মে মাসে দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনের অব্যবহিত আগে পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফের গ্রেপ্তার হওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে আরও ষড়যন্ত্রের হদিশ দিচ্ছে. রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে আরও এক এখনও যথেষ্ট প্রভাবশালী খেলোয়াড়কে হঠিয়ে দিয়ে প্রাক্তন সামরিক শাসকের বিরোধী পক্ষ, যারা এখন সরকারে পৌঁছতে চাইছে, তারা নিজেদের অপ্রিয় বিস্ময়জনক ঘটনার থেকে বীমা করতে চাইছে, যা তাদের জন্যই দেশে ফিরে আসা মুশারফ তৈরী করতে পারতেন. কিন্তু আইনকে দেশের সমাজে নতুন করে বিভাজন তৈরী করার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের হঠিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হলে তা এখনও দুর্বল পাকিস্তানের গণতন্ত্রের উপরেই আঘাত হানতে পারে.

পাকিস্তানের রাজনীতি যা বিগত সময়ে কম কিছু চরম বাঁক পেরিয়ে আসো নি, তা আবার করেই দেখিয়ে দিয়েছে নিজেদের বিষয়ে পূর্বাভাসের অযোগ্য হওয়াকেই. কেউ কি আগে থেকে ধারণা করতে পারতেন যে, পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক নেতাকে, যিনি এক সময়ে বিশ্বজোড়া সন্ত্রাস বিরোধী পতাকার নীচে নিজেও দাঁড়িয়ে বহু বছর ধরেই নিয়মিত ভাবে তালিবান ও আল- কায়দা দলের জঙ্গীদের গুয়ান্তানামো বন্দী কারাগারে পাঠিয়ে গিয়েছেন, তাঁকেই এখন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত বিশেষ আদালতে বিচার করা হবে? তার ওপরে আবার তাঁকে বিচার করা হচ্ছে তাঁরই জন্মভূমিতে, যেখানে তিনি সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মন্ত্রীসভাকে হঠিয়ে দিয়ে দীর্ঘ আট বছরের জন্য.

কিন্তু ঠিক এটাই হয়েছে. দেশের প্রধান থাকার সময়ে পারভেজ মুশারফের কাজকর্মকে, পাকিস্তানের আইন ব্যবস্থার প্রধান, সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিকার চৌধুরী সন্ত্রাস বলেই চিহ্নিত করতে চাইছেন. ২০০৭ সালে দেশে জরুরী অবস্থা জারী করার পরে মুশারফ বেশ কিছু বিচারপতিকে যে বরখাস্ত করেছিলেন, সেটাকেই সন্ত্রাস বলে দেখা হচ্ছে. আর তারই সঙ্গে- তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকাকেও জোড়া হয়েছে, যা ২০০৬ সালে বেলুচিস্তানের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আকবর ভুট্টো ও বিরোধী দলের নেত্রী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ২০০৭ সালে বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু প্রসঙ্গে ভাবা হয়েছে. অভিযোগকারীরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই দুই রাজনীতিবিদকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোন না কোন ভাবে মুশারফের হাতও ছিল.

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যা প্রায়ই ঘটে থাকে যাদের তাড়ানো হচ্ছে ও যারা তাড়াচ্ছে, শিকার ও শিকার আবারও জায়গা পাল্টেছে. আজ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যা হচ্ছে – এটা পাকিস্তানের রাজনীতিতেই দুই উল্লেখ যোগ্য চরিত্রের মধ্যেই ঘটছে – পারভেজ মুশারফ ও ইফতিকার চৌধুরী.

