চলতি সপ্তাহে কোরীয়া উপদ্বীপে উত্তপ্ত আর কমানো সম্ভব হলো না। মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে ওই উত্তেজনা শুরু হয় যখন পিয়ংইয়ং ১৯৫৩ সালের কোরিয়া শান্তি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আইনী যুদ্ধকালীন সময় দ্বারা সমাধান করার সিদ্ধান্ত নেয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম চেন ইন ইতিমধ্যে এক বিবৃতিতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, যদি কোন প্রকার উস্কানী দেওয়া হয় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি গুয়াম, হাওয়াই এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় রকেট হামলা চালানো হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ায় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, উত্তর কোরিয়া নিজেদের পূর্ব উপকূলে মাঝারিপাল্লার ব্যালেস্টিক রকেট মুসুদান মোতায়েন করেছে। ওই রকেট পাশ্ববর্তী দক্ষিণ কোরিয়া ও প্রতিবেশী জাপানে হামলা করতে সক্ষম। ২০০৯ সালে উত্তর কোরিয়া এ ধরণের সর্বোচ্চ ৫০টি রকেট মোতায়েন করেছে।

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ হুশিয়ারি বিবৃতি হচ্ছেঃ আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে দেশ থেকে সব বিদেশী কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার আহবান জানানো হয়েছে। এ ঘোষণা রাশিয়ার জন্যও প্রযোজ্য। গত ৫ এপ্রিল রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ বলেছেন, মস্কো উত্তর কোরিয়ার ওই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য যাচাই করছে। ল্যাভরোভ আরো বলেন, কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নিয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

এদিকে, পিয়ংইয়ংয়ে জীবণযাত্রা স্বাবাবিক রয়েছে। বিদেশীরা কোন বাঁধা ছাড়াই শহরে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ কাজ করছে এবং বিদেশী সংস্থাগুলোর অফিসে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার হুঁমকি একেবারে শূণ্য জায়গায় করা হয় নি। পিয়ংইয়ং প্রথমে জাতিসংঘের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞায় উদ্বিগ্ন হয়। রকেট ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর জবাবে ওই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে “ফোয়াল ঈগল” নামের যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার এক যৌথ সামরকি মহড়া শুরু হয় কোরীয় উপদ্বীপে। এতে ৪০ হাজারেরও অধিক সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী ও মার্কিন ক্ষেপনাস্ত্রবাহী বিমান বি-৫২ ও বি-২ অংশ নেয়। ওয়াশিংটন দক্ষিণ কোরিয়াকে জৈবিক, রাসায়নিক ও রেডিও লজিক্যাল নিরাপত্তা প্রদান করেছে এবং সেই সাথে দুইটি রকেটবিরেধী প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে।

এদিকে সিউলের সংবাদপত্র “তোনা এলবো” জানায়, উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলার জবাব দিতে মার্কিন সেনাদের সহযোগিতায় ইতিমধ্যে বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। জরুরী অবস্থায় ওই বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু অবকাঠামোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে।

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যদেরকেও অভিযুক্ত করা হয়তবা সহজ হবে। ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের ঘটনাগুলো যা স্বভাবতই পিয়ংইয়ংকে ভাবিয়ে তুলছে। রাশিয়ার বিজ্ঞাণ একাডেমির দূরপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ কনস্তানতিন আসমালোভ বলেন, "আজকের এ পরিস্থিতিতে যেখানে রাজনীতিতে মাত্রাতিরিক্ত দ্বৈত অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়। যখন আন্তর্জাতিক অধিকারের নিরাপত্তা দেওয়ার চিরাচরিত পদ্ধতি মানা হচ্ছে না তখন উত্তর কোরিয়ার নেতার স্বভাবতই মনে হচ্ছে যে আকাশে উড়ন্ত বকের চেয়ে নিজ হাতে চামচিকা থাকা অনেক ভাল। আর নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পরমাণু কর্মসূচী হচ্ছে সবচেয়ে উত্তর উপায়।"

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত যিনি এর আগে সিআইএ’র প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন সেই ডোনাল্ড গ্রেগ রুশ বিশেষজ্ঞের সাথেই একমত পোশন করেছেন। সম্প্রতি “লস এঞ্জেলেস টাইমস” পত্রিকায় লেখা এক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, কিম চেন ইনকে পরমাণু অস্ত্র থেকে পুরোপুরি সরে আসার চাপ প্রয়োগ না করে বরং ওয়াশিংটনকে সরাসরি পিয়ংইয়ং এর সাথে আলোচনা করা উচিত। এর পরে দাবীর কথা আসতে পারে। দীর্ঘ সময়ে কোরিয়ায় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে গ্রেগ বলেন, "আমি বুঝতে পেরেছি, অন্য কোন উপায়ে পিয়ংইয়ং মেনে নিবে না। কারণ হচ্ছে, পিয়ংইয়ং এর জন্য যে কোন বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছানোর মানে হচ্ছে নিজের পরাজয় স্বীকার করা।"

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার সমাপ্তির মধ্য দিয়ে কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনা শেষ হবে।