আপনারা শুনছেন ও পড়ছেন আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’. আজকের অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকভা, এবং স্টুডিওয় ভাষ্যকার ল্যুদমিলা পাতাকি ও কৌশিক দাস.

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর ভিত্তিতে রাশিয়ার জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানিয়ে থাকি.

তাই আমাদের ভারতবর্ষের, বাংলাদেশের, পাকিস্তানের ও মরিশাসের শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ রাশিয়া সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্ন পাঠানোর. লিখুন, কি আপনারা জানতে চান রাশিয়া ও রুশবাসীদের সম্পর্কে.

আজ আমরা ভারতের জামশেদপুর থেকে চিন্ময় মাহাতোর পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেবঃ তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের জীবনী জানতে আগ্রহী.

এবং পাকিস্তানের আরিফওয়ালা থেকে রানা আফজলের পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেবঃ মস্কো থেকে সোচি শহর কত দূরে? মোটরগাড়িতে চড়ে মস্কো থেকে সোচি শহরে পৌঁছানো কি সম্ভব?

অতএব, এবার শ্রী চিন্ময় মাহাতোর অনুরোধ পূরণ করছি. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৫২ সালের ৭ই অক্টোবর লেনিনগ্রাদে(অধুনাতন সেন্ট-পিটার্সবার্গে) এক শ্রমিক পরিবারে. তার বাবারও নাম ছিল ভ্লাদিমির. তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হয়ে লড়াই করেছিলেন, গুরুতর আহত হয়েছিলেন. যুদ্ধের পরে লেনিনগ্রাদের ওয়াগান ফ্যাক্টরিতে মিস্ত্রীর পদে কাজ করতেন. মা মারিয়া পুতিনাও ঐ কারখানায় কাজ করতেন. তাকে যুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ লেনিনগ্রাদের সমস্ত দুর্দশা সইতে হয়েছিল – প্রবল শীত ও দুর্ভিক্ষ.

মাধ্যমিক স্কুল থেকে পাশ করার পরে পুতিন লেনিনগ্রাদ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিভাগে পড়াশোনা করেছিলেন. ১৯৭৫ সালে তিনি সেখান থেকে পাশ করার পরে, তাকে কে.জি.বি(রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কমিটি)তে কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল. রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর পুতিন গল্প করেছিলেন, যে ছেলেবেলা থেকেই তার ভালোলাগতো গুপ্তচরদের নিয়ে তোলা সোভিয়েত ফিল্মগুলি এবং তার স্বপ্ন ছিল কে.জি.বি.তে কাজ করার. পরবর্তী ১০ বছর ধরে ভ্লাদিমির পুতিন কে.জি.বি.র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কোর্সে ও বিভিন্ন ফ্যাকাল্টিতে বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তির উপর পড়াশোনা করেছিলেন.

প্রাপ্ত শিক্ষা ভ্লাদিমির পুতিনের কাজে লেগেছিল ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, তত্কালীন পূর্ব জার্মানীর ড্রেসডেন শহরে রুশী-পূর্ব জার্মান মৈত্রীভবনে কাজ করার সময়. লেনিনগ্রাদে প্রত্যাবর্তণ করার পরে তিনি কে.জি.বি. থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন.

১৯৯০ সালে পুতিন প্রথমে লেনিনগ্রাদ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরামর্শদাতার পদে ও তারপরে লেনিনগ্রাদের নাগরিক পরিষদের সভাপতির পরামর্শদাতার পদে নিযুক্ত ছিলেন.

১৯৯১ সালে লেনিনগ্রাদকে তার পুরনো ঐতিহাসিক নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয় – সেন্ট-পিটার্সবার্গ. ঐ বছরেই ভ্লাদিমির পুতিন নগরপালের অধীনস্থ বহির্যোগাযোগ কমিটির চেয়ারম্যানের পদে আসীন হন, আর ১৯৯৪ সালে তাকে সেন্ট-পিটার্সবার্গ নগরীর নগরপালের প্রধান সহকারীর পদে নিয়োগ করা হয়.

১৯৯৬ সালে ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল মস্কোয়. এখানে তিনি প্রথমে রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলত্সীনের প্রশাসন দপ্তরে নিযুক্ত হয়েছিলেন. ১৯৯৯ সালে তিনি প্রথমে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ও তারপর প্রধানমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত হন. আর বরিস ইয়েলত্সীন যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করেন, তখন পুতিনকে নিযুক্ত করে যান কার্যনির্বাহী রাষ্ট্রপতির পদে.

২০০০ সালে পুতিন দেশে গণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হন এবং ২০০৪ সালে দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর পদে জয়লাভ করেন. সেবার তার স্বপক্ষে ভোট দিয়েছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোটদাতা.

