ক্ষমতার ভার যতই দুঃসহ হোক না কেন, সর্বদাই এমন লোকেদের দেখা পাওয়া যায়, যারা যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে. তারা সেজন্য যে কোনো উপাদান ব্যবহার করেঃ ষড়যন্ত্র, ঘুষ, প্রতারণা. আরাধ্য লক্ষ্য সাধন করার মরিয়া প্রচেষ্টায় অনেক বেহিসাবী লোক অন্যের নাম ভাঙায়, নিজেদের পরিচয় দেয় বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি বা তার উত্তরসূরী বলে. সেরকম কিছু লোক বিশ্বের ইতিহাসে ছাপ রেখে গেছে. রাশিয়াতেও সেরকম চরিত্র কম ছিল না. অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে এক হঠকারী, যে নিজের পরিচয় দিত ‘রাজকন্যা তারাকানোভা’ বলে, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনাকে.

১৭৭২ সালে প্যারিসে আবির্ভাব হয়েছিল সুন্দরী এক যুবতীর. বুদ্ধিদীপ্তা, শিক্ষিতা, শিল্প সম্পর্কে আগ্রহী. তার কয়েকটি ভাষায় দখল ছিল, তিনি হার্প বাজাতেন. তার চারিদিকে আনাগোনা করতো ধনী অনুরাগীদের দল. কেউ জানতো না তার আসল নাম, সঠিক বয়স, জাতিঃ সুন্দরী প্রায়ই ঐসব বদলাতো, যেমন বদলাতো শহর, দেশ. বলাবলি করা হতো, যে সুন্দরী নাকি পারস্যের, নাকি রুশদেশের. প্যারিস অপেক্ষা করে ছিল বোমা ফাটার. নামভাঁড়ানো মহিলা নিজেকে প্রয়াত রুশী সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথের ও তাঁর এক ঘনিষ্ঠ প্রেমিকের কন্যা বলে ঘোষণা করলো. সেইভাবেই সে রাশিয়ার সিংহাসনের উপর নিজের অধিকার ঘোষণা করলো, যেখানে আসীন ছিলেন দ্বিতীয় একাতেরিনা.

সেসময় রাশিয়ায় পরিস্থিতি ছিল অশান্ত. দেশ তুরস্কের সাথে কঠিন যুদ্ধে জড়িয়ে ছিল, আর উরাল অঞ্চলে কাজাক এমিলিয়ান পুগাচোভের নেতৃত্বে কৃষক অভ্যুত্থানের ঝড় বয়ে যাচ্ছিল. পুগাচোভ নিহত সম্রাট তৃতীয় পিটারের নাম ভাঙাচ্ছিল. এইভাবেই, সম্রাজ্ঞী একাতেরিনাকে মুখোমুখি হতে হল দুই জালিয়াতের.

রাজকন্যা, রাশিয়ায় যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘তারাকানোভা’, তুমুল কর্মকান্ড শুরু করলো. সে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত্ করতে শুরু করলো, তুরস্কের সুলতান ও পুগাচোভের কাছে বার্তা পাঠালো. লক্ষ্য ছিল একটাই – একাতেরিনাকে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করা. বার্তাগুলো প্রাপকরা পাওয়ার আগেই হস্তগত করা হল ও সম্রাজ্ঞীর কাছে পাঠানো হল. বিপদের সঠিক মূল্যায়ণ করে সম্রাজ্ঞী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেদিলেন. ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ইতালির লিভোর্নো শহরে রুশী নৌবাহিনীর ঘাঁটি অবস্থিত ছিল. সেখানে সামরিক স্কোয়াড্রনের নেতৃপদে ছিলেন একাতেরিনার নিকটতম প্রেমিক গ্রিগোরি অরলোভের অন্যতম আপন ভাই আলেক্সেই. তিনি ছিলেন খুবই বলিষ্ঠ, অতীব সুদর্শন, প্রখর বুদ্ধিমান এবং একান্ত বিশ্বস্ত.