এই সংগ্রাম আজ বহু বছর ধরেই হচ্ছে, যা হয়েছে সফলতা ও ব্যর্থতা দিয়ে ও যা আজও শেষ হয় নি. প্রথমে ছিল মুশারফের উজ্জ্বল সময় – মনে হয়েছিল যে, তিনিই জিতে যাচ্ছেন. যখন ২০০৭ সালে ইফতিকার চৌধুরী খুবই জোর দিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করেছিলেন ও দেশের এক সবচেয়ে বড় ইস্পাত ঢালাই কারখানা ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে তুলে দেওয়াকে রদ করেছিলেন আর তারই সঙ্গে খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বহু শত পাকিস্তানের মানুষকে, যাদের মনে করা হয়েছিল যে, দেশের গুপ্তচররা ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সঙ্গে যোগ সাজশ রয়েছে বলে. মুশারফ তাঁর প্রভাবশালী বিরোধীকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন. তিনি ইফতিকার চৌধুরী ও আরও ৬০ জন বিচারপতিকে বরখাস্ত করেছিলেন. কিন্তু তার দুই বছর পরে সেই রাষ্ট্রপতি মুশারফের পদত্যাগ ও লন্ডনে নির্বাসনের পরেই ইফতিকার চৌধুরী নিজের পদে ফিরে আসতে পেরেছিলেন.

এই চিহ্নিত হয়ে যাওয়া বিচারপতির ফিরে আসাতে মনে হয়েছিল যে, এটা দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলির স্থাপনের পক্ষে একটা সিদ্ধান্ত মূলক পদক্ষেপ, যা সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের পথে নেওয়া হয়েছে. তখন পাকিস্তানে বলা হয়েছিল যে, প্রধান বিচারপতি চৌধুরী দেশে বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ করবেন ও দেশের শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনের উলম্ব অবস্থানকে ভেঙে দেবেন, যা মুশারফ তৈরী করে গিয়েছেন.

কিন্তু এই ধরনের আশা কতটা পূরণ হয়েছে? আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“মুশারফের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ও তাঁকে গ্রেপ্তার করা এই মে মাসের নির্বাচনের ঠিক আগেই, আবার করেই প্রমাণ করে দেয় যে, সমস্ত রকমের গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সব ঘোষণা স্বত্ত্বেও দুঃখের বিষয় হল যে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখনও যে কে সেই চলছে. সেই সব রাজনীতিবিদ, ক্ষমতার জন্য একই রকমের লড়াই, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বেদনা দায়ক কৌশল – ফৌজদারী মামলা, যদি শারীরিক ভাবে ধ্বংস করা সম্ভব না হয়, তাহলে.

দেশে ফিরে আসা মুশারফকে নির্বিজ করে দেওয়া, যাতে তিনি তাঁর নিজের দল সারা পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতৃত্বে দেশের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তা ওনার প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুবই কাজে লাগতে পারে. তার ওপরে, এটা আবার করা হচ্ছে প্রধান বিচারপতির হাত দিয়ে, আর তার মানে হল যে, এটা যেন একটা রাজনৈতিক বিক্ষোভ বলে মনে না হয়. কিন্তু আসলে মুশারফের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী – বিচার পতি চৌধুরী নন, বরং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, যিনি জেনারেলের দ্বারা ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন.

নানা ধরনের জনমত থেকে দেখা যাচ্ছে যে, এবারে ক্ষমতায় আসার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে তাঁরই মুসলিম লীগ দলের.আর মুশারফ নিয়ে যা বলা যেতে পারে যে, তাঁর অবস্থান এতটা মজবুত না হলেও, তিনি দেশের পার্লামেন্টে নিজের জায়গা পেতেই পারতেন, যদি তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হত, তাহলে. কিন্তু নওয়াজ শরীফের কি জন্যে দরকার হবে, তত শক্তিশালী না হলেও পরে অবস্থা বুঝে তাঁকেই নতুন করে আঘাত হানার মতো প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের, যা হয়েছিল আজ থেকে সেই ১৪ বছর আগে? নিজেকে অপ্রিয় সব চমক থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায়, যা মুশারফের জন্য করা যেতে পারে, তা হল তাঁকে সন্ত্রাসের অভিযোগে জেলে বন্দী করে রাখা”.

কিন্তু আইনকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করা হলে, তা দেশের সমাজেই নতুন করে বিভাজন নিয়ে আসতে পারে. একটা বিপদ রয়েছে যে, দেশ ক্রমাগত সেই ঐতিহাসিক চক্রেই রাজনৈতিক ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকবে, যখন শিকার ও শিকারী নিজেদের জায়গা স্রেফ পাল্টাতেই থাকবে. আর তার ফলে নিজের মুখ্য লক্ষ্যেই পৌঁছতে পারবে না – সম্পূর্ণ গণতন্ত্রে.