আপনারা শুনছেন বা পড়ছেন আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠানঃ “রাশিয়া-ভারতীয় উপ-মহাদেশঃ ঘটনাবলী-মানুষবর্গ-স্মরণীয় তারিখগুলি”. আমাদের আজকের সম্প্রচারের বিষয় – এপ্রিলের স্মরণীয় তারিখগুলি. আমাদের এই মাসিক অনুষ্ঠানে আমরা সেইসব তারিখ ও ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করি, যেগুলি ও যারা রাশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বা রেখেছেন.

বহুবছর ধরে রাশিয়া ও ভারত যৌথভাবে মহাকাশ প্রান্তর অধ্যয়ন করে. এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়েছিল সয়ুজ টি-১১র মহাকাশ উড্ডয়নে, যার ইন্দো-রুশী অভিযাত্রী দলে ছিলেন ভারতের রাকেশ শর্মা এবং রাশিয়ার ইউরি মালিশেভ ও গেন্নাদি স্ত্রেকালোভ. ঐ উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৮৪ সালের ৩রা থেকে ১১ই এপ্রিল. দুই দেশের মধ্যে মহাকাশবিদ্যার ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে. ভারতের ভূখন্ডে রাশিয়ান ব্যবস্থা গ্লোনাসের সঠিকতাকরণ ও সংকেতের ওপর নজর রাখার স্টেশন নির্মাণ করার সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ডিসেম্বরে. এর সুবাদে উক্ত ব্যবস্থার মহাকাশের সাথে যোগাযোগের কাজে নিখুঁতত্ব বাড়বে. পরিকল্পনা রয়েছে, যে ২০১৭ সালে ভারতীয় ছোট চন্দ্রপরিব্রাজককে রাশিয়ার যান চাঁদে পৌঁছে দেবে.

প্রতিবছর ৭ই এপ্রিল ভারত উদযাপন করে মহান ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার পন্ডিত রবিশঙ্করের জন্মদিবস. রাশিয়ায় রবিশঙ্কর ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ও আদরনীয়. দুর্ভাগ্যক্রমে, গত ডিসেম্বর মাসে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন. স্বয়ং পন্ডিতজী আন্তরিক উষ্ণতার সঙ্গে তাঁর অসংখ্য রাশিয়া সফরের স্মৃতিচারণা করেছেন. অনেকেই মনে করেন, যে যৌবনে তাঁকে দেখতে ছিল অবিকল মহান রুশী কবি আলেক্সান্দর পুশকিনের মতো. ১৯৫৪ সালে তাঁর প্রথম রাশিয়া সফরের সময় একজন রুশী চলচ্চিত্র পরিচালক এমনকি তাঁকে সিনেমায় পুশকিনের ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন. এই সম্পর্কে রবিশঙ্কর লিখেছিলেন তাঁর ‘আমার সঙ্গীত – আমার জীবন’ নামক বইতে. এই বইটি রুশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে. ৭ই এপ্রিল এই অনন্যসাধারণ প্রতিভাশালী ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকারের বয়স ৯৩ বছর পূর্ণ হতে পারতো.

১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল মানবজাতি তার সভ্যতার বিকাশে এক বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছিল. এইদিনে রুশী ইউরি গাগারিন প্রথম মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে অবলোকন করেছিলেন. সফল মহাকাশযাত্রার পরে গাগারিন অর্ধেক বিশ্ব পরিভ্রমণ করেছিলেন – পৃথিবীর বহুদেশই প্রথম মহাকাশচারীর সান্নিধ্যের আকাঙ্খা করতো. ভারতে তিনি পাঁচটি শহর সফর করেছিলেন. স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু স্বয়ং ইউরি গাগারিনকে আপ্যায়ণ করেছিলেন. মুম্বাইয়ে তাজ হোটেলে সংবাদ-সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় গাগারিন মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবীকে তুলনা করেছিলেন মহাকাশযানের সাথে, যা ছুটছে তীব্রবেগে মহাজাগতিক প্রান্তরে. তখন ইউরি গাগারিন বলেছিলেন – “এই মহাকাশযানটির যৌথ মালিক পৃথিবীর সমস্ত অধিবাসী এবং অভিযাত্রী দলের শান্তি ও সৌহার্দ্যে থাকা উচিত্”.

ভারতের স্বাধীনতা ঘোষনার চারমাস আগে আমাদের দুইদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল. রাশিয়ার সাথে সহযোগিতা ভারতের স্বার্থের পক্ষে অপরিহার্য, এই স্থিরবিশ্বাসে অনুপ্রেরিত হয়ে নেহেরু মস্কোয় ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূতের পদে নিয়োগ করেছিলেন তাঁর ভগিনী বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিতকে. মস্কো যাত্রী প্রথম কূটনীতিবিদদের দলটিকে আশীর্বাদ করে জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন – আমরা প্রতিবেশী, এবং আমাদের মধ্যে বহু মিল. “আমাদের মধ্যে নেই বা কোনোদিনো হবে না রশি টানাটানি”. আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের ৬৬ বছরের ইতিহাস এই উদ্ধৃতির সত্যতা প্রমাণ করে দিয়েছে.

এপ্রিলে পরলোকগমন করেছিলেন ভারত উপ-মহাদেশের অনন্যসাধারণ কবি, চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মী মুহম্মদ ইকবাল. ১৯৩৮ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন. ইকবাল স্বপ্ন দেখতেন ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও উদারপন্থার ভিত্তিতে আদর্শ সমাজের. কবির মৃত্যুর কয়েকমাস আগে তাঁর কাছে গেছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু. ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে নেহেরু লিখেছেন, যে তাদের আলোচনকালে ইকবাল রাশিয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন. শতাধিক বছর আগে, ১৯১২ সালে রাশিয়া ইউরোপে প্রথম দেশ, যে ইকবালের সৃজনশীলতা সম্পর্কে বই প্রকাশ করেছিল. সেই থেকে আমাদের দেশে ইকবালের বহু সাহিত্যিক ও দার্শনিক রচনা প্রকাশিত হয়েছে. রাশিয়ার পাঠকরা ইকবালের রচনা পড়ে রুশী অনুবাদে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উর্দু ও হিন্দী ভাষা অধ্যয়নশীল শিক্ষার্থীরা সানন্দে তাঁর অসামান্য কবিতা মুখস্ত করে.