কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম আর তার পরেই ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রধান হেনা রব্বানি খার দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের কেন্দ্র থেকে আর ভোটে দাঁড়াচ্ছেন না. এই খবর সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিষয়ে একটা ফাটকা তৈরী করেছে যে, তার মানে কি তিনি এই দেশের ১১ই মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটের পরে আর নিজের পদে থাকছেন না, এমনকি যদি তাঁর নিজের দল পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি এই নির্বাচনে জেতে তাহলেও? যদি তা না হয়, তবে পাকিস্তান নিজের ইতিহাসে সমস্ত দিক থেকেই একজন সবচেয়ে উজ্জ্বল কূটনীতিবিদকে হারাতে চলেছে.

হিনা রব্বানি খার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর কিছু আগেই মাত্র নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছেন – ২০১১ সালের জুলাই মাস থেকে. কিন্তু এই বছর গুলিতেই তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতিতে খুবই উল্লেখ করার মতো চটক জুড়ে দিতে পেরেছেন.

সকলেরই সেই মজার ব্যাপার মনে পড়বে, যখন এক সপ্তাহ আগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, যিনি এক মহিলা কর্মীকে প্রশংসা করে, ঠিক তার পরেই এই কারণে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন. কিন্তু পাকিস্তান – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর রাজনৈতিক ভাবে সঠিক থাকা এই দেশে তত দূর এখনও পৌঁছায় নি, যখন মহিলা ও পুরুষদের মধ্যে শেষ অবধি পার্থক্য নিশ্চিহ্ণ হয়েছে. সুতরাং কাজের ক্ষেত্রে হেনা রব্বানি খারের বাহ্যিক সৌন্দর্য মোটেও শেষ ভূমিকা পালন করে নি. সেই পরিস্থিতিতে, যখন পশ্চিমে বহু সংবাদ মাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা খুবই জোর দিয়ে পাকিস্তানের সম্বন্ধে জনমত তৈরী করছে এমন এক দেশ হিসাবে, যেখানে বক্তব্যের সুর দিয়ে থাকে অর্ধ শিক্ষিত ধর্মোন্মাদ চরমপন্থীরা, সেখানে এই বাস্তব ঘটনা যে, এক সুন্দরী, শিক্ষিতা ও আধুনিকা মহিলা কূটনৈতিক দপ্তরের প্রধান হয়েছেন, তা কোনই সন্দেহ নেই যে, এমনিতেই একটা বড় দেশের সম্পর্কের ধারণার বিষয়ে জয় করা হয়েছে. এই প্রসঙ্গে হেনা রব্বানি খার নিজের ইমেজ আরও বাস্তব কাজ দিয়েও সমৃদ্ধ করেছেন, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“তাঁর একটি প্রধান সাফল্য হল – ভারত পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রুত উষ্ণ হতে যাওয়ার মতো আশ্বাস পূর্ণ প্রক্রিয়া. প্রসঙ্গতঃ, এই সম্পর্ক এতই জটিল আর তার এত পুরনো ইতিহাস রয়েছে ও এত বেশী পুরনো হয়ে বেড়ে যাওয়া সমস্যা রয়েছে যে, একজন মানুষের পক্ষে তার সমাধান করার সাধ্য নেই. সুতরাং এই উষ্ণ হওয়া খুবই দ্রুত আবারও পরিণত হয়েছে নতুন উত্তেজনায় আর অংশতঃ, তা হয়েছে কাশ্মীরেই জঙ্গী কাজ কারবার সক্রিয় হওয়া দিয়ে”.

আর এবারে হেনা রব্বানি খার ঘোষণা করেছেন যে, তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন না. যেহেতু পাকিস্তানে মন্ত্রী পদে নিয়োগ করা হয়ে থাকে পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে, তাই এটা সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে যে, যদি এমনকি বর্তমানের শাসক দল নির্বাচনে জয় লাভ করেও, তাহলে হেনা রব্বানি খার আর মন্ত্রী থাকছেন না. তবে এটাও সত্যি যে, তিনি পাকিস্তানের পার্লামেন্ট মহিলাদের জন্য রাখা আলাদা করে সংরক্ষিত পদ থেকে পার্লামেন্টে যোগ দেবেন কি না, তাও বর্তমানে জানা যায় নি.

