দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান আগ্রাসকরা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে দখল করে স্বদেশে নিয়ে গেছিল অমূল্য শিল্পসামগ্রী – অম্বরনির্মিত কক্ষ. এখনো পর্যন্ত সেটাকে খোঁজা হচ্ছে.

ভাগ্যের পরিহাসে জার্মানীর রাজা ফ্রিডরিখ-উইলহেলম ১৭১৭ সালে এই বেনজির কক্ষটি উপহার দিয়েছিলেন রুশী জার প্রথম পিটারকে. ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিভাবান কারিগররা ৮ টন সূর্যোজ্বল পাথর দিয়ে সুক্ষ অম্বরের প্যান্নো বানিয়েছিলেন ও তার উপর অলঙ্কারের মিনে করেছিলেন. ১৭৭০ সালে সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনা অম্বর কক্ষকে স্থান দিয়েছিলেন পিটার্সবার্গের অনতিদূরে জারস্কোয়ে সেলোতে(জারের গ্রামে)তার রাজপ্রাসাদে.

১৯৪১ সালে হিটলার আক্রমণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন. তার ফৌজগুলি যুদ্ধের প্রথম কয়েকমাসে দ্রুত রাশিয়ার বহু গভীরে সব এলাকা দখল করছিল. অম্লর কক্ষকে সরিয়ে নেওয়ার সময় মেলেনি. জার্মানরা ঐ দামী যুদ্ধে জয় করা স্মারক নিয়ে গেছিল কেনিগসবার্গে(বর্তমানে ওটা রাশিয়ার শহর কালিনিনগ্রাদ). চুরি করা অম্বরের প্যান্নো রাখা হয়েছিল একটি রাজবাড়িতে, তবে বেশিদিনের জন্য নয়. যুদ্ধ দ্রুত কেনিগসবার্গের দিকে ধেয়ে আসছিল. ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাসে আকাশ থেকে বৃটিশ এয়ারফোর্সের আক্রমণে ঐ রাজবাড়িতে আগুন লেগেছিল. তারপরে অম্বর কক্ষকে বিভিন্ন বাক্সে প্যাকিং করে রাজবাড়ির ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখা হল. কিন্তু ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে যখন সোভিয়েত ফৌজগুলি কেনিগসবার্গের দখল নিল, তখন ভূগর্ভে অম্বরের বাক্সগুলো আর পাওয়া গেল না. অম্বর কক্ষ অদৃশ্য হয়ে গেল.

ওটাকে খোঁজার কাজ শুরু হল যুদ্ধের ঠিক পরেই, কেনিগসবার্গে সব ভূগর্ভস্থ জায়গায় তল্লাসী করা হয়েছিল. সোভিয়েত সৈনিক ও মিউজিয়ামের কর্মীরা জার্মানদের দ্বারা অপহৃত বহু দামী শিল্পসামগ্রী খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু অম্বর কক্ষের কোনো হদিশ পাওয়া গেল না. কেনিগসবার্গের মিউজিয়ামের অধ্যক্ষ আলফ্রেড রোডের সহযোগিতার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কিন্তু ১৯৪৫ সালের শেষদিকে রোড়েও উধাও হয়ে গেলেন. বাজারে গুজব ছিল, যে তাকে খুন করেছে তারাই, যারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে অম্বর কক্ষ ফেরত দিতে চায়নি.

তবে সে ছিল সবে কলির সন্ধ্যে. ১৯৪৫ সালেই এক সোভিয়েত অফিসার মোটর সাইকেলে চড়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তির সাথে দেখা করতে, যার কথা ছিল অম্বর কক্ষের অবস্থানের হদিশ দেওয়ার. কিন্তু কেউ রাস্তায় তার বিছিয়ে দিয়েছিল, ঐ তারে জড়িয়ে অফিসারের গলাছিন্ন হয়ে যায়. আর যে ব্যক্তির ঠিকানায় ঐ অফিসার তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলেন, তাকে কেউ শ্বাসরুদ্ধ করে খুন করেছিল.