একাতেরিনা তাকে আদেশ দিলেন যে কোনো মূল্যে জালিয়াত মহিলাকে তার জাহাজে প্রলুব্ধ করে নিয়ে এসে, তাকে সেন্ট-পিটার্সবার্গে পৌঁছে দেওয়ার. রাজকন্যা তারাকানোভা অরলোভের কাজ সহজ করে দিল, তাকে রুশী রাজসিংহাসনে আসীন হতে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়ে পত্র পাঠিয়ে. এ্যাডমিরাল অবিলম্বে সম্মত হয়ে তারাকানোভাকে আমন্ত্রণ জানালেন লিভোর্নোয়. নামভাঙানো মহিলার সাথে সাক্ষাত করে তিনি নিজের স্কোয়াড্রনকে তার কাজে নিয়োজিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেন. অরলোভ জালিয়াত রাজকন্যাকে এতটাই মোহিত করলেন, যে সে পুরোপুরি অরলোভের উপর আস্থা রাখতে শুরু করলো.

পরিকল্পনা ফল দিল. ১৭৭৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী অরলোভ তারাকানোভা ও তার কয়েকজন ঘনিষ্ট সমর্থককে রুশী নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার নিমন্ত্রণ জানালেন. সবচেয়ে বড় সমরজাহাজে তাকে অভ্যর্থণা জানানো হল সম্রাক্ষীর মতো, নাবিকরা তার নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগলো. রাজকন্যা সুখে বিগলিত হয়ে পড়লো. জাহাজ উন্মুক্ত সাগরে পাড়ি দিল.

তীর থেকে অনেকটা দূরে এসে অফিসাররা তারাকানোভা ও তার সঙ্গীদের গ্রেপ্তার করার কথা ঘোষণা করলেন. বৃথাই তারাকানোভা অরলোভের সাথে সাক্ষাতের দাবী করতে লাগলো, অফিসারদের ভয় দেখাতে লাগলো, নিজের ধমনীতে জারের রক্ত বওয়ার কথা বলতে থাকলো. তার জন্য সবকিছুর অবসান ঘটলো. বন্দিনীকে সেন্ট-পিটার্সবার্গে নিয়ে এসে পিটার এ্যান্ড পাভেল দূর্গে বন্দী করা হল. একাতেরিনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল জানা, যে আসলে নামভাঙানো মহিলাটি কে. স্বয়ং সম্রাজ্ঞী জেরাকারীদের জন্য প্রশ্নপত্র সংকলন করেছিলেন. কিন্তু রাজকন্যা আজব সব কাহিনী বলতে লাগলো, যা এ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের যোগ্য. এই সে নাকি জার্মানীতে থাকতো, এই সে থাকতো রাশিয়ায়, এই পারস্যে. সমর্থকরা তাকে রাজকন্যা বলে সম্বোধন করতো, তাকে আশ্রয় ও অর্থ দিত, বহু শত্রুর কাছ থেকে আড়াল করতো. সে গোপণ সব দলিলের কথা জানাতো, যে সব নাকি তার জার বংশের বংশধর হওয়ার প্রমাণ দেয় ও সে সব নাকি তার অনুগামীদের হেফাজতে রয়েছে. সম্ভবতঃ তারাকানোভা নিজেই বোধহয় সত্যের সাথে কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা গুলিয়ে ফেলেছিল. একাতেরিনা জালিয়াতকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, জনসমক্ষে সিংহাসনের ওপর দাবী ত্যাগ করা ও নিজের আসল পরিচয় জানানোর বিনিময়ে. এটা আগ্রহোদ্দীপক, যে বন্দিনী নিজেকে প্রতারক স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিল এই বুঝে, যে সেজন্য তার জীবন বলি দিতে হবে. কারাবন্দী জীবনে তারাকানোভার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো, সে মারা যায় ১৭৭৫ সালের শেষদিকে. মহিলা যে কে ছিল, তা রহস্যের আড়ালেই থেকে গেল. আর সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনা শত্রুদের নিধন করে আরো ২০ বছরেরও বেশি সময় রাশিয়ার শাসনক্ষমতার অধিষ্ঠাত্রী ছিলেন. বিশ্ব ইতিহাসে তিনি গ্রেট বা মহতীর শিরোপা পেয়েছেন.