যদি সারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের খবর বিশ্বাস করতে হয়, তবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখন যুদ্ধের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে.

পিয়ংইয়ং ঘোষণা করেছে যে, তারা শান্তি অবস্থিতি ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ও হুমকি দিয়েছে যে, সিওল ও ওয়াশিংটন আগুনের সমুদ্র বানিয়ে ছেড়ে দেবে. এই ধরনের ঘোষণা উত্তরের লোকরা আগেও করেছে. কিন্তু এখন এই ধরনের হুমকির ঘনত্ব বাড়াবাড়ি রকমের বেশী. এটা অবশ্য সত্যি যে, কখনও সেই গুলি হাস্যস্কর ঠেকছে. যেমন, সামান্য আগেই উত্তর কোরিয়া টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে যে, কিভাবে কিম চেন ঈন নিজের মার্শাল ও জেনারেলদের আদেশ দিচ্ছেন. সেই জায়গার দেওয়ালে ঝুলছিল আমেরিকাকে আক্রমণের পরিকল্পনা, সেই সমস্ত শহরের কথা উল্লেখ করে, যেগুলি উত্তর কোরিয়ার রকেট বাহিনীর আক্রমণে একেবারে বিশ্বের জমির উপর থেকে মুছে দেওয়া হবে.

পিয়ংইয়ং এই ধরনের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি নিয়েছে কেন? খুব সম্ভবতঃ, উত্তর কোরিয়ার কূটনীতি বিগত সময়ে যে ধরনের গুরুতর সমস্যার মধ্যে রয়েছে, তার কারণেই এই ভঙ্গী. তার মধ্যে প্রধান হল মানবিক সাহায্য পাওয়ার ইচ্ছা.

উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার খুবই অসফল গঠনের জন্য উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র গঠন ও প্রশাসনের টিকে থাকার জন্য অনেকটাই ভরসা করতে হয়ে থাকে বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার উপরে, যা এই দেশের প্রশাসনের পক্ষে শর্ত সাপেক্ষ ও তা তাদের জন্যই গ্রহণযোগ্য হওয়ার দরকার.

প্রায় বিগত কুড়ি বছর ধরে এই ধরনের সাহায্য পাওয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিবিদেরা শুধু একটা উপায়ই বের করতে পেরেছে. প্রথমে পিয়ংইয়ং উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে শুরু করেছে, প্রতিবেশী দেশ গুলির উপরে আঘাত হানার বিষয়ে প্রস্তুত বলে, দেশের সামরিক বাহিনীকে অতিরিক্ত রকমের সামরিক প্রস্তুতি নিতে বলেছে আর গোপন পারমানবিক পরিকল্পনার সাফল্য নিয়ে খবর আলতো করে প্রকাশ করিয়েছে. তার পরে, যেই আগ্রহী দেশ গুলি ও আন্তর্জাতিক সমাজ স্পষ্টই নিজেদের কোরিয়া উপদ্বীপে ঘটা ব্যাপার নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে, তখন উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিবিদেরা ঘোষণা করেছে যে, তারা এবারে কথা বলতে তৈরী. এই প্রসঙ্গে পিয়ংইয়ং থেকে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোচনার অর্থ হল ছাড় দেওয়া, আর ছাড় দিতে উত্তর কোরিয়া বিনামূল্য রাজী নয়. প্রত্যেকবারই এই সঙ্কট ভাল ভাবেই শেষ হয়েছে. বিশ্ব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে আর উত্তর কোরিয়াকে তাই দিয়েছে, যা তারা পেতে চেয়েছে – বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হয় খাদ্যে নয় অর্থনৈতিক সহায়তা.

কিন্তু বিগত সময়ে এই কৌশল আর কাজে লাগছে না. এই বিষয়ে দুটি কারণ রয়েছে. প্রথমতঃ, এই কৌশলের প্রধান যে সব ঠিকানা – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান – তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে. ফলে একাধিকবার এই ধরনের ঘটনা পরম্পরার পুনরাবৃত্তিতে অর্থাত্ সঙ্কট – আলোচনা – সহায়তা, আগ্রহী পক্ষদের একটা ধারণা তৈরী হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার ছাড় দেওয়াতে এই ধরনের সমস্যা সাময়িক ভাবে সমাধান হলেও তা একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির তৈরী করছে ও বাস্তবে আবারও এই ধরনের সঙ্কটের রাস্তা খোলা রাখছে. তাই এবারে ওয়াশিংটনে কোন রকমের ছাড় দিতে তাড়া করা হচ্ছে না, সেই কথা মনে করে যে, এই ধরনের ছাড় দেওয়া শুধু পুরনো পিয়ংইয়ং এর রাজনীতির ফলপ্রসূতা প্রমাণ করে দেয়.

দ্বিতীয়তঃ, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার হুমকি কোন দিনও কাজে পরিণত হয় নি, যা আসলে ভালই. ভয়ঙ্কর আঘাত হানার হুমকি উত্তর কোরিয়া থেকে ঈর্ষা করার মতো নিয়মিত ভাবেই দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কোন রকমের সত্যিকারের আঘাত এর পিছনে কখনও করা হয় নি. সেই সমস্ত সময়ে, যখন উত্তর কোরিয়া কোন না কোন স্থানীয় আঘাত হেনেছে, তখন এই কাজ করা হয়েছে হঠাত্ করেই ও কোন রকমের প্রাথমিক ভাবে হুমকি না দিয়ে.

আর এই বারেও পুরনো কৌশল কাজ করছে না দেখে, পিয়ংইয়ং ঠিক করেছে গলার স্বর উঁচু করতে ও এই সঙ্কট একেবারেই ব্যতিক্রমী বলে প্রমাণ করতে. কিন্তু এটাই কাজ নাও করতে পারে. পিয়ংইয়ং এই ক্ষেত্রে কি করবে? কৌশল পাল্টাবে আর সিওলের সঙ্গে আলোচনায় বসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে? মনে তো হয় না. বরং বেশী সম্ভাব্য মনে হচ্ছে পরবর্তী সময়ে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধির. আর এটা খুবই বিপজ্জনক. কারণ সিওলে আর ওয়াশিংটনে কারও একজনের স্নায়ু বৈকল্য হতেই পারে.