সিরিয়াতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত চরমপন্থী গোষ্ঠী “ঝেভাত আন-নুসরা” “আল-কায়দা” গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত “ঐস্লামিক রাষ্ট্র ইরাক” গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে. এই সম্বন্ধে ঘোষণা করেছেন এক রেডিও আহ্বানে ইরাকের জঙ্গীদের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি. তার কথামতো, দুই গোষ্ঠীই এবারে এক নাম নিয়ে যুদ্ধ করবে – “ইরাক ও শাম ঐস্লামিক রাষ্ট্র”.

“ঝেভাত আন-নুসরা”, যে দলের ভিত্তিই হচ্ছে বিদেশী ভাড়াটে সৈন্য, তারা নিজেদের অন্তর্ঘাত ও শান্তিপ্রিয় সাধারণ লোকদের উপরে নৃশংস অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত. আগ এই গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরাকের “আল- কায়দার” সম্বন্ধ আছে বলেই শুধু সন্দেহ করা হয়েছে. আর এবারে তাদের যোগাযোগ – প্রমাণিত সত্য.

যা লক্ষ্যণীয়, তা হল দুই গোষ্ঠীই – তা যেমন ইরাকের, তেমনই সিরিয়ার – সরকারি ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় রয়েছে. কথায় পশ্চিমের রাজনীতিবিদেরা জঙ্গীরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তার সমালোচনা করে থাকেন. কিন্তু কাজের বেলায় চরমপন্থী ও পশ্চিম আবার জোট হিসাবেই কাজ করছে, – এই রকম মনে করে পর্যবেক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ বলেছেন:

“বিগত সময়ে পশ্চিমে আরও বেশী করেই বলা হচ্ছে “আল-কায়দার” সঙ্গে জড়িত প্রভাবে চলা জেহাদী লোকদের সংখ্যা শুধু সিরিয়াতেই নয়, বরং অন্যান্য নিকট প্রাচ্যের দেশ গুলিতেও বেড়েছে. এমনকি খুব চোখে পড়ার মত করে “জেহাদী পাপের অক্ষরেখা” বলে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল – এটা সেই জুনিয়র জর্জ বুশের দেওয়া নাম, যাতে তিনি “পাপের অক্ষরেখা” বলে চিহ্নিত করেছিলেন ইরাক, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে, তারই সঙ্গে মিল রেখে করা. পরে উপ পররাষ্ট্র সচিব জন বোল্টন এই অক্ষরেখার সঙ্গে কিউবা, লিবিয়া ও সিরিয়াকেও জুড়ে দিয়েছিলেন. এই কথার গড়ন তৈরী করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের অপছন্দ হওয়া দেশ গুলির সঙ্গে কাজকর্মকে ঠিক প্রমাণ করার জন্যেই”.

জেহাদের যে “পাপের অক্ষরেখা” – এটা কোন চিন্তা করে বার করা কল্পিত রেখা নয়, বরং একেবারেই বাস্তব. কিন্তু এই ঘটনার বিরুদ্ধে আমেরিকা লড়াই করছে স্রেফ কথাতেই. খুব কম করে হলেও এটা সেই দেশের জন্যে খুবই আশ্চর্য জনক ব্যাপার, যারা এক সময়ে “সারা দুনিয়া জুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিল. কিন্তু কালো তালিকায় যুক্ত হওয়ার জন্য না ইরাকের না সিরিয়ার জঙ্গীদের কোন অসুবিধাই বাস্তবে হচ্ছে না. আর এটা সেই কারণে যে, সকলেরই জানা রয়েছে মোটামুটি সেই দেশ গুলির নাম, যাদের কাছ থেকে জঙ্গীদের আর্থিক সাহায্য পৌঁছতে পারে. এই সব আর্থিক প্রবাহের পথ, ইচ্ছা থাকলে, খুঁজে দেখার জন্য বড় পরিশ্রমের দরকার পড়ে না – বিশেষ করে যদি দেখা হয় যে, কথা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই সমস্ত কাছের সহকর্মী দেশগুলিকে নিয়ে. একই কথা বলা যেতে পারে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে. কিন্তু সিরিয়ার ক্ষেত্রে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”, যা এর আগে অবধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাও খানিকটা বাছাই করা হয়েছে মার্কা চরিত্রের ছিল, তা একেবারেই নষ্ট হতে বসেছে. যা আরও একবার সেই সিদ্ধান্তকেই প্রমাণিত করে: পশ্চিম ও ঐস্লামিক বিশ্বের চরমপন্থী গোষ্ঠী – আবারও জোট বেঁধেছে. আর সেই জঙ্গীরা, যারা নিজেদের “জেহাদের সৈনিক” বলতে পছন্দ করে, তারা আবারও, সেই আগের মতই, এই এলাকায় জেহাদ করছে আমেরিকার স্বার্থ নিয়ে.

