ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি, যা বুধবারে বাংলাদেশে হয়ে গিয়েছে ও কয়েক শো লোকের জীবন হানীর কারণ হয়েছে, তা একই সারিতে প্রশ্ন গুলিকে বসিয়ে দিয়েছে: কে দোষী? কে দায়ী যে এই রকম বাড়ী তৈরী করা হয়েছে কোন রকমের প্রযুক্তিগত নিয়মই না মেনে? কারা দোষী যে প্রয়োজন মত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না নিয়ে কাজের আয়োজন করা হয়েছে বলে? শেষমেষ, এমনকি যখন প্রথম লক্ষণ দেখতে পাওয়া গিয়েছিল যে, এই বাড়ী ভেঙে পড়তে বসেছে, তারপরেও কর্মচারীরা নিজেদের জায়গায় কার জন্য থাকতে বাধ্য হয়েছিল? উত্তর একটাই: দোষী পশ্চিমের কোম্পানীগুলির লোভ, যারা এই সস্তা কাজের লোকদের শোষণ করেছে. আর এই লোভ আরও বেশী করেই স্থানীয় কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি দিয়ে মজবুত হয়েছে.

রানা প্লাজা নামের এই বাড়ী ঢাকার উপকণ্ঠে ভেঙে পড়েছে, এতে বেশ কয়েকটি কারখানা ছিল, যারা বড় পশ্চিমের কাপড়ের কোম্পানীদের জন্য কাজ করত, আর এখন অবধি খবর পাওয়া গিয়েছে যে, ৩০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে. কিন্তু এটা বোঝাই যে, শেষ অবধি সংখ্যা হবে না: কারণ এই পুরো বাড়ীতে ছিল তিন হাজারের বেশী লোক, আর তাদের মধ্যে দুই হাজারের মত লোককে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে.

বর্তমানের মত ট্র্যাজেডি, মোটেও প্রথম নয়. গত বছরের নভেম্বর মাসেই তাজরীন ফ্যাশনস নামের কাপড়ের কারখানায় আগুন ধরেছিল, আর সেই আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ১১৭ জন. তখন এই কারখানার আগুনের জন্য সারা দেশ জুড়ে বহু বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোন বাস্তবে লাভ হয় নি.

আর এবারে এই নতুন আরও বেশী বিপর্যয় ঘটানো কাণ্ড সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি. এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ভেঙে পড়ার মতো প্রথম চিহ্ন আগেই দেখতে পাওয়া গিয়েছিল. শ্রমিকরা ফাটল দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে খবর দিয়েছিল নিজেদের কর্তাদের. পুলিশ থেকে নির্দেশ এসেছিল এই বাড়ী থেকে লোকজনকে বের করে দেওয়ার জন্য. কিন্তু এখানের কারখানা মালিকরা, যারা প্রিমার্ক, বনমার্ক ইত্যাদি নামী ব্র্যান্ডের জন্য জামা কাপড় বানিয়ে দেয়, তারা শ্রমিকদের আদেশ দিয়েছিল বুধবার সকালে কাজে আসতে, ছাঁটাই করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে. প্রসঙ্গতঃ, উল্লেখ করা দরকার যে, এখানের কাপড়ের কারখানার বেশীর ভাগ শ্রমিকই – মহিলা, অনেকের বাচ্চাও রয়েছে, আর এই বাড়ীতে বিশেষ করে জায়গা করে রাখা ছিল, যাতে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের সেখানে রেখে কাজ করতে পারে. সুতরাং এই ধ্বংসস্তূপের তলায় আপাততঃ অজানা সংখ্যায় রয়েছে প্রচুর বাচ্চাও. রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি তাই বলেছেন:

“বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই পশ্চিমের বহু বিখ্যাত কোম্পানীর জন্য কাপড় জামা বানানোর একটা কারিগর শালায় পরিণত হয়েছে. এখানে শুধু একটাই আকর্ষণ করে তাদের: দারুণ সস্তায় কাজের লোক পাওয়া যায় বলে. যে দেশে জীবনযাত্রার মান দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবচেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে, আর জনসংখ্যা – ১৬ কোটিরও বেশী এবং বেকারত্বের সীমা আকাশ ছাড়িয়েছে, সেখানে শ্রমিকরা তৈরী আছে খুব কম বেতনের বিনিময়ে শ্রম সংক্রান্ত একেবারেই নগণ্য কাজের পরিবেশে দিন রাত একটানা কাজ করতে”.

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে – দুর্নীতির সবচেয়ে বেশী মাত্রাও. দুর্নীতি অনুমানের সূচকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশের ১৭৪টি দেশের মধ্যে স্থান হয়েছিল ১৪৪ তম – এমনকি নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের থেকেও নীচে, যদি না মায়ানমার ও আফগানিস্তানকে এই এলাকার বলে ধরা হয়. এটা অনেকদিন ধরেই বহু সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টের অংশ হয়েছে: কারণ জানাই রয়েছে যে, বাস্তু নির্মাণ – একটি অত্যন্ত দুর্নীতি গ্রস্ত কার্য ক্ষেত্র. আর দেখার মতো সেটাও যে, এই বাড়ীর মালিক মোহাম্মেদ সোহেল রানা – যে নিজে এই ট্র্যাজেডির আগে সকলকেই ভরসা দিয়ে বলেছিল যে, এই সব ফাটলে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই, - সে নিজেই শুধু এক ব্যবসায়ী নয়, বরং স্থানীয় স্তরে বেশ খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের যুব লীগের স্থানীয় শাখার নেতা. সে এখন আদালতের কাছ থেকে পালিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে, আর ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, তার অনেক উচ্চ স্তরের অভিভাবকও পাওয়া যাবে.

দেখা যাচ্ছে একটা চক্র ব্যুহ. ধরা যাক যে, স্থানীয় শ্রমিকরা নিজেরাই নিজেদের সংগঠিত করতে পারবে, শুধু নিজেদের কাজের পরিস্থিতি ভাল করাই নয়, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সত্যই নিরাপদ ভাবে কাজের ব্যবস্থা করতে পারবে. আর তাতে কি হবে? প্রথমতঃ, তাদের জায়গায় পাওয়া যাবে বহু সহস্র লোক, যারা এই কাজ করার জন্য তৈরী থাকবে, যাতে কোন একটা কাজ পাওয়া যায় গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য. আর দ্বিতীয়তঃ, এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরী হলে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাবে আর তাহলে পশ্চিমের উত্পাদকরা স্রেফ নিজেদের কারখানা তুলে নিয়ে চলে যাবে অন্য দেশে, যেখানে কাজের লোক আরও সস্তায় পাওয়া যায়, যেমন প্রতিবেশী মায়ানমারে, যারা আজ পশ্চিমের ব্যবসার জন্যই খোলা রয়েছে বলে দেখাতে প্রস্তুত হয়েছে.

সুতরাং দুঃখের হলেও বর্তমানের এই ট্র্যাজেডি শুধু প্রথমও যেমন নয়, তেমনই মোটেও শেষ নয়.