জার্মানীর খামারমালিক গেওর্গ স্টাইন বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অম্বর কক্ষের সন্ধান করেছিলেন. ১৯৮৭ সালে তার হাতে এসেছিল সাড়াজাগানো তথ্য. স্টাইন সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ঐ তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন. বন্ধুকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেনঃ “আমাদের ইউরোপে অম্বর কক্ষ খোঁজার কোনো মানেই হয় না, ওটাকে অনেকদিন আগেই আমেরিকায় পাচার করা হয়েছে”. কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলন আর হয়নি. জার্মানীর সংবাদপত্রগুলি লিখেছিল, যে স্টাইন ছুরি দিয়ে পেট ফাঁসিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন.

মাত্র তার তিনসপ্তাহ পরে উদ্দীপক বই ‘অম্বর কক্ষের কাহিনী’র লেখক পাউল এনকে প্রাণ হারান. ৫২-বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক অকস্মাত্ পরলোকগমন করেন এক বিরল আভ্যন্তরীন জটিল রোগে.

১৯৯২ সালের শেষদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা পরিচালনা দপ্তরের উপ-প্রধান জেনারেল-লেফটেন্যান্ট ইউরি গুসেভ অম্বর কক্ষের সন্ধান করার আওতায় এক সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন. তিনি জানিয়েছিলেন, যে সেইসময়ে একব্যক্তি লন্ডন থেকে মস্কোয় এসেছিল গুরুত্বপূর্ণ সব দলিল নিয়ে. তখন জেনারেল সাংবাদিকদের মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিলেনঃ ধরা যাক, আমি জানি, যে অম্বর কক্ষ কোথায় লুকানো আছে, কিন্তু আমি যদি সেটা ফাঁস করি, তাহলে এক সপ্তাহ পরে না আমি, না আপনারা, কেউ আর জীবিত থাকবো না, এতটাই শক্তিশালী তারা, যারা অম্বর কক্ষ লুকিয়ে রেখেছে. জেনারেল ঐ সাক্ষাত্কার দিয়ে যেন নিজের জীবন রক্ষা করতে চেয়েছিলেন. কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক উল্টোটা – জেনারেল গুসেভ সড়কদুর্ঘটনায় নিহত হন. আর গুসেভের সঙ্গে লন্ডন থেকে সাক্ষাত্ করতে আসা ইংরেজকে হোটেলের ঘরে মৃত অবস্থায় আবিস্কার করা হয়.

বহু দশক ধরে অম্বর কক্ষের সন্ধান কোনো ফলই দেয়নি. অন্যদিকে ১৯৭৯ সাল থেকে শিল্পবিশারদ, হস্তশিল্পী ও পুণরুদ্ধারকারীরা নতুন করে অম্বর কক্ষ বানানো শুরু করলেন. অষ্টাদশ শতাব্দীর কারিগরদের কৌশল ব্যবহার করে, তাদের পাঁচলক্ষ টুকিটাকি ডিটেল বানানোর দরকার ছিল. সৌভাগ্যবশতঃ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তোলা অম্বর কক্ষের ফোটো অক্ষত ছিল. পুণরুদ্ধারকারীদের জন্য ঐ ফোটোই ছিল নমুনা. তারা কুড়ি বছর ধরে নতুন অম্বর কক্ষ নির্মাণ করেছিলেন.

২০০৩ সালে, সেন্ট-পিটার্সবার্গ নগরের ৩০০-তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অম্বর কক্ষকে পুরোপুরি গড়ার কাজ সম্পন্ন হয়. সেটা আগের জায়গা – জারস্কোয়ে সেলোতে একাতেরিনার প্রাসাদের শোভাবর্ধন করছে এখন. প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ওখানে যায় ঐ অম্বরযাদু নিজেদের চোখে দেখবার জন্য. আর পুরনো অম্বর কক্ষ, খুব সম্ভবতঃ বরাবরের মতো খোয়া গেছে.