চেলিয়াবিনস্ক প্রদেশের দক্ষিণে অবস্থিত প্রাচীন জনবসতি কেন্দ্র আর্কাইমকে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণ স্বরুপ গণ্য করা হয়. বিজ্ঞানীদের মতে, এর বয়স প্রায় ৪৮০০ বছর. মিশরীয় প্রবাদবাক্য বলেঃ “সবাই সময়কে ভয় পায়, কিন্তু এমনকি সময়ও পিরামিডকে ভয় পায়”. যদি তাই হয়, তবে মিশরের পিরামিডদেরও আর্কাইমকে সমীহ করা উচিতঃ কারণ সবচেয়ে প্রাচীণ পিরামিডও বয়সে আর্কাইমের চেয়ে দুশো বছরের ছোট.

আর্কাইম আবিষ্কার করা হয়েছে তিনবার. প্রথমে ১৯৫৭ সালে সামরিক মানচিত্র সংকলকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল টিলার ওপর অদ্ভুত কিছু গোলক, কিন্তু তারা তার রহস্য উন্মোচণ করতে পারেনি. দ্বিতীয়বার আর্কাইম আবিষ্কার করে পাইলটরা ১৯৬৯ সালে, আকাশ থেকে স্থানীয় এলাকার ফোটো তোলার সময়. কিন্তু তারা ধরে নিয়েছিল, যে ওটা কোনো সামরিক কেন্দ্র, যার সম্পর্কে প্রকাশ্যে বলা উচিত হবে না. অবশেষে ১৯৮৭ সালে তরুন অপেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি অভিযাত্রী দল বিশ্বের সামনে এই আশ্চর্যজনক জনবসতি কেন্দ্রকে তুলে ধরে.

আর্কাইম আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে ফাঁকা স্তেপের মধ্যে অবস্থিত. জনবসতি কেন্দ্রটির আকার ছিল গোল. দুটি সুউচ্চ কাঠের প্রাচীর তাকে আড়াল করে রাখতো. বাইরের প্রাচীরটি ৩৫টি বড় বাড়িকে আড়াল করতো. ভেতরের প্রাচীরটির আড়ালে ছিল আরও ২৫টি বাড়ি. বিজ্ঞানীদের অনুমান, যে জনবসতি কেন্দ্রে দেড় থেকে দুই হাজার লোক বসবাস করতো.

ব্রোঞ্জ যুগের এলোমেলো স্থাপত্যের বৈপরীত্যে আর্কাইম গড়া হয়েছিল পূর্বপরিকল্পিত নক্সা অনুযায়ী. খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দীতে লোকে সামঞ্জস্য, প্রতিসাম্য নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতো না. কিন্তু আর্কাইমে সব বাড়ির মধ্যে ও রাস্তাঘাটের সুসামঞ্জস্য ছিল. শহরের আয়তকে ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যন্ত হিসাব করে. গৃহস্থালী বাড়িঘর ছাড়াও বিজ্ঞানীরা সেখানে আবিস্কার করেছেন কুমোর ও ধাতুশিল্পীদের উনুন এবং গবাদি পশুর খামার. কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে আর্কাইমে পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা. এটা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা. কেবলমাত্র পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে অবস্থিত মহেঞ্জো-দড়োতেই ঐরকম পয়ঃ-প্রণালী আবিস্কার করা গেছে. জগদ্বিখ্যাত বৃটেনের স্টোনহেজের মতোই আর্কাইমেরও সম্ভবতঃ কোনো রহস্যজনক ধর্মীয় তাত্পর্য্য ছিল. সেইজন্যই কি আর্কাইমের সমস্ত স্থাপত্যের মুখ নিখুঁতভাবে জ্যোতির্বিদ্যা বস্তুগুলির দিকে ঘোরানো নয়? হয়তো বা আর্কাইম ছিল প্রাচীন অবজারভেটারী? এমন মত প্রচলিত আছে, যে আর্কাইমের প্রাচীর দুটোরও গোপণ ও বিশেষ তাত্পর্য্য ছিলঃ বাইরেরটি উত্সর্গীত ছিল সূর্যের প্রতি, ভেতরেরটা চন্দ্রের প্রতি. এক কথায় অধিবাসীদের জন্য আর্কাইম ছিল ভূস্বর্গ.

আর্কাইম শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শণই নয়ঃ এটা রাশিয়ায় এক ব্যতিক্রমী এলাকা. ওখানে প্রায়ই অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু দেখা যায়. লোকে বলে, যে বড় কারাগানকা নদীর তীরে আর্কাইম অবস্থিত, সেই নদীর তীরবর্তী মাটি নাকি চামড়ার রোগ সারায় আর নদীটির জল নাকি আরোগ্যদায়ক. ঐ নদীর জল সংগ্রহ করতে সারা রাশিয়ার লোকজন ওখানে যায়. তীর্থযাত্রীরা একনিষ্ঠভাবে মনে করে, যে অলৌকিক কান্ডকারখানা ঘটে আর্কাইমের প্রবল আভ্যন্তরীণ শক্তির দৌলতে.

কিন্তু এই বিস্ময়কর শহরের অধিবাসী ছিল কারা? জানা যায়নি - লিখিত কোনো সাক্ষ্য মেলেনি. তবে গত ২০ বছরে প্রত্নতত্ত্ববিদরা উরালের দক্ষিণে ঐ অঞ্চলে আরও কয়েকটি প্রাচীন বসতিকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ আবিস্কার করেছেন. তারা অবস্থিত ছিল সীমাবদ্ধ এলাকার মধ্যে(৩৫০ কিলোমিটারের বেশি নয়). তারা একই যুগের এবং তাদের মধ্যে প্রচুর সাদৃশ্য. হয়তো বা, আর্কাইম ছিল অজানা একটি সভ্যতার রাজধানী. প্রত্নতত্ত্ববিদরা জোর দিয়ে বলেন, যে আর্কাইম ধ্বংস হয়েছিল প্রবল অগ্নিকান্ডে. কিন্তু অগ্নিসংযোগ করেছিল কারা? মনে হয় না, যে কোনো শত্রু - প্রত্নতত্ত্ববিদরা লড়াইয়ের কোনো চিহ্ন আবিষ্কার করেননি. তা সত্বেও অধিবাসীরা তাদের শহর ছেড়ে চলে গেছিল. কোথায়? অনেক অভিমত আছে. কেউ কেউ মনে করে, যে আর্কাইম ও তার আশেপাশে বাস করতো প্রাচীণ আর্যরা, যারা খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দীতে ভারতে ও পারস্যে অভিবাসন নিয়েছিল. এই অভিমতের সমর্থকরা ঋগ্বেদ ও অন্যান্য প্রাচীণ ভারতীয় আর্য লিখনীর বয়ানের উদ্ধৃতি দেয়. তবে এটা অনেক ধারণার একটি, যা আর্কাইমের অধিবাসীদের রহস্যজনক ভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে, পিরামিড গড়া শুরু হওয়ার অনেক আগে.