২০০৮ সালে রাশিয়ার তত্কালীন রাষ্ট্রপতি দমিত্রি মেদভেদেভের আদেশনামায় পুতিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন. ২০১২ সালে ভ্লাদিমির পুতিন দেশের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে তৃতীয়বার জয়লাভ করেন. সেবারে তার স্বপক্ষে ভোট দিয়েছিল ৬৩ শতাংশ ভোটদাতা.

ভ্লাদিমির পুতিনের আছে আইনের পি.এইচ.ডি.ডিগ্রী. তিনি বিবাহিত, স্ত্রীর নাম ল্যুদমিলা. তার দুই কন্যা – মারিয়া ও কাতেরিনা. তিনি ক্রীড়াপ্রেমিক, জুডো চর্চা করেন. ছুটি কাটাতে পছন্দ করেন সোচিতে.

আপনারা শুনছেন ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ নামক অনুষ্ঠান ‘রেডিও রাশিয়া’ থেকে.

আর এবার উত্তর দেব পাকিস্তানের আরিফওয়ালার শ্রোতা রানা আফজলের পাঠানো প্রশ্নের. সোচি শহর মস্কো থেকে কতদূরে? মোটরগাড়িতে চড়ে মস্কো থেকে সেখানে কি পৌঁছানো সম্ভব?

আজকাল সারা বিশ্বের লোকই জানে সোচি সম্মন্ধে. ওখানে যে ২০১৪ সালে ২২-তম শীত অলিম্পিক আয়োজিত হবে. রাশিয়ায় এই প্রথমবার শীত অলিম্পিক আয়োজিত হবে. এর আগে শুধু একবার আমাদের দেশে অলিম্পিক হয়েছিল – ১৯৮০ সালে মস্কোয় গ্রীস্ম অলিম্পিক.

আমরা কিন্তু বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি. রানা আফজল জানতে চেয়েছেন মস্কো থেকে সোচির দূরত্ব.

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন. মস্কো থেকে সোচির দূরত্ব ১৬০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি. গড়ে ঘন্টাপ্রতি ৬০ কিলোমিটার গতিতে গেলে, সোচি পৌঁছাতে ২৮-২৯ ঘন্টা সময় লাগবে. তবে পথে প্রাচীণ কয়েকটি রুশী শহরে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে, সেখানে দ্রষ্টব্য অনেককিছু আছে.

যেমন, মস্কো থেকে সোচি যাওয়ার পথে ২০০ কি.মি. দূরত্বে পড়ে তুলা শহর. কোনো রুশবাসীকে তুলার নাম করলেই, সে স্মরণ করবে তুলার সুস্বাদু পিষ্টক ও সামোভারের(রুশী চিরাচরিত জল ফোটানোর ধাতব পাত্র)কথা.

তুলার কাছে মাটির তলায় প্রচুর পরিমাণে আকরিক লোহা মজুত আছে. তাই, প্রাচীণকাল থেকেই সেখানে অস্ত্র বানানো হয়. ইতিহাসে দুবার তুলার অধিবাসীরা শত্রুসেনাদের দ্বারা দীর্ঘকালীন শহর অবরোধ সহ্য করেছে. প্রথমবার ষোড়ষ শতাব্দীর মাঝামাঝি, যখন ঐ শহরের উপর হামলা করেছিল ক্রিমিয়ার তাতার হিরেই খান. দ্বিতীয়বার তুলা অবরুদ্ধ হয়েছিল ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়. সেবার ৪৫ দিন ধরে শহরটির ওপর জার্মান ফ্যাসিস্টরা গোলাগুলি ছুঁড়েছিল, কিন্তু সেবারও তুলা আত্মসমর্পণ করেনি. তাই তুলা রাশিয়ার বীর শহরগুলির তালিকায় অন্যতম.

সাধারণতঃ পর্যটকরা তুলায় ক্রেমলিন দর্শন করার পরে যায় নিকটবর্তী ইয়াসনায়া পলিয়ানায়, যেখানে মহান রুশী লেখক লেভ তলস্তোয়ের পারিবারিক এস্টেট. স্বয়ং তলস্তোয় পছন্দ করতেন পায়ে হেঁটে তুলায় যেতে – দূরত্ব মাত্র ১৪ কি.মি.

আমরা সংক্ষেপে কেবলমাত্র একটি শহরের বৃত্তান্ত জানালাম, কিন্তু মস্কো থেকে সোচি যাওয়ার পথে বহু আকর্ষক শহর আছে. রাশিয়ার ইতিহাসে তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ভূমিকা.

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠান শুনছেন আপনারা.

আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হতে চলেছে. বিদায় নেওয়ার আগে প্রিয় শ্রোতারা, আপনাদের একটা গান শোনার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি...

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠানটি এখানেই শেষ করছি. ইন্টারনেটে আমাদের সাথে যোগাযোগের ঠিকানা – letters a ruvr.ru. আমাদের দেশের এবং বিশ্বের হালচাল সম্পর্কে জানতে চাইলে যেতে পারেন আমাদের সাইটে – Bengali.ruvr.ru