প্রসঙ্গতঃ, অনেক বিশ্লেষকই এই ধারণা করেছেন যে, এই বারের নির্বাচনে পিপিপি দল মনে তো হয় না যে জিতবে. আর তার মানে হল যে, ভোটে অংশ নিতে না চেয়ে হেনা রব্বানি খার আসলে আরও এক বিখ্যাত মহিলার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চেয়েছেন, যদিও তিনি খারের মতো এত সুন্দরী নন. এই মহিলা হিলারি ক্লিন্টন, যিনি সাময়িক ভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে না চেয়ে একটু তফাতে শরে রয়েছেন ও অপেক্ষা করছেন রাজনীতির শীর্ষে আরোহণের জন্য আরও ভাল কোনও সময়ের.

হেনা রব্বানি খারের ভাগ্য ও তাঁর এই বর্তমানে দিক পরিবর্তন কিছু দেখবার মতো প্রবণতা পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রতিফলিত করেছে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এদের মধ্যে প্রধান হল যে, দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র থাকলেও কোন না কোনও ব্যক্তিকে দেশের নেতৃত্বের পদে পাঠাতে হলে আগের মতই দরকার অর্ধ জমিদার প্রথার নিয়ম কানুন ও নীতির. স্থানীয় বড় জমিদাররা ঠিক করেন, কে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে জয়ী হওয়া উচিত্ ও তারাই স্থানীয় লোকদের আগে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দিতে বাধ্য করে থাকেন”.

ঠিক এটাই হয়েছে হেনা রব্বানি খারের সঙ্গেও সেই ২০০২ সালে. যখন তিনি প্রথমবার দেশের পার্লামেন্টে জয়ী হয়েছিলেন. ১৭৭ নম্বর নির্বাচন কেন্দ্র থেকে পাঞ্জাব রাজ্যের দক্ষিণের এই এলাকায় দেশের পার্লামেন্টে জায়গা পেতেন তাঁর বাবা – এক বড় ব্যবসায়ী ও জমিদার গোলাম রব্বানি খার. কিন্তু ২০০০ সালের শুরুতে পাকিস্তানে আইন নেওয়া হয়েছিল যে, দেশের পার্লামেন্টে যেতে হলে প্রার্থীকে ন্যূনতম ভাবে স্নাতক হতে হবে, তাই ঠিক তখনই পার্লামেন্টের জায়গা উত্তরাধিকার বলে হয়েছিল হেনা রব্বানি খারের.

এখন এই আইন রদ করা হয়েছে, আর তাই গোলাম রব্বানি খার আবার সুযোগ পেয়েছেন পার্লামেন্টে ঢোকার. সম্ভবতঃ, এই কারণেই মেয়ে বাবার জন্য নিজের প্রার্থী পদ খারিজ করেছেন, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ধরনের চাল পাল্টানো – সম্ভবতঃ পুরনো পরিবার তন্ত্রের ঐতিহ্য ও কাজকর্মে পরিবারের প্রাধান্যের শেষ উদাহরণ সম্ভবতঃ, ইতিমধ্যেই প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মন্ত্রীর পক্ষ থেকে নয়. নিজের এক শেষ নির্দেশ বলে হেনা রব্বানি খার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরে ১১৭ জন ব্যক্তিকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী পদে নিয়োগ করেছেন, যাঁদের বেশীর ভাগই তাঁর নিজের শহর মুজফ্ফর গড়ের লোক”.

সুতরাং সেই প্রশ্ন শুধু এই বিষয়েই নয় যে, রব্বানি খার আর মন্ত্রী হবেন কিনা, বরং সেই ব্যাপারেই যে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে কত দ্রুত পুরনো দুর্নীতি ও পরিবার প্রথায় ভাঙন ধরবে, এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.