রাশিয়ার সব শাসকদের মধ্যে প্রথম আলেক্সান্দরের ব্যক্তিত্ব বোধহয় ছিল সবচেয়ে রহস্যময়. তাঁর সিংহাসনে আরোহণ এবং তার তিরোধান রহস্যে মোড়া.

সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনার পরম আদরের পৌত্র আলেক্সান্দরের জন্ম হয়েছিল ১৭৭৭ সালে. শৈশব থেকেই তাঁকে পরম ক্ষমতাশালী ঠাকুমা ও তাঁর সাথে সারাক্ষণ বিবাদরত পিতা রাজকুমার পাভেলের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হতো. সকালবেলায় কিশোরটি পিতাকে খুশি করার জন্য সামরিক উর্দি পরে সামরিক বিজ্ঞান অধ্যয়ণ করতেো আর সন্ধ্যাগুলি অতিবাহিত করতো টেইল-কোট পরিধান করে হাসি-উচ্ছ্বলতার মধ্যে ঠাকুমার প্রাসাদের বলরুমে. তাঁর সত্যিকারের অনুভূতি আলেক্সান্দর ছেলেবেলা থেকেই গোপণ করতে শিখেছিলেন. একাতেরিনা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন নাতিকে, পুত্র পাভেলকে নয়. তাই তাঁর জোরাজুরিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে আলেক্সান্দরের বিবাহ দেওয়া হয়েছিল কিশোরী জার্মান রাজকুমারী এলিজাবেথের সাথে.

১৭৯৬ সালে একাতেরিনা অকস্মাত পরলোকগমন করেন, সিংহাসনে আসীন হন কিন্তু পাভেলই. রাজত্বের প্রথম দিন থেকে তিনি একের পর এক তাঁর মায়ের করা সব কিছু পরিবর্তন অথবা ধ্বংস করার কাজ করতে থাকেন. তড়িঘড়ি, খামখেয়ালী সংস্কারাবলী রাজসভার পারিষদবর্গকে পাভেলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধায় প্ররোচনা দেয়. ১৮০১ সালে প্রাসাদ অভ্যুত্থানে প্রথম পাভেল নিহত হন. সিংহাসনে আসীন হন প্রথম আলেক্সান্দর. তিনি কি পিতাকে হত্যা করার চক্রান্ত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, তাকে হত্যা করার অনুমতি দিয়েছিলেন? তাঁর ঘনিষ্ঠ খুনীদের মধ্যে থেকে কি তিনি অনুভব করতেন? এই সব প্রশ্ন রুশীসমাজকে বহুদিন ভাবিয়েছিল.

আলেক্সান্দর দেশ শাসন করা শুরু করেছিলেন একাতেরিনার ঐতিহ্য মেনে. পাভেল যাদের শাস্তি দিয়েছিলেন, সেরকম হাজার হাজার প্রজাকে তিনি কারাগার ও নির্বাসন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, শারিরীক নির্যাতনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন. গ্রামেগঞ্জে স্কুল খোলা শুরু হল, সম্রাট জনসাধারণের শিক্ষার খাতে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করতেন.

রাজত্বের শুরুর দিকে আলেক্সান্দর ছিলেন শান্তিকামী, কিন্তু ভাগ্যের মতলব ছিল অন্যরকম. ১৮১২ সালে রাশিয়ায় হানা দিল নেপোলিয়নের নেতৃত্বে ফরাসী সেনাবাহিনী. শত্রু মস্কোয় ঢুকলো, আর অতি শীঘ্রই শহরে আগুন জ্বলে উঠলো – শহর প্রায় ভস্মে পরিণত হল. নেপোলিয়নের দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর জন্য এই অগ্নিকান্ড হয়ে দাঁড়ালো সর্বনাশা. রাশিয়ায় দখল করা জায়গার মধ্যে শীতযাপন করার একমাত্র শহর হারিয়ে ফরাসী বাহিনী ক্রমশঃ পিছু হঠতে শুরু করলো ও তাদের প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল. রুশদেশের ভূমি ফরাসীদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রুশী সেনাবাহিনী তারপর প্রায় গোটা ইউরোপকে মুক্ত করেছিল.

