সাবেক সামরিক স্বৈরতন্ত্র মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের জট ছাড়ানোর জন্য পশ্চিমের দেশ গুলি এবারে একটা প্রধান পদক্ষেপ নিয়েছে. ইউরোপীয় সঙ্ঘের নেতৃত্ব মায়ানমারের বিরুদ্ধে সমস্ত রকমের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, শুধু অস্ত্র সরবরাহ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে. এই কাজ করেই ব্রাসেলস খনিজ সম্পদে ধনী দেশকে বিতাড়িতদের সারি থেকে তুলে এনে ইউরোপীয় ব্যবসার এক আগামী নেতৃস্থানীয় সহকর্মী দেশের সারিতে বসিয়েছে. মায়ানমার সংক্রান্ত গৃহীত সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় সঙ্ঘকে আহ্বান করা হয়েছে নিজেদের সম্পর্ক মায়ানমারের সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তন করার, যা বেশ কয়েক দশক ধরেই ছিল ঠাণ্ডা ঘরে জমানো অবস্থায়. সেই কালো তালিকাও এবারে বাতিল করা হচ্ছে, যাতে ছিল ইউরোপের মতে গণতন্ত্রকে শ্বাস রুদ্ধ করে মারা ও মানবাধিকার লঙ্ঘণ করার জন্য সামরিক নেতৃত্বের প্রায় পাঁচশো ব্যক্তির নাম ও তাদের কাছের লোকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় আটশোর বেশী কোম্পানী. বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে মায়ানমারের জ্বালানী বাজার, কাষ্ঠ আহরণ শিল্প, খনিজ দ্রব্য নিষ্কাশণ শিল্প ইত্যাদি সমস্ত লাভজনক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় কোম্পানী গুলির বিনিয়োগের রাস্তা খুলে গেল, যা বিগত সময় পর্যন্ত ইউরোপের জন্য ছিল প্রায় অগম্য জায়গা.

কিন্তু মায়ানমারের সম্ভাবনার বাজার নিজেদের কোম্পানী গুলির জন্য খোলার বিষয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ইউরোপ পছন্দ করেছে সেই দেশে বাংলাদেশ থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্যান্য প্রজাতি ও ধর্মের বিষয়ে সংখ্যালঘুদের ওপরে করা অত্যাচারের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে থাকা.

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সংস্থার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীরা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার নাম দিয়েছে, “তোমাদের শুধু বাকী আছে প্রার্থনা করার”. মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও বর্মার আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রজাতিগত ভাবে নির্মূল করে দেওয়া চেষ্টার কথা এই দলিলে লেখা হয়েছে. ১৫৩ পাতার দলিল, যার ভিত্তি হয়েছে এক প্রসারিত ধরনের তথ্য সংগ্রহে, তাতে বহু বাস্তব অত্যাচারের ঘটনাকেই তুলে ধরা হয়েছে, রয়েছে ধ্বংস করে দেওয়া, উচ্ছেদ করে দেওয়া ও জোর করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা, যা এই দেশে করা হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে.

এই রিপোর্ট থেকে যা বোঝা যায়, তা হল যে, মায়ানমারের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী শুধু এই ধরনের আক্রমণকে বাধা দোওয়ার কোন চেষ্টাই যে করে নি তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই নিজেরা উস্কানি দিয়েছে. যেমন, রিপোর্টে গত বছরের অক্টোবর মাসের কথা তোলা হয়েছে, যখন খোলা তরোয়াল, দা, কাটারি, হাতে তৈরী বন্দুক ও মলোতভ ককটেল নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের লোক বলে দোহাই দিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা সেই সব গ্রামকে আক্রমণ করেছিল, যেখানে ঘন সন্নিবদ্ধ ভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাস করে. এই সময়ে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকরা শুধু যে বাধা দিতে আসে নি তা নয়, তারা নিজেরা হয় এই সব ধ্বংসের কাজে হাত লাগিয়েছে অথবা তাতে উস্কানি দিয়েছে. এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এখানে উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হল যে, ইউরোপীয় সঙ্ঘের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, যা দিয়ে মায়ানমারের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হল, কারণ বিগত কয়েক মাস ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই প্রাক্তন সমাজ থেকে বিতাড়িত দেশ সম্বন্ধে অবস্থান পুরোপুরি উল্টে দেওয়া হয়েছে বলে, তা দেখার মতো. এই বছরের শুরুতে মায়ানমারে এসেছেন রাষ্ট্রপতি ওবামা, যিনি এই দেশে আমেরিকার ব্যবসা ফিরে আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন. আর গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাত্সরিক রিপোর্টে মায়ানমারে মানবাধিকার রক্ষা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে যে, এটা সেই সব মুষ্টিমেয় দেশের একটি, যেখানে মানবাধিকার রক্ষা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং অধিকার রক্ষা করার বিষয়ে অনেক অগ্রসর হয়েছে”.

কিন্তু একই সময়ে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তেমনই ইউরোপের সহযোগী দেশ গুলি ইতিমধ্যেই মায়ানমারকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে খুবই “শিষ্ট পড়ুয়া” বলে দলে টেনেছে, যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গুলির নেতাদের এই আশা বাদকে মেনে নিতে পারছেন না”.

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সংস্থা ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন, লকসেমবর্গ শহরে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে বলেছেন “সময়ের আগেই ঘটে যাওয়া”, আর তা খুবই দুঃখজনক বলে. মানবাধিকার রক্ষা কর্মীর মতে, এই সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে, ইউরোপীয় সঙ্ঘ নিজেদের মায়ানমারের উপরে প্রভাব ফেলার অস্ত্রই হারাল. আর এবারে যদি ইউরোপ একদিন নিজেদের গণতন্ত্রের শিক্ষা দাতার ভূমিকায় মনে করতে বসে আর চেষ্টা করে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের প্রশ্ন তুলতে, তাহলে মায়ানমারের সরকারের সমস্ত রকমের ভিত্তিই থাকবে তাদের পরম্পরা মেনে না চলার জন্য অভিযোগ করার. ব্যাপারটা হবে, আপনারা তো নিজেরাই আমাদের গণতান্ত্রিক বিষয়ে সাফল্যের জন্য প্রশংসা করেছিলেন, তাহলে এখন পিছিয়ে যাচ্ছেন কেন.

একবিংশ শতাব্দীর কৌশলেই মায়ানমারে থাকা বাংলাদেশের উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা মুসলমানরা এবারে “বাস্তব রাজনীতির” শিকার হয়েছে. নিজেদের ব্যবসার আগ্রহে, যাদের জন্য মায়ানমার হতে পারে এশিয়ার সোনার খনি, ইউরোপীয় সঙ্ঘ ঠিক করেছে মানবাধিকারের প্রশ্নে চোখ বুজে থাকার. কিন্তু বিগত সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে “ঐতিহাসিক ভাবে শান্তিতে ফেরার” মূল্য পুরনো পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় গণতন্ত্র গুলির জন্য খুবই দামী হয়ে যেতে পারে.