প্লেবয়ে’র ভারতের গোয়া রাজ্যে একসারি ক্লাব খোলার সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে, যারা মনে করেন, যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চুর্ণ করবে. অন্যদিকে এই পরিস্থিতি আরো ব্যাপকমাত্রার প্রশ্ন তোলে, যে চিরকালীন ঐতিহ্য ও আধুনিক চাহিদার মধ্যে মেলবন্ধন কিভাবে ঘটানো সম্ভব, যা কারো পছন্দ, আর কারো কারো মধ্যে সেসব প্রতিরোধের উদ্রেক করে.

‘প্লেবয়ে’র ভারতে মোট ১২০টি ক্লাব খোলার পরিকল্পনা রয়েছে, এবং শুরু করতে চায় তারা গোয়া থেকেই. মুম্বাইয়ে নথিভুক্ত পিবি লাইফস্টাইল লিমিটেড কোম্পানী, যার ভারতে ‘প্লেবয়’ ব্র্যান্ডের উপর একাধিকার রয়েছে, তার প্রতিনিধিরা স্থানীয় বাসিন্দাদের আচারবিচার ও রীতিনীতিকে আমল দিতে চায়. তারা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে এই বলে, যে অন্যান্য দেশের তুলনায় পরিষেবিকাদের বেশভুষা(প্লেবয় বান্নিস)হবে কম খোলামেলা. কিন্তু তা সত্বেও ভারতবাসী এই উদ্যোগের চরম বিরুদ্ধে.

গোয়া রাজ্য বিধানসভায় ক্ষমতাসীন বিজেপির বিধায়ক মাইকেল লোবো, যার কেন্দ্রেই ঐরকম প্রথম ক্লাব খোলার কথা, তিনি এমনকি অনশন করার হুমকি দিয়েছেন, যদি সরকার ঐ পরিকল্পনাকে সবুজ সঙ্কেত দেয়. তিনি বলেছেন, যে ‘প্লেবয়’ বিখ্যাত বার আর দেহব্যবসার আখড়া ছাড়া আর কিছুই নয়. উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাগছে আরো বড়মাপের প্রশ্নঃ ঐতিহ্যগত ভারতীয় সংস্কৃতি কতখানি রীতিনীতি গ্রহণ করতে পারবে, নিজস্ব স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়ে? এই সম্পর্কে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলছেনঃ

ভারতের চিরকাল সুনাম ছিল সহিষ্ণুতার জন্য. ভারতের ভূখন্ডে আগত পরদেশীরা বয়ে এনেছে তাদের কৃষ্টি ও তাদের আত্মীকরণ করেছে সর্বভারতীয় অভিন্ন সংস্কৃতির ধারা. তাই ঘটেছে আর্য, গ্রীক ও মুসলমানদের সঙ্গে, ইংরেজ উপনিবেশীরা আসার আগে পর্যন্ত. যদিও এখন দিল্লীতে ইংরেজদের দ্বারা নির্মিত ভাবগম্ভীর সব প্রশাসনিক ভবনগুলোকে দেখেও আর পরদেশী বলে মনে হয় না.

তবে আধুনিক জনসংস্কৃতি – সম্পূর্ণ অন্য গোত্রের. সেটা এতই দুর্বিনীত, যে দলিত ও পিষ্ট করে দেয় নির্দিষ্ট কোনো দেশের অধিবাসীদের আচারবিচার, রীতিনীতি, ঐতিহ্য. কোথাও কোথাও, যেমন, থাইল্যান্ডে স্থানীয় ঐতিহ্য নতুন রীতিনীতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে. কিন্তু ফলশ্রুতিতে, থাইল্যান্ড এখন বিশ্বে সেক্স-পর্যটনের রাজধানীতে পরিণত হয়েছে.

অন্য কিছু দেশে পরদেশী সংস্কৃতিকে এতটাই কড়াভাবে প্রতিহত করা হয়েছে, যে তা মাঝেমাঝে বিদ্ঘুটে আকার ধারণ করেছে. কারণ, এটা অজানা নয়, যে বিশ্বে চরমপন্থী ইসলামের সক্রিয়তা তুমুলহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, আধুনিক, সবার আগে আমেরিকার জনসংস্কৃতির প্রতিরোধ করতে গিয়ে.

এবার প্রশ্নটা হচ্ছে, গোয়াই কেন? আবার এই বিষয়ে শুনুন বরিস ভলখোনস্কির বক্তব্য.

প্রথমতঃ, এই রাজ্যটা আগে ছিল পর্তুগীজ কলোনি, তাই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী সেখানে ক্যাথলিক-খ্রীষ্টান. তার মানে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনস্তত্ত্ব পাশ্চাত্য ধারার প্রতি বেশি নমনীয়.

দ্বিতীয়তঃ, ৬০-এর দশক থেকে শুরু করে গোয়া এমন একটা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসে আধুনিক সভ্যতা থেকে গা-ঢাকা দিতে. এটা সজ্ঞানে কেরিয়ার, উঁচু সামাজিক অবস্থান, উঁচুমাপের বেতন বর্জন এবং প্রায় পুরোপুরি সমাজ থেকে বরাবরের মতো প্রস্থাণ. তবে নিচে নেমে আসা লোকেরা প্রায়ই ভারতের আইনকানুন লঙ্ঘন করে. গত কয়েক বছরে গোয়া রাজ্যে তথাকথিত ‘রুশী গ্রাম’ উচ্ছেদ করার জন্য রীতিমতো আন্দোলন চলছে, যেখানে নিম্নগামী লোকেরা আস্তানা গেড়েছে. তাদের ‘রুশী’ বলা হয় অভ্যাসবশতঃ, কারণ ওখানে ঠাঁই নিয়েছে আগেকার সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশ ও ইস্রায়েল থেকে আগত লোকেরাও. এর প্রেক্ষাপটে আরও একটা জনসংস্কৃতির আবির্ভাবের খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে.

উপরন্তু সাম্প্রদায়িকতাবাদী বলে খ্যাত বিজেপি পার্টিকে এই বিষয়ে সমর্থন করছে অন্যান্য পার্টির প্রতিনিধিরাও, অংশত, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও.

অতএব বরিস ভলখোনস্কির মতে, এখানে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংঘর্ষের কথা হচ্ছে না, হচ্ছে ঐতিহ্যের সাথে উদ্ধত জনসংস্কৃতির সংঘর্ষের কথা.