দশ বছর আগে পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যমের শীর্ষ ছত্র হর্ষ ধ্বনিতে উপচে পড়েছিল: “বাগদাদ দখলীকৃত!” খুবই অপ্রিয় ভাবে শুরু হওয়া আমেরিকা- ব্রিটেনের ইরাক আক্রমণ, মনে হয়েছিল, সফল হয়েছে. যদিও ইরাকের সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় জঙ্গীদের দল শুরুতে জোটের সেনাদের গতি খুবই লক্ষ্যণীয় ভাবে কমিয়ে দিয়েছিল, তবুও বাগদাদ দখল করা সম্ভব হয়েছিল আক্রমণ শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ পরেই. তখন খুব কম লোকই চিন্তা করতে পেরেছিল যে, এই যুদ্ধের শতকরা নিরানব্বই ভাগ রক্তপাত এখনও বাকী.

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল খোলাখুলি ভাবে এক ছুতো ব্যবহার করে যে, ইরাকে নিষিদ্ধ অস্ত্র রয়েছে ও ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে হওয়া অভূতপূর্ব যুদ্ধ বিরোধী জনতার মিছিলকে উপেক্ষা করেই. ঠিক এর পরেই পশ্চিমের জোটের সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীণ হয়েছিল – তাদের পক্ষে কিছুতেই ইরাকের দক্ষিণের একটিও শহরের উপরে মজবুত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছিল না. ধরে নেওয়া যেতে পারত যে, বাগদাদ বরং আরও ব্যাকুল হয়ে প্রতিরোধ করবে. কিন্তু এই শহর হঠাত্ করেই কোন রকমের যুদ্ধ ছাড়াই আত্ম সমর্পণ করেছিল. লন্ডনের ও ওয়াশিংটনের উল্লাসের কোনও সীমা ছিল না.

কিন্তু তার পরেই স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়া গেল যে, অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষে অসুবিধা শুরু হয়েছে ঠিক এই বাগদাদ দখলের পর থেকেই. ইরাকের শিয়া ও সুন্নী মুসলমানরা সেই বছরেরই গরম কাল থেকে নানা ধরনের ভাবে বানানো বিস্ফোরক বোমা ব্যবহার করে আমেরিকার জন্য নিজেদের জন্যও খুবই ভয়ঙ্কর সব ক্ষয় ক্ষতি শুরু করে দিয়েছিল. তারই মধ্যে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাশালীদের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিজেদের দেশের লোককেই এই যুদ্ধ “বিক্রী” করা: ইরাকে কোন রকমের গণহত্যার অস্ত্র সেই খুঁজে পাওয়া যায় নি.

আর এখানে আবার বিবিসি সংস্থার সাংবাদিক অ্যান্ড্রু গিল্লিগান ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে দোষারোপ করেছিলেন যে, তাঁর কাছের লোকরা জেনে বুঝে গোয়েন্দা দপ্তরের রিপোর্টকে নাটকীয় করেছে এই বলে যে, সাদ্দাম হুসেইনের কাছে পারমানবিক পরিকল্পনা রয়েছে. আজ গিল্লিগান “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ব্লেয়ার যে কেন আমেরিকার ইরাকে পদ যাত্রায় সামিল হয়েছিলেন, তা ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

“ওরা ভেবেছিলেন যে, এটা হবে একটা সহজ জয়, তারা মনে করেছিলেন যে, “খারাপ ছেলেটির” ওপরে খুবই সহজে জয়ী হয়ে যাবে, তারা খুবই কম চিন্তা করে দেখেছিলেন সমস্যার কথা, যা তাদের পথেই পড়বে. আমি মনে করি যে, টনি ব্লেয়ার অবশ্যই বুঝতে পেরেছিলেন যে, যুদ্ধের শুরুতেই হবে বুঝতে না পারার জন্য বিশাল চেঁচামেচি. তিনি মনে করেছিলেন যে, বহু লক্ষ উদ্বাস্তু ও কালো বস্তার মধ্যে বহু লাশ পাওয়া যাবে. কিন্তু শেষমেষ ব্লেয়ার আশা করেছিলেন যে, সব কিছুই ভাল ভাবে শেষ হবে, ক্ষতি হবে কম, আর যারা দখল করতে যাবে, তাদের এই দেশের লোক বাহবা দেবে. তিনি সব কটা ধারণাতেই ভুল করেছিলেন”.

