মঙ্গলবারে চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি ভাবে প্রথমবার একটি দলিল প্রকাশ করেছে (তথাকথিত শ্বেত পত্র), যাতে দেশের সামরিক বাহিনীর পরিসংখ্যান ও প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বিশদ ভাবে দেখানো হয়েছে. এই সূচক গুলির প্রথমটিতে (সামরিক বাহিনীর লোকসংখ্যা ১৪ লক্ষ ৮০ হাজার) চিন বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে, আর দ্বিতীয় (প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের সমান) সূচকে চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে খুব আত্মবিশ্বাসী ভাবেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে. এই রিপোর্ট প্রকাশের পরে বিশ্বে খুবই সাবধানী প্রতিক্রিয়া দেখতে পাওয়া গিয়েছে, বিশেষ করে ভারতে, যে দেশের রাজনীতিবিদেরা নিজেদের উত্তরে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা নিয়ে কথা প্রায়ই ভাষণে বলছেন, আর সামরিক বাহিনী বিশাল সব মহড়া করছে, যাতে একই সঙ্গে দুটি ফ্রন্টে যুদ্ধের তালিম নেওয়া হচ্ছে.

এই শ্বেত পত্রের লেখকরা সব কিছু দিয়েই বিশেষ করে উল্লেখ করতে চেয়েছেন যে, চিনের সামরিক নীতি দেশের শান্তিপূর্ণ বিকাশের লক্ষ্য সাধনের জন্যই নেওয়া হয়েছে. চিন কখনোই নিজেদের অধীনে কাউকে আনার দিকে লক্ষ্য স্থির করবে না ও সামরিক ভাবে নিজেদের এলাকা বাড়াতে যাবে না – বলা হয়েছে এই দলিলে.

একই সময়ে লেখকরা লুকোতে চাইছেন না যে, চিনের পক্ষ থেকে এই দলিল প্রকাশ প্রায় দেড় বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে এশিয়ার দিকে স্ট্র্যাটেজিক দিক পরিবর্তনের প্রত্যুত্তর হিসাবেই করা হয়েছে, যা এখনও এই লেখকদের মতে প্রায়ই এই এলাকায় পরিস্থিতিকে খুবই বেশী করে আরও উত্তেজক করে তুলেছে.

একই সঙ্গে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একা ভাবে নি যে, এই দলিল তাদের দিকেই লক্ষ্য করে তৈরী করা হয়েছে. খুবই তড়িত্পৃষ্ট হয়ে এই শ্বেত পত্রের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম. “টাইমস অফ ইন্ডিয়া” খবরের কাগজে মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে যে, এই রিপোর্টে চিনের সামরিক বাহিনীর লোকসংখ্যা খুবই বেশী করে কমিয়ে দেখানো হয়েছে. বিশেষজ্ঞরা তার মূল্যায়ণ করে থাকেন প্রায় ২৩ লক্ষ বলে. আর যদি মনে করা হয় যে, এই রিপোর্টে চিনের স্ট্র্যাটেজিক পারমানবিক বাহিনীর কথা ধরা হচ্ছে না – দ্বিতীয় সাঁজোয়া বাহিনী, যাদের লোকসংখ্যা বিভিন্ন মূল্যায়ণ অনুযায়ী নব্বই থেকে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য, তবে তাও সরকারি সংখ্যা বিশেষজ্ঞদের পরিসংখ্যান থেকে অন্যরকমই থেকে যাচ্ছে. প্রসঙ্গতঃ, এখানে বিষয়টি ততটা ও সবটাই সংখ্যার নয়, এই রকম মনে করে রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন”

“বিগত বছর গুলির তুলনায় আজ যখন এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় উত্তেজনা সবচেয়ে চরমে পৌঁছেছে, তখ আরও বেশী করেই গুরুত্ব পেয়েছে স্ট্র্যাটেজির প্রশ্ন. আর এই স্ট্র্যাটেজি মোটেও সরল ও একদেশদর্শী নয়, বরং তার চরিত্র ব্যাখ্যা করা যেতে পারে বহুমাত্রিকতা ও পরোক্ষ বিরোধ দিয়েই, যখন প্রধান ক্রীড়নকরাই চেষ্টা করছে নিজেদের বিশ্বস্ত প্রতিনিধিদের পিঠের পিছনে লুকিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার, সেই সব দেশের পিছন থেকে, যারা কম প্রভাবশালী দেশ.

যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় উপস্থিতি বৃদ্ধি করেও সব রকমের চেষ্টা করছে চিনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার. আর একই সময়ে চাইছে চিনকে তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তুলতে.

বিশেষ জায়গা নিয়েছে মার্কিন এই স্ট্র্যাটেজিতে ভারতবর্ষ, যাদের চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রয়েছে বহু জটিল ও অসমাধিত প্রশ্ন. কিন্তু যেমন ভারতের, তেমনই চিনের কোনও সরাসরি যুদ্ধের প্রয়োজন নেই. আর তাই দুই দেশেরই রাজনীতিবিদরা চাইছেন নৈকট্য নিয়ে প্রস্তুতি প্রদর্শন করতে”.

গত সপ্তাহে চিনে গিয়েছিল ভারতের একটি উচ্চপদস্থ সামরিক প্রতিনিধি দল, যারা সেখানে ২০১০ সালের পরে বন্ধ হয়ে যাওয়া যৌথ সামরিক মহড়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছে. আর মে মাসে চিনে যাচ্ছেন ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ. কে. অ্যান্টনি, যিনি সেখানে সামরিক ক্ষেত্রে বহু প্রসারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন. তার ওপরে, মঙ্গলবারে যেমন ঘোষণা করা হয়েছে যে, মে মাসের মাঝামাঝি ভারতে আসছেন চিনের নতুন রাষ্ট্রীয় সভার প্রধান লি কেকিয়াং. এটা হবে নতুন পদে অভিষিক্ত হওয়ার পরে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর.

এই ভাবেই, রাজনৈতিক আলোচনা চলছে, আর দুই পক্ষই প্রদর্শন করছে নৈকট্য বাড়ানোর ইচ্ছা. এটা কিন্তু মোটেও সমস্ত পরস্পর বিরোধী প্রসঙ্গ কমিয়ে দিচ্ছে না, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ঠিক সেই ভাবেই যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে চিনকে এই এলাকায় নিজেদের প্রতিবেশীদের উপরে ক্ষেপিয়ে দিতে, তেমনই চিনও খুঁজছে নিজেদের বিশ্বস্ত প্রতিনিধিদের, ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যেই. এই ক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানের উপরেই বাজী ধরেছে. ভারতে, স্বাভাবিক ভাবেই, এটা হিসেবের মধ্যে না এনে পারা যায় নি. আর তাই মার্চ মাসের শেষে – এপ্রিলের শুরুতে ভারতে শুধুশুধুই বিমান বাহিনীর একই সাথে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের মহড়া করা হয় নি”.

0যতক্ষণ রাজনীতিবিদরা শান্তি ও সহযোগিতার কথা বলছেন, ততক্ষণ সামরিক বাহিনীর লোকরা তৈরী হচ্ছে আরও কম ভাল ঘটনা পরম্পরার জন্যই. আর এর থেকে এশিয়া মহাদেশে যে আরও সব নতুন (তা সম্ভাব্য হলেও) যুদ্ধের সীমারেখা তৈরী হলেও, আপাততঃ, তা থেকে লাভবান হচ্ছে মাত্র একটি পক্ষই, যারা এই এলাকার সঙ্গে কোন ভাবেই কোন সম্পর্ক রাখে না অথচ চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিবাদ বাঁধাতে, স্রেফ নিজেদের সুবিধার জন্যই.