বুধবারে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জ্জী মহিলাদের সঙ্গে যৌনতা ভিত্তিক অপরাধ ও ধর্ষণের জন্য শাস্তি কঠোর করা নিয়ে এক আইনে স্বা৭র করেছেন. প্রসঙ্গতঃ, ভারত থেকে এসে পৌঁছনো তথ্য অনুযায়ী, দেশের সমস্ত মহিলারা মোটেও বিশ্বাস করেন না যে, নতুন আইন হওয়া তাঁদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবে. পুলিশের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখার অধিকার চেয়ে আবেদন করা মহিলাদের সংখ্যা ভারতে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে.

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে এক ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক গণ ধর্ষণে ২৩ বছরের এক ছাত্রীর মৃত্যু পর থেকে সারা দেশ জুড়ে সরকারের কাছে মহিলাদের রক্ষার জন্য গণ বিক্ষোভ মিছিলের ঢেউ বয়ে গিয়েছে. ভারতের পার্লামেন্টের দুই কক্ষই - লোকসভা ও রাজ্যসভা – নতুন আইন গ্রহণ করেছেন, যাতে ধর্ষণ ও এই ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তি কঠোর করা হয়েছে. এবারে ধর্ষণের জন্য সবচেয়ে কম হাজতবাসের মেয়াদ হয়েছে ২০ বছর. অ্যাসিড ছুঁড়ে আক্রমণ, পেছনে অনুসরণ করা, লুকিয়ে দেখা ও হেনস্তার জন্যও শাস্তি বরাদ্দ হয়েছে এই প্রথম.

কিন্তু ভারতের রাস্তাঘাট মোটেও এখন নিরাপদ নয়. তার মধ্যে আবার বিদেশিনীদের উপরে আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে. বিগত সময়ের সবচেয়ে প্রতিধ্বনি তোলা ঘটনা হয়েছে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে মার্চ মাসের মাঝামাঝি এক সুইজারল্যান্ডের মহিলাকে গণ ধর্ষণের ঘটনা, আর তারই সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের এক ট্যুরিস্ট মেয়ের সঙ্গে আগ্রার এক হোটেলে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা, যা বিশ্ব খ্যাত তাজমহলের চেয়ে অল্প দূরে. এই বিদেশিনী হোটেলের মালিককে ধর্ষক বলে সন্দেহ করে হোটেলের দোতলার জানলা দিয়ে লাফ দিয়ে পড়েছিল.

ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের এক জনমত গ্রহণ অনুযায়ী শতকরা ৭৬ ভাগ, বা চারের তিন অংশ মতদানকারী মনে করেন যে, বিদেশিনীদের জন্য ভারতে যাওয়া বিপজ্জনক. ভারতের পর্যটন শিল্প ইতিমধ্যেই টের পেয়েছে নিজেদের ইমেজ খোয়া যাওয়ার ফল, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতের অ্যাসোচ্যাম সংস্থার করা এক গবেষণার ফল অনুযায়ী বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা এই বছরের প্রথম তিন মাসে ভারতে কমেছে শতকরা ২৫ ভাগ, আর মহিলা পর্যটকদের সংখ্যা কমেছে শতকরা ৩৫ ভাগ. সামাজিক বিক্ষোভের ঢেউ, অর্থনৈতিক ও দেশের মর্যাদার ক্ষতির দিকে না তাকালেও, যদি ভারতেরই সংবাদ মাধ্যমের খবরের দিকে তাকানো হয়, তবে মনে হবে যে, এই দেশে ঘটনা পরম্পরা যেন দুটি আলাদা বাস্তবের স্তরে ঘটে চলেছে: একদিকে সমাজ রাগে দুঃখে জ্বলে উঠেছে, আর সরকার ঠিক আইন গ্রহণ করছে, আবার অন্য দিকে – সবই চলছে গতানুগতিক ভাবেই. অন্তত দেশের বিভিন্ন এলাকার থেকে ধর্ষণের খবর বিগত দুই তিন মাসে কম আসে নি”.

সম্ভবতঃ ভারতের অনেক মহিলাই এটা বুঝতে পেরেছেন ও ঠিক করেছেন নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করবেন. দিল্লী শহরে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়পত্র বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মহিলাদের সংখ্যা, যাঁরা গত তিন মাসের মধ্যে বন্দুক কিনে নিজেদের কাছে রাখতে চেয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা বেড়েছে তিন গুন. যদি ২০১২ সালের সারা বছরে এর জন্য আবেদন পত্র জমা পড়েছিল – ৪৪টি, তবে এবারে প্রথম তিন মাসেই পড়েছে – ২১টি. ২০১৩ সালে তাই এই সংখ্যা বাড়বেই.

সর্বভারতীয় প্রোগ্রেসিভ উইমেনস অ্যাশোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদিকা কবিতা কৃষ্ণন এই প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, “এটা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিজেদের নাগরিকদের রক্ষা করতে না পারার একটা স্পষ্ট প্রমাণ... যখন সরকার বলে দেয় যে, তাঁরা আপনাদের রক্ষা করতে পারবে না, তখন নাগরিকদের বাধ্য হয়ে নিজেদের রক্ষা করার উপায় খুঁজতে হয়”. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ শ্রীমতী কৃষ্ণন কিছু বিষয়ে অবশ্যই সম্ভবতঃ ঠিকই বলছেন, কিন্তু প্রশ্ন হল যে, এই সকলের হাতে অস্ত্র পৌঁছলে, অর্থাত্ সাধারণ লোক, যাঁরা অস্ত্র ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিয়ে অভ্যস্ত নন, তাঁদের কাছে অস্ত্র থাকলে তা আরও বড় রকমের হিংসা বৃদ্ধির কারণ কি হবে না, আর এমনও তো হতে পারে যে, রাস্তায় কোন লোকের চাউনি পছন্দ না হলেই মহিলারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুর করবেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা ও ব্যবহারের ঐতিহ্য এত পুরনো, সেখানেও অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই সব জিনিষের নিয়ন্ত্রণ হীন ভাবে কাছে রাখাও আরও বড় মাপের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে”.

আর অন্তত পক্ষে ভারতীয় মহিলাদের হাতে অস্ত্র থাকলে, তা মোটেও ভারতে পর্যটক বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না, রুশ বিশেষজ্ঞ এই রকমই মনে করেন.