উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে যখন টানটান উত্তেজনা চলছে তখন এ সংকট নিরসণে সংলাপ শুরুর একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আলোচনার ধরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আসছে। ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং, বেইজিং-সিউল এবং উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে কূটনীতিকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ংয়ের উত্তর কি হবে তাই এখন দেখার বিষয়।

সংকট থেকে পিয়ংইয়ংকে বেরিয়ে আসতে মস্কো সব ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে উত্তর কোরিয়া বিষয়ক ছয়জাতির সাক্ষাতের প্রস্তবকে মস্কো সমর্থন জানিয়েছে। শুক্রবার রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন। ওই দিনই এক ঘোষণা আসে সিউল থেকে। এতে বলা হয়, কোরিয়া উপদ্বীপের উত্তেজনা কমিয়ে আনার জন্য পিয়ংইয়ংয়ের সাথে বৈঠক করতে রাজি আছে সিউল। এর পরেই রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগর মারগুলোভ মস্কোত নিযুক্ত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদুত কিম ইওন জেয়ের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে নতুন সংকেতের আভাস দেন। মোট কথা হচ্ছে, উত্তেজনাকে আর বাড়তে না দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার একটা সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। সিউলের ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আস্থার সাথে বলেছেন, দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক অতি দ্রুত উন্নতির দিকে নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সমস্যা নিয়ে সংলাপে বসার আগ্রহের কথাও জানান কেরি। তবে সেক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের শর্তাবলী উত্তর কোরিয়াকে মানতে হবে।

আর উত্তর কোরিয়াকে উসকানি না দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাত ওবামা একসারি সামরিক মহড়া স্থগিত ঘোষণা করেছেন। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ইয়াকোভ বেরগের বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের হুমকির পথ থেকে সরে এসেছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তারা নিজেদের কঠোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করেছে। একই ঘটনা উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটবে। আশাকরি, ঐক্যমতে পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার রয়েছে. যুক্তরাষ্ট্রে হামলার হুমকি দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু, কার্যত তাদের সেই সামর্থ নেই। হ্যাঁ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়া উপদ্বীপে পরমাণু সংঘাত শুরুর হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।”

সংলাপ শুরুর আহবান সত্বেও উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা বেড়েই চলছে। পিয়ংইয়ং আবারো সিউলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যেকোন মূহুর্তে কোরিয়া উপদ্বীপে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। নিজেদের রক্ষায় জাপান সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা নিয়ে বিবৃতি দেওয়ায় উত্তর কোরিয়া টোকিওকে পারমানবিক সহিংসতা বলে হুমকি দিয়েছে।

যদিও যুদ্ধের পটচিত্র নিয়ে ওই ধরণের উসকানি ছড়ানো হয় তাহলে পিয়ংইয়ংয়ের ভূমিকা কেমন হবে। রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির দূরপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের আরেক বিশেষজ্ঞ কনস্তানতিন আসমালোভ বলেন, “সরাসরি বলতে চাই, এখানে কেউই তুরুপে তাস নন। এটি উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক অস্ত্র। যদিও যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। তবে এর কঠিন উত্তর দেয়ার সামর্থ রয়েছে। পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আইন ভঙ্গের কারণ দেখিয়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি এ দেশের বিরুদ্ধে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

তবে আপাতত কোরিয়া উপদ্বীপে বড় কোন সামরিক সংঘাত অপেক্ষা করছে না। বলছেন রাশিায়ার বিজ্ঞান একাডেমির আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দার ফেডোরোভস্কী। তিনি বলেন, “উত্তর কোরিয়াসহ কেউই চাচ্ছে না যে যুদ্ধ হোক। উত্তর কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নানা ইস্যু নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে এখানে শক্তির তফাত অনেক। এগিয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া, কারণ তাদের বহরে রয়েছে আধুনিক সেনাবাহিনী. উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতির সাথে সংঘাত জড়িত। এ সংকট যথেষ্ট বিস্তার লাভ করেছে।”

চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি পুনরায় জানিয়েছে, পিয়ংইয়ংয়কে নীতিমালা ভঙ্গের চর্চা আর হতে দেয়া চলবে না। আর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের বিরোধীতা করলে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরো গুরুতর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। তাই উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি পথ খোলা রয়েছে এবং তা হলো দায়িত্ববান সহযোগি রাষ্ট্র হিসাবে নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির কাছ থেকে সমর্থন অর্জন। তা সম্ভব শুধু শ্রদ্ধাবোধ ও আলোচনা দ্বারা। এর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপকে পরামাণু শক্তির বাইরে রাখা যাবে।