বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী কোরিয়া উপদ্বীপ এলাকা প্রায় যুদ্ধের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে. আসলে, উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপরে আঘাত হানার হুমকি – এটা স্রেফ কূটনৈতিক-প্রচার. কিন্তু তা পিয়ংইয়ং এর অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ খবর থেকে মনোযোগ নষ্ট করে দিয়েছে. উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে খুবই গুরুতর পরিবর্তন হয়েছে, যা এই দেশের উন্নতির বিষয়ে কিছু পথ পরিমার্জনের সম্বন্ধে আশা জাগাতেই পারে, এই রকম মনে করেন রাশিয়ার নাগরিক ও সিওলের কুনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আন্দ্রেই লানকভ.

জন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কোরিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন পাক পোং জ্যু, যাঁর সংস্কার সাধক বলে খ্যাতি রয়েছে. তিনি আগেও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ও ২০০২ সালে “১লা জুলাই” ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত সূচক ভূমিকা পালন করেছিলেন – সবচেয়ে দ্রুত সংস্কারের চেষ্টা, যা আগে কখনও উত্তর কোরিয়ার মন্ত্রীসভা করার চেষ্টা করেছে. তাঁরা, অংশতঃ, আংশিক ভাবে ব্যক্তিগত বাণিজ্য আইনসঙ্গত করেছিলেন ও সরকারি প্রকল্প গুলিতে ম্যানেজারদের দায়িত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিলেন. এই ব্যবস্থা গুলি ছিল কিম ইর সেনের মৃত্যুর পরে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির ছন্নছাড়া অবস্থা সংশোধনের একটা উত্তর.

কিন্তু যখন সংস্কার সাধন ও বিদেশ থেকে আসা বহুল পরিমানে মানবিক সাহায্য পেয়ে উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল, তখন এই সংস্কারের কাজ গুটিয়ে ফেলা হয়েছিল. ২০০৭ সালে পাক পোং জ্যু পদত্যাগ করেন ও তাঁকে সুনছোন নামক জায়গার এক কারখানায় ডিরেক্টর পদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল. কিন্তু কিম চেন ইরের মৃত্যুর পরে ও কিম চেন ঈনের ক্ষমতায় আসার পরে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে পাক পোং জ্যু উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে লঘু শিল্প দপ্তরের প্রধান হিসাবে ফিরে আসেন. আর এখন এই পদ থেকে আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদে. তাঁর পুরনো সংস্কার সাধকের ইতিহাস আশা জাগায় যে, উত্তর কোরিয়াতে খুবই সত্বর পরিবর্তনের সূত্রপাত হতে পারে.

এই আশা আরও মজবুত হয়েছে দেশের সামরিক বাহিনীতেও স্থান পরিবর্তনের ফলে. সেখানে চলছে সৈন্য বাহিনীর জেনারেলদের জায়গায় রাজনৈতিক জেনারেলদের বসানোর কাজ. বহু বিদেশী পর্যবেক্ষকদের অবাক করে দিয়ে উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নতুন পলিটব্যুরো সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রধান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে জায়গা দেয় নি. কিন্তু সেখানে রয়েছেন কোরিয়ার জাতীয় সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান ছে রিয়ন হে.

তিনি বহুদিন ধরে প্রথমে উত্তর কোরিয়ার কমসোমলের প্রধান ছিলেন, আর তারপরে ছিলেন প্রাদেশিক কমিটির সাধারন সম্পাদক. এই ভাবেই তিনি সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন, কোন রকমের সামরিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই. তা স্বত্ত্বেও তিনিই বর্তমানে কোরিয়ার জেনারেল ও মার্শালদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রভাবশালী হয়ে দাঁড়িয়েছেন.

এটা খুব ভাল করেই সেই প্রবণতার সঙ্গে মিলেছে, যা গত বছরের সারা সময় ধরেই টের পাওয়া গিয়েছে. সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব কমছে, আর উল্টো দিকে দেশের রাজনৈতিক কর্তা ব্যক্তি ও প্রকৌশলীদের ক্ষমতা বাড়ছে. এখানে দ্রষ্টব্য হল যে, বর্তমানের লোক দেখানো সামরিক হুঙ্কার এই প্রক্রিয়ার উপরে তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারে নি. যদিও উত্তর কোরিয়ার সংবাদ মাধ্যম নিয়মিত ভাবেই বলে চলেছে যে, যুদ্ধ যে কোন দিনই শুরু হতে পারে, তাও সামরিক বাহিনীর লোকদের ক্ষমতার থেকে দূরেই সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে. এটা আরও একটা স্পষ্ট ব্যাপারেই প্রমাণ: কিম চেন ঈনের কোনও রকমের সামরিক পরিকল্পনাই বাস্তবে নেই. তিনি শুধু নিজেই আক্রমণ করতে চাইছেন না, বরং কোন রকমের বাইরে থেকে আক্রমণের আশঙ্কাও করছেন না.

পাক পোং জ্যু এর শীর্ষে আরোহণ ও সামরিক বাহিনীতে স্থান পরিবর্তনের অর্থ কি উত্তর কোরিয়াতে সংস্কারের শুরু? আপাততঃ এই প্রশ্নে উত্তর মেলে নি. কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে যে, উত্তর কোরিয়ার সংস্কার সাধন এই ধরনের যুযুধান সামরিক রণ হুঙ্কারের সঙ্গে ও সারাক্ষণ ধরে শত্রু বেষ্টনীতে থাকা নিয়ে মনে করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে খুবই ভাল করে মিশে যেতে পারে. শেষমেষ, বাইরের থেকে বিপদ নিয়ে কথাবার্তা দেশের জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করে ও তাদের বেশী নিয়ন্ত্রণ উপযুক্ত করে তোলে. আর নিয়ন্ত্রিত ও বাধ্য উত্তর কোরিয়ার জন সাধারণ শুধু দেশের সংরক্ষণশীল লোকদেরই দরকার নেই, যারা সংস্কার সাধন করতে চান তাদেরও দরকার রয়েছে.