বুধবারে ব্রাসেলস শহরে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরির সঙ্গে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান আশফাক পারভেজ কায়ানির. তা শেষ হওয়ার পরে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এই আলোচনাকে বলেছেন “সফল ও গঠনমূলক” ও উল্লেখ করেছেন যে, এই আলোচনা এখন রয়েছে “একটি সঠিক পথেই”. এখানে দেখার মতো হল যে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষরা প্রায় কোন রকম মন্তব্যই করেন নি. আর এর মানে হল যে, আমেরিকার কূটনৈতিক প্রধান যা তাঁর ইচ্ছা, সেটাকেই বাস্তব বলে দেখাতে চাইছেন.

প্রসঙ্গতঃ, এটাও ঠিক যে, মিস্টার কেরি নিজেও এটা বুঝতে পারেন. আলোচনার ক্ষেত্রে প্রগতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি তাও যোগ করেছেন: “আমরা কোন বেশী রকমের আশা করতে পারি না অথবা কাউকে ফলের বিষয়ে আশ্বাসও দিতে পারি না, যা আমরা পাবো না”. তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আসলে আফগানিস্তান থেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করার পরে সেই দেশে ও তার চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তিন মূল অংশগ্রহণকারীকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা খুবই মনে করিয়ে দেয় সেই যুক্তি সংক্রান্ত প্রশ্নের কথাই, যেখানে এক সঙ্গে বাঁধাকপি, ছাগল আর বাঘকে এক জায়গার এমন ভাবে আনার কথা বলা হয়ে থাকে, যাতে কোনটারই ক্ষতি না হয়”.

ব্যাপার হল যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যেক জোড়া দেশেরই অনেক বিরোধ জমা হয়েছে, আর তা এই ত্রিপাক্ষিক স্তরে সমাধানের চেষ্টা করাটাই নিরর্থক. আর এই প্রসঙ্গে বোধহয়, খুবই দেখানোর মতো হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিনিধির চরিত্রটি: প্রতিনিধিদলের প্রধান হয়ে আফগানিস্তানের মতো দেশের রাষ্ট্রপতি আসেন নি, পররাষ্ট্র প্রধান আসেন নি, এসেছেন দেশের সবচেয়ে কর্তৃত্বে থাকা সামরিক প্রধান.

সেটা বোধগম্যও বটে: পাকিস্তানে বর্তমানে রাজনৈতিক ভাবে অনিশ্চয়তার সময় চলছে, যা তৈরী হয়েছে রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির ক্ষমতায় থাকার সময়ের সন্তোষের কারণ না হওয়ার মতো ফলাফলে, আর বর্তমানের সমস্যা গুলি আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে নির্বাচনের প্রাক্কালে. আর কে এই নির্বাচনে জিততে চলেছে, তা এক বড় প্রশ্ন হয়েই আপাততঃ রয়েছে. কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কোথাও যাচ্ছে না, তারা সমস্ত রকমের দেখিয়ে দেওয়ার মতো আচরণ করে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসতে না চাওয়ার ইচ্ছা দেখালেও, আগের মতই সবচেয়ে প্রভাবশালী (আর, খুব সম্ভবতঃ, সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দেশের জনগনের সবচেয়ে বেশী ভরসার উপযুক্ত) শক্তি হয়েই রয়েছে. সুতরাং যে রকমের পরিবর্তনই দেশের অসামরিক নেতৃত্বে আসুক না কেন, সামরিক বাহিনী ১১মে তারিখের পরেও দেশে অনেক কিছুরই সমাধান করবে, যদি বলা হয় যে সবটা নয়, তাও.

বরিস ভলখোনস্কি মনে করেছেন যে, স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে পাকিস্তানের অংশ নেওয়া ছাড়া আফগানিস্তানের সমস্যা ২০১৪ সালের পরে সমাধান করা সম্ভব নয়, তাই তিনি বলেছেন:

“জটিল ব্যাপার হল যে, পাকিস্তানের বিষয়ে বর্তমানের আফগানিস্তানের নেতৃত্ব ভরসা করতে পারছে না, তারা মনে করেন যে, ইসলামাবাদ পুরস্কৃত করে থাকে, এমনকি সরাসরি আফগানিস্তানের তালিবদের সহায়তাও করে থাকে. আর পাকিস্তান নিজে (তাদের অসামরিক সরকার, সামরিক বাহিনী ও নাগরিকরা) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বড় ধরনের সহানুভূতি বোধ করে না, কারণ যেমন এর আগের, তেমনই বর্তমানের মার্কিন প্রশাসন কম চেষ্টা করেন নি, পাকিস্তানের সামনে নিজেদের ইমেজ নষ্ট করার জন্য”.

অন্য আরেকটি, যা খুব একটা গৌণ নয়, তেমন সমস্যা হল যে, আফগানিস্তানে ২০১৪ সালের পরে পশ্চিমের সেনা বাহিনী সম্পূর্ণ ভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই প্রশাসনের বদল ঘটবে. হামিদ কারজাই নিজে আর রাষ্ট্রপতি থাকতে পারবেন না. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে তাঁর জায়গায় অন্তত নিজেদের একজন কাউকে বসাতে, কারজাই – নিজের কোন কাছের লোককে. তার ওপরে ওয়াশিংটন বা আফগানিস্তানের বর্তমানের নেতৃত্ব চান না যে, ক্ষমতায় তালিবরা আসুক. কিন্তু এর মধ্যেও বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, তালিবদের ছাড়া যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের “অঙ্কুশ” থাকবে না, তখন আর স্থিতিশীলতা নিয়ে কিছু বলার থাকবে না.

তাই অবশ্যই, এই আলোচনা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্যই – একটা ইতিবাচক ব্যাপার. কিন্তু, মনে হয় যে, ব্রাসেলস শহরে নেতারা এই কারণেই শুধু এসেছিলেন যে, যাতে আবারও দেখা করা সম্ভব হয় ও নিজেদের আলোচনার বিষয়ে প্রস্তুত থাকাকে দেখিয়েছেন. শুধু দেখতে পাওয়া গেল যে, হয় এই আলোচনা বাস্তব থেকে অনেক খাপছাড়া ভাবে হয়েছে, নয়তো এর যোগদানকারীদের সত্যিকারের পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলার মতো কিছু ছিল না, কিন্তু মনে তো হয় না যে, ব্রাসেলস শহরে যে সব সমঝোতা হয়েছে (যদি তা আদৌ হয়ে থাকে) তা কখনোই বাস্তবায়িত হবে.