আন্দোলনের লোকরা.