তা স্বত্ত্বেও, গত সপ্তাহে ইউরোপে নিরাপত্তা পরিষেবা খোলাখুলি ভাবেই সম্ভাব্য বিপদের হুমকি নিয়ে কথা বলেছে, যা সিরিয়াতে যুদ্ধ করা জেহাদী ভাড়াটে সৈন্যদের দিক থেকে আসতে চলেছে. দেখা যাচ্ছে যে, পশ্চিমে এবারে সিরিয়াতে কাজকর্মের কৌশল নিয়ে বিভেদ হতে চলল না কি?

এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন রায়েভস্কি মত দিয়ে বলেছেন:

““পাপের অক্ষরেখার” মধ্যে থাকা জেহাদী গোষ্ঠীর স্বার্থ শুধু এবং ততটা অমুসলিম দেশ গুলির মধ্যে প্রসার নিয়ে নেই. যেমন, ইউরোপের দেশ গুলি. বর্তমানের অধ্যায়ে তাদের প্রধান লক্ষ্য আরবের শাসক গোষ্ঠী গুলি. তাদের সকলে নয়, শুধু তারাই, যাদের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করা হয়েছে, সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসাবে. আর সেই সব আরব প্রশাসন, যারা আজ চরমপন্থীদের সাহায্য করছে, তারা একটা সময় পর্যন্ত জেহাদীদের নজরে থাকবে জোটের লোক হিসাবেই.ঠিক তেমনি করেই, যেমন পশ্চিম রয়েছে, যাদের সঙ্গে আজ জেহাদীরা সম্মিলিত লক্ষ্যের কারণেই জোট বেঁধেছে”.

কিন্তু এটা – খুবই অদূরদর্শী রাজনীতি, যারা আজ জেহাদীদের অর্থ সাহায্য করছে, তাদের পক্ষ থেকে. “বেন লাদেনের সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য” সৃষ্টির ইতিহাস, এটাই আগে দেখিয়ে দিয়েছে. রক্ত পানে মত্ত হয়ে, সহজ অর্থ যোগাড় করায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে চরমপন্থী- সন্ত্রাসবাদীরা খুবই সহজে সীমা পার হয়ে যায়, যা প্রথম থেকেই তাদের স্পনসররা দেখিয়ে দিয়েছিল. আর তখন তারা আঞ্চলিক থেকে বিশ্বের সমস্যায় পরিণত হয়েছিল. অল্প কিছু দিন আগেই পশ্চিমের পক্ষ থেকে সারা বিশ্ব জোড়া যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়েছিল তাদের প্রাক্তন জোটের লোকদের বিরুদ্ধে, যারা তাদেরই আগে দাগিয়ে দেওয়া খড়ির গণ্ডী পার হয়ে গিয়েছিল.

এখন ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি করছে, তা যেমন ইউরোপীয় লোকরা, তেমনই মনে হয়, এটা বুঝতে শুরু করেছে. কিন্তু পশ্চিমের জেহাদীদের সাহায্যের ব্যবস্থা এখন এত বেশী জোরে চলছে যে, তা থামানো দুষ্কর হয়েছে. আমেরিকার লোকরা অন্তত পক্ষে তা থামানোর জন্য তাড়াহুড়ো করছে না.

ফলে “জেহাদীদের আন্তর্জাতিক জোট” এখন চোখের সামনেই মজবুত হচ্ছে. আর খুবই কঠিন হল বিশ্বাস করা, যে পশ্চিম ও সংরক্ষণশীল আরব প্রশাসনের পক্ষে এই জেহাদীদের প্রভাবের জায়গা শুধু সিরিয়াতেই সীমাবদ্ধ করে রাখা সম্ভব হবে – যেমন আগেও তারা আফগানিস্তানের মধ্যেই বেঁধে রাখতে পারে নি আল- কায়দা গোষ্ঠীকে. সিরিয়া ও ইরাকের চরমপন্থী নেটওয়ার্কের জোট – এটা স্রেফ প্রথম সঙ্কেত, যা সারা দুনিয়ার জন্যই ভবিষ্যতে একটা বড় সমস্যায় পরিণত হতে চলেছে.