উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলে মাঝারি পাল্লার রকেট “মুসুদান”বসানোর খবর, যা আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার উত্স থেকে দেওয়া হয়েছে, তা কোরিয়া উপদ্বীপ এলাকা জুড়ে এক নতুন উত্তেজনার অধ্যায়ের সূচনা করেছে. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে যে ধরনেরই কাজ করা হোক না কেন, এটা হয়ে দাঁড়াবে উত্তর কোরিয়ার কথা বলার ধরনের প্রতিক্রিয়া, উত্তর কোরিয়ার বাস্তব রকেট বা পারমানবিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য নয়, - এই রকমই মনে করেছেন স্ট্র্যাটেজি ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ ভাসিলি কাশিন.

উত্তর কোরিয়ার রকেট ও পারমানবিক শক্তির যুদ্ধ সম্ভাবনা এখনও অপ্রমাণিত রয়েছে. গত কুড়ি বছরে উত্তর কোরিয়ার তরফ থেকে নিক্ষেপ করা মাঝারি পাল্লার পরীক্ষা মূলক উড়ানের সংখ্যা এতই কম যে, তা এমনকি একটা রকেট রকেটের গঠন শেষ অবধি ঠিক করে করার মতো নয়. তারই মধ্যে জন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কোরিয়ার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি ধরনের মাঝারি পাল্লার রকেট থাকার কথা. এটা বিশেষজ্ঞদের যেমন অবাক করে, তেমনই সাবধানও করে দেয়.

“মুসুদান” রকেট প্রথম দেখানো হয়েছিল ২০১০ সালের প্যারেডের সময়ে আর তার উড়ানের জন্য ব্যবস্থা ছিল বেলোরাশিয়ার তৈরী গাড়ীর পাটাতনের উপরে, যা কোনদিনও কোন রকমের পরীক্ষা মূলক উড়ান করা হয় নি. এখনও জানা নেই যে, উত্তর কোরিয়ার লোকরা প্যারেডের সময়ে কি দেখিয়েছিল, সত্যিকারের রকেট ব্যবস্থা, নাকি তার নকল. আরও বেশী অনির্দিষ্ট ব্যাপার রয়েছে আরও বড় ব্যালিস্টিক রকেট, যা “কে এন – ০৮” বলে পরিচিত, তা নিয়ে, যা দেখানো হয়েছে ২০১২ সালের প্যারেডের সময়ে.

এমনকি একটা উন্নত দেশে, যাদের কাছে সুপার কম্পিউটার রয়েছে ও তা গাণিতিক ভাবে মডেল তৈরী করে দেখার জন্য কাজে লাগতে পারে, তাদেরও দরকার পড়ত সামরিক বাহিনীর জন্য গ্রহণের আগে অন্তত বেশ কয়েকটা পরীক্ষা মূলক উড়ান করে দেখার, কিন্তু উত্তর কোরিয়া এটা একবারও করে নি. কোরিয়ার লোকদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে খুবই সফল ভাবে কক্ষপথে “ঈনখা -৩” রকেট ব্যবহার করে উপগ্রহ পাঠানোর, যা মনে করা হয়েছে যে, তাদের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক মিসাইল “তেপখোদন – ২” এর রূপান্তর. কিন্তু এটা মোটেও জমির উপর মহড়ার জায়গা থেকে রকেট ছোঁড়ার সমান নয়, যা প্রয়োজন পড়ে দিক নির্ণয় ব্যবস্থার পরীক্ষা ও যুদ্ধপোযোগী সমরাস্ত্রের গঠন নির্ণয়ের জন্য.

বোঝাই যাচ্ছে যে, পারমানবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও উত্তর কোরিয়ার তরফ থেকে তা ব্যবহারের হুমকি, আর তাদের দেখানো সব উদ্ভট রকমের সমরাস্ত্রের বহরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার তরফ থেকে বাস্তব হুমকি বলেই দেখা হবে. কোনও নেতাই কখনও নিজের উপরে সবচেয়ে বেশী সম্ভব সাবধানতা অবলম্বনের সুযোগকে, যখন অন্তত এক শতাংশও সত্যিকারের পারমানবিক আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে, তখন নিতে ছাড়বেন না. উত্তর কোরিয়া এবারে সরাসরি ও স্পষ্ট বিপদ বলেই ঘোষিত হয়েছে, আর এটা এশিয়াতে আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনায় খুবই গুরুতর পরিবর্তনকে পিছনে নিয়ে এসেছে. উত্তর –পূর্ব এশিয়াতে আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবারে অবশ্যম্ভাবী ও তা হবে দীর্ঘস্থায়ী চরিত্রের. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, তারা গুয়াম দ্বীপপূঞ্জে রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা “থাড” বসাচ্ছে.

সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি এর ফলে হয়েছে চিনের, - এই রকম মনে করেছেন রাশিয়ার সামরিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ভাসিলি কাশিন. সমস্ত নতুন সামরিক কাঠামো, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটের লোকরা এশিয়াতে করতে চলেছে, তা পরবর্তী কালে চিনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে. বেজিং ও তিয়ানশিয়ানের কাছে আমেরিকার উপস্থিতি বেড়ে যাবে, আর এর বিরুদ্ধে যে যুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারত, তা চিনের নেই – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্র প্রয়োগের সরাসরি হুমকি আমেরিকার লোকদের হাতের বাঁধন খুলে দিয়েছে.

চিন চেষ্টা করছে নিজেদের শক্তি অনুযায়ী এই পরিস্থিতিকে সামল দিতে, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিবিদদের সঙ্গে খুবই জরুরী কালীণ ব্যস্ততার সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে, কিন্তু আপাততঃ, কিছুই লাভ করতে পারে নি. উত্তর কোরিয়ার সঙ্গী হিসাবে চিনের নাম প্রায়ই করা হয়ে থাকলেও, উত্তর কোরিয়ার উপরে বাস্তব প্রভাব সেই ১৯৫০ এর দশকেই চিন অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে. উত্তর কোরিয়ার লোকরা একেবারে নিয়মিত ভাবেই চিনের স্বার্থ উপেক্ষা করছেও বেজিংয়ের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন ভাবেই নিজেদের পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে কাজ করছে, এই মনে করে যে, চিনের আর কোনও নির্বাচনের সুযোগ নেই. উত্তর কোরিয়া চিনের জন্য এখন সত্যই মাথাব্যথার কারণ হয়েছে, একটা বাধ্যতা মূলক ভার হয়েছে, যার একটাই প্রয়োজনীয়তা – আমেরিকার সেনা বাহিনীকে চিনের সীমান্তের কাছে আসতে না দেওয়ার জন্য.