প্রসঙ্গতঃ, তখন ২০০৩ সালে এই ক্ষতির তালিকা পূর্ণ হয়েছিল প্রথমে এই গিল্লিগান ও তার পরে তাঁর বিবিসি সংস্থার প্রধানকে দিয়েই – তাঁদের সকলকেই চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল. কিন্তু তাঁদের শক্তি প্রয়োগের কারণেই ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হওয়া ইরাকে অধিগ্রহণের জন্য পশ্চিমের দেশ গুলিতে মানুষের মত পাওয়ার জন্য কিভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল মিথ্যা তথ্য দিয়ে, তার উপর থেকে আবরণ খসে পড়ে গিয়েছিল. সেই সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শুধু ইরাকেরই জনগণ নন, বরং সেই সব দেশের জনগণও যারা এই অনুপ্রবেশে অংশ নিয়েছিল, আর তারই সঙ্গে জোটের নেতাদের বাজেটও – আমেরিকার ও ব্রিটেনের. কিছুদিন আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক গবেষণা পত্রে সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমান এই আক্রমণ ও অধিগ্রহণের ফলে হিসাব করা হয়েছে চারশো থেকে ছশো হাজার কোটি ডলারের সমান.

প্রসঙ্গতঃ, “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া সাক্ষাত্কারে আমেরিকার জাতীয় প্রাথমিক কর্তব্য তহবিলের মহিলা কার্যকরী ডিরেক্টর জো কমেরফোর্ড উল্লেখ করেছেন যে, এই অর্থের বেশীরভাগই এখনও দেওয়া বাকী রয়েছে, কারণ সেই গুলি এখনও এসে পৌঁছায় নি, তিনি তাই যোগ করেছেন:

“আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুটি যুদ্ধের পরিণতিতে: একটি ইরাকে, অন্যটি আফগানিস্তানে, যা দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলছে, তার থেকে গত পঞ্চাশ বছরের চেয়ে বেশী সংখ্যায় যুদ্ধ ফেরত ভেটেরান তৈরী হয়েছে. যদিও আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল গুলির মধ্যে বোধহয় কোন রকমের বিবাদ নেই যে, আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা দরকার আছে বলে, আর ইরাক থেকে আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে সৈন্য ফিরিয়ে নিয়েছি, তবুও এখনও সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ জানা নেই. কারণ ইরাকে আমরা এখনও তথাকথিত সামরিক শক্তি প্রয়োগের নাম করে অর্থ ব্যয় চালিয়ে যাচ্ছি, যদিও এই বিষয়ে প্রায়ই চেপে যাওয়া হচ্ছে”.

বারাক ওবামাকে সংবাদ মাধ্যম ইতিমধ্যেই "যুদ্ধের রাষ্ট্রপতি" নাম দিয়েছে – তাঁর প্রশাসনের সময়ে সশস্ত্র যুদ্ধের তীব্রতা কমে নি. সমস্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমেরিকার সেনা বাহিনীর উপরেও. খুবই বেশী শতাংশ হয়েছে আত্মহত্যার ঘটনা, মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপার, সংখ্যা বেড়েছে সম্পূর্ণ ভাবে অথবা সাময়িক ভাবে কর্ম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা দেশে ফেরা সৈন্যদের – এই সমস্ত কারণই আমেরিকার সেনাবাহিনীর মর্যাদাকে মলিন করে দিচ্ছে, আর তা শুধু দেশের বাইরেই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই. তাই একটা আশঙ্কাও রয়েছে যে, এটা তো সব কলির সন্ধ্যা.