এই যুদ্ধ বদলে দিল জার আলেক্সান্দরের জীবন. তিনি ধরে নিলেন, যে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয় ঈশ্বরের কারসাজি, সম্রাটের মুকুট তাকে অস্বস্তি দিতে শুরু করলো. আলেক্সান্দর ক্রমশঃই ঘনঘন সিংহাসন পরিত্যাগ করে নিরালা জীবনযাপন করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে লাগলেন. শুধুমাত্র ধর্মেই তিনি সান্ত্বনা পেতে লাগলেন.

ব্যক্তিগত জীবনেও সম্রাট ছিলেন অসুখী. দুটি কন্যা ছেলেবেলায় মারা যায়, আর পত্নী এলিজাবেথা ভালোবাসলো অন্য পুরুষকে – ঘোড়সৈন্যবাহিনীর অফিসার আলেক্সেই ওখোতনিকভকে. ঘনিষ্ঠরা বুঝে উঠতে পারতো না, যে কেন জার তৃতীয় কন্যার প্রতি এতখানি উদাসীন. কিন্তু সম্রাট জানতেন, যে শিশুটি তাঁর ঔরসজাত নয়. যদি পুত্রসন্তান জন্মাতো – সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তাহলে কি হত বলা যায় না. কিন্তু জার উদারমনে শিশুমেয়েটিকে আপন বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন. বাচ্চাটি বেঁচে ছিল মাত্র দেড় বছর, আর শীঘ্রই যক্ষারোগে মারা যান ওখোতনিকভ. পরবর্তী বছরগুলিতে দম্পতি খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেনঃ আলেক্সান্দর স্ত্রীর সব বিশ্বাসঘাতকতা ক্ষমা করে দিয়েছিলেন.

সম্রাটের জীবনের শেষ বছরটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেযে রহস্যময় পৃষ্ঠা, তার সঙ্গে জড়িত বহু লোকোগাথা. ১৮২৫ সালে পত্নীর স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে জার বাধ্য হলেন দক্ষিণে পাড়ি দিতে. ফেরবার পথে তিনি থেমেছিলেন তাগানরোগ শহরে অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায়. কিন্তু চিকিত্সকদের শরণাপন্ন হতে অস্বীকার করলেন. ১৮২৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে আলেক্সান্দর পরলোকগমন করেন. তাগানরোগ থেকে পথ ছিল অতি দীর্ঘ. তিরোধানের তিনমাস পরে সম্রাটের মরদেহ সেন্ট-পিটার্সবার্গে সম্রাটদের সমাধিক্ষেত্রে কবর দেওয়া হয়. আর তার তিনমাস পরেই মারা যান এলিজাবেথা. সম্রাটের শবদেহ ছিল কফিনে ঢাকা, জনতা জারের মুখদর্শন করতে পারেনি. কিছু লোক বলতো, যে সম্রাট মারা যাননি, সন্ন্যাস নিয়ে মঠে চলে গেছেন. অন্যরা এক আশ্চর্যজনক বৃদ্ধ সাধক ফেওদরের কথা বলতো, যিনি সাইবেরিয়ায় থাকতেন. ধর্মপ্রাণ বৃদ্ধ চমত্কার ফরাসী বলতেন এবং তার ছিল অত্যন্ত সূক্ষাতিসূক্ষ অভিজাত আচার-আচরণ. হয়তো তিনি ছিলেন আলেক্সান্দর, যিনি জীবনের শেষপর্বে স্বেচ্ছায় নিজের মৃত্যুর অভিনয় করে সিংহাসন ত্যাগ করে, জীবন ধর্মের প্রতি উত্সর্গ করেছিলেন? কেউ এই প্রশ্নের সঠির উত্তর দিতে পারে না. তবে জাজ্বল্যমান পিটার্সবার্গের বৈভব ছেড়ে সুদূর সাইবেরিয়ায় মঠের সাদামাটা জীবন গ্রহণ করা জারের সম্পর্কে লোকোগাথা এখনো ঐতিহাসিকদের আন্দোলিত করে.