রাশিয়ার রাজতন্ত্রের ইতিহাসে কম রহস্য লুকিয়ে ছিল না. প্রজাদের কোনো ধারনাই ছিল না, যে বর্ণাঢ্য প্রাসাদগুলির প্রাচীরের অন্তরালে কত মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটতো. কিন্তু ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরে জারের পরিবারের মহাফেজখানা জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়, তাদের ডায়েরী, চিঠিপত্র পড়ার সুযোগ হয়. সেখান থেকেই আমরা জানতে পারি, যে জারের পরিবারে হৃদয়াবেগ কিরকম তোলপাড় করতো. আমাদের আজকের কাহিনী শেষ রুশী সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাইয়ের অন্যতমা কন্যা ওলগার গোপন প্রেম নিয়ে.

জারের কন্যাদের ভাগ্য নির্ধারিত হোত রাজতন্ত্রের নিয়ম অনুসারেঃ সমাজের অন্যস্তরের ব্যক্তির সাথে বিবাহ ছিল অসম্ভব. কিন্তু হৃদয় যে কোনো আদেশ মানে না. ১৯১১ সাল থেকে রাজকুমারী ওলগার ডায়েরীগুলিতে আবির্ভাব হয় তার নিজে ভেবে বার করা অবোধ্য হেঁয়ালি বয়ান. সেসবই রাজকুমারীর প্রথম এবং সম্ভবতঃ একমাত্র ভালোবাসার পাত্রকে কেন্দ্র করে. গবেষকরা তার নাম বের করেছেন – পাভেল ভোরোনভ, জারের নিজস্ব বিলাসবহুল জাহাজের অন্যতম অফিসার. অভিজাত বংশের সন্তান পাভেল নেভি ক্যাডেট কর্পাস থেকে পাশ করে যুদ্ধজাহাজ ‘এ্যাডমিরাল মাকারভে’ কাজ করতে ঢুকেছিল. সেখানে পাভেল এমন ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে পড়লো, যার দিকে সারা পৃথিবী নজর রেখেছিল. ১৯০৮ সালের ১৫ই ডিসেম্বর ইতালির সিসিলি দ্বীপে প্রবল ভূমিকম্প হয়. এক পলকে মেসিনা শহর ধ্বংস হয়ে যায়, হাজার হাজার জীবন্ত মানুষ ধ্বংসস্তুপের তলায় চাপা পড়ে. ‘এ্যাডমিরাল মাকারভ’ জাহাজটি তখন মেসিনার বন্দরে নোঙর করে ছিল. রুশী নাবিকরা তত্ক্ষণাত সাহায্যার্থে ছুটে যায়. কৃতজ্ঞ ইতালি রুশী ভাইদের পদকে ভূষিত করে, একটি পদক পেয়েছিল পাভেল. রাজকুমারীর চোখে সে ছিল মহানায়ক. পাভেল ভোরোনভকে সবাই পছন্দ করতোঃ সে জার দ্বিতীয় নিকোলাইয়ের জুটি ছিল টেনিস খেলায়, বড় রাজকুমারীদের সে ছিল নৃত্যসঙ্গী. ধীরেধীরে লেফটেন্যান্ট সম্রাটের পরিবারের ঘটনাবলীর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠলো.

রাজকুমারী ও জাহাজের অফিসারদের মধ্যে হাল্কাগোছের ফ্লার্টে আপত্তি ছিল না, তবে তার গন্ডি বাঁধা ছিল. কিন্তু রাজকুমারী ও দুঃসাহসী লেফটেন্যান্ট পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে উঠলো. নাচের সময় পাভেল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওলগাকে আমন্ত্রণ জানাতো, প্রতিটি সাক্ষাত্কারে তার উচ্ছ্বাস গোপন করতো না. পরিবারের ও রাজদরবারের লোকেরা খেয়াল করেছিল, যে রাজকুমারী ওলগার ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে বিলাসবহুল জাহাজে আয়োজিত বলনাচের আসরে ওলগা বারবার সোচ্ছ্বাসে পাভেলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল নাচের সঙ্গী হওয়ার জন্য.

ডায়েরী পড়ে বোঝা যায়, যে পাভেলের প্রতি ওলগার আকর্ষণ দ্রুত প্রিয়তমকে ঘনঘন দেখার, সবসময় তার সান্নিধ্যে থাকার তাগিদে পরিণত হচ্ছে. কিন্তু উভয়েই, বিশেষ করে ভোরোনভ বুঝতে পারছিল অবস্থা কতখানি বেগতিক. গুরুতররকম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সম্রাজ্ঞী আলেক্সান্দ্রা অন্ধগলি থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন. ভোরোনভকে বুঝিয়ে দেওয়া হল, যে তার বিয়ে করা দরকার, হাই সোসাইটির একটি সুন্দরী মেয়েকে কনে হিসাবে প্রস্তাব করা হল. ভোরোনভের বিবাহে স্বয়ং জার সপরিবারে এসেছিলেন. ওলগাও সেখানে উপস্থিত ছিল এবং বিবাহের পরে নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানালো. নিজের পরম নৈরাশ্য সে ব্যক্ত করতো শুধু তার ডায়েরীর পাতায়. তার জীবনের সেরা অধ্যায়টির যবনিকা পাত হল.

রাশিয়ার জন্য শুরু হল কঠিন সময়, শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ. নিজের লেফটেন্যান্টকে নিরন্তর ভালোবেসে যাওয়া ওলগা ঈশ্বরের কাছে শুধু প্রার্থনা করতো, যাতে পাভেল অন্ততঃ জীবিত থাকে. জারের অন্যান্য কন্যাদের মতোই নিজে ওলগা যুদ্ধের সময় নার্সের কাজ করতো, হাসপাতালে আহতদের সেবাশুশ্রুষা করতো.

কিন্তু দুঃসময় চলতেই থাকলো. ১৯১৭ সালে শুরু হল বিপ্লব, যা রাষ্ট্র, রাজতন্ত্র – সবকিছু ধ্বংস করে দিল. রাজকুমারী ওলগা ২৩ বছর বয়সে পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে বলশেভিকদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ১৯১৮ সালের ১৬ই জুলাই রাত্রে. ২০০০ সালে বর্বর হত্যালীলার শিকার জার পরিবারের সকল সদস্যকে রুশী অর্থোডক্স গীর্জা সন্তের মর্যাদা দেয়.

পাভেল ভোরোনভ এই গোটা সময়টা অফিসারের মর্যাদা রক্ষা করে গেছে. গৃহযুদ্ধের সময় সে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হোয়াইট আর্মির হয়ে লড়াই করেছিল, আর যখন পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ালো, তখন হোয়াইট আর্মির অবশিষ্টাংশের সঙ্গে ইস্তাম্বুলে দেশান্তরিত হয়. তুরস্ক থেকে পাভেল ভোরোনভ পাড়ি দেয় আমেরিকায়, যেখানে ১৯৬৪ সালে ৭৮ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন. তিনি সমাধিস্থ নিউ-ইয়র্ক স্টেটের জর্ডানভিল গঞ্জে রুশী মঠের সমাধিক্ষেত্রে. তার সমাধির উপর মহান ত্যাগীনি ওলগার আইকন. নিজের রাজকুমারী ওলগার স্মৃতি পাভেল ভোরোনভ আজীবন সযত্নে রক্ষা করেছিলেন.