আসাদের পতন হলে আর সিরিয়া থাকবে না. এই দেশ ভৌগোলিক এবং প্রজাতি ও ধর্মের দ্বন্দ্বে বিভাজিত হয়ে যাবে. আর এই এলাকায় প্রধান কার্যকরী শক্তিতে পরিণত হবে চরমপন্থী ঐস্লামিক গোষ্ঠীরা. এই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জেমস ক্ল্যাপার. এখন প্রশ্ন হল, কেন এই ব্যাপারটা ডিরেক্টর ক্ল্যাপার এত দেরীতে বুঝলেন?

সিরিয়ার বিরোধের পরিবর্তন নিয়ে পূর্বাভাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের ডিরেক্টর জেমস ক্ল্যাপার তাঁর বক্তব্য উপস্থিত করেছেন কংগ্রেসের গোয়েন্দা পরিষদের সদস্যদের সামনে. তিনি বিশেষ করে মনোযোগ দিয়েছেন সিরিয়ার বিরোধীদের মধ্যে চরমপন্থী ঐস্লামিক গোষ্ঠীদের বিষয়ে. ক্ল্যাপার যা বলেছেন, তা হল যে, ঐস্লামিক চরমপন্থীরা আজ সিরিয়ার ১৪টি রাজ্যের মধ্যে ১৩টিতেই কাজ করছে. প্রধান গুপ্তচর সাবধান করে দিয়েছেন: বিরোধীদের মধ্যেই বিভাজন বাড়ছে. আর এটাই প্রধান কারণ হতে পারে দেশের “টুকরো” হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে, যদি বাশার আসাদের প্রশাসনের স্বপক্ষে থাকা লোকেদের উপরে বিরোধী জঙ্গীরা জয়ী হয়, তাহলে.

ক্ল্যাপার নতুন কিছুই আবিষ্কার করেন নি. ইস্তাম্বুলে ও কায়রো শহরে থাকা সিরিয়ার প্রবাসী লোকরা – এরা স্রেফ বিরোধী পক্ষের “সভ্য বাইরের চেহারা”, যা পশ্চিম বিশ্বকে দেখাচ্ছে. বাস্তবে বিরোধী পক্ষের ক্ষমতা রয়েছে চরমপন্থীদের হাতেই. আর পশ্চিমের জন্য এটা মোটেও নতুন খবর নয়, - এই রকম বিশ্বাস করেই রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের আরব গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস দোলগভ বলেছেন:

“সিরিয়াতে ঐস্লামিকদের সহায়তা দেওয়া চলছে, যাদের হাতে পশ্চিম চাইছে বাশার আসাদের নেতৃত্বকে হঠিয়ে দিতে. এটা পশ্চিমের সেই ধরনের রাজনীতি, যা তারা আফগানিস্তানে ১৯৮০র দশকে গৃহযুদ্ধের সময় থেকেই ব্যবহার করে আসছে. অর্থাত্ নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে চরমপন্থীদের ব্যবহার করা. পশ্চিম আশা করেছে যে, আসাদকে হঠিয়ে দেওয়ার পরে সিরিয়া নিকটপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকেই মুছে যাবে. তার পরে পশ্চিমের পক্ষে অনেক সহজ হবে ইরানের উপরে আঘাত হানার”.

অন্য ভাবে বলতে হলে, আমেরিকার লোকরা এই এলাকাতে সেই পরিস্থিতিতেই পৌঁছে গিয়েছে, যার জন্য তারা লড়াই করেছে. কিন্তু এবারে, সম্ভবতঃ, ওয়াশিংটনে বোঝা হয়েছে যে, তারা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে. রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আঝদার কুরতভ মন্তব্য করে বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে পর্যন্ত বন্ধ থাকা সেই সিন্দুক খুলে ফেলেছে, যার থেকে বেরিয়ে পড়েছে একেবারেই নানা রকমের সব শক্তি. আর এই সব শক্তির মধ্যে তারাই বিজয়ী হবে, যারা প্রস্তাব করবে সব থেকে সাধারণ সমাধান – তা হোক না সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর রক্তাক্ত উপায়ে সমস্যা সমাধানের পথ. সিরিয়ার ধর্ম নিরপেক্ষ প্রশাসনের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উত্তর অতলান্তিক জোটের সঙ্গীরা নিজেদের জন্যই সমস্যার সৃষ্টি করে ফেলেছে. এটা আমেরিকার রাজনীতির একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য – পরিণতি নিয়ে চিন্তা না করা”.

এখন সেই আমেরিকাতেই অনেকে সাবধান করে দিচ্ছেন: ওয়াশিংটন ও তাদের জোট সঙ্গীরা সিরিয়াতে বিপজ্জনক খেলা শুরু করেছিলেন. কিন্তু এই প্রক্রিয়া এখন অনেক দূর চলে গিয়েছে – বহু সহস্র কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গিয়েছে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির উপরে বড় বাজী ধরা হয়েছে. আমেরিকার জেদের কারণে বন্দী হয়েছেন বহু কোটি মানুষ, যারা নিকট ও মধ্য প্রাচ্যে এই ধরনের ঘটনা পরিবর্তনের ফলে খুব বেশী রকম ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছেন.

একই সময়ে কয়েকদিনের মধ্যে প্রকাশিত সেই জাতীয় গোয়েন্দা দফতরের রিপোর্টেই বলা হয়েছে যে, “মস্কো আগের মতই সিরিয়াতে বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ বন্ধ করার ব্যাপারে মনোযোগ নিবদ্ধ করে রেখেছে, যা বাশার আসাদের প্রশাসনের পতনের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে”. এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা ন্যায্য হয়েছে. রাশিয়া সত্যই মনে করে যে, সিরিয়াতে পরিস্থিতি ভারসাম্য হারালে সারা এলাকাতেই ভারসাম্য নষ্ট হবে. আর যারা অন্য রকম ভাবছে, তারা কোন চিন্তা না করেই রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে.