ইজিপ্টের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের উপরে যে বিপদ ঝুলে রয়েছে, তা এক আচমকা মোড় নিয়েছে. ইজিপ্টের সরকারি তথ্য সংস্থা মেনা জানিয়েছে, দেশ থেকে গামাল আবদেল নাসেরের ব্যক্তিগত জিনিষপত্র ও দলিল নিয়ে চলে যাওয়া আটকানো সম্ভব হয়েছে. দুটি পোস্ট করা পার্সেলের ভিতরে, যাতে ঠিকানা দেওয়া ছিল সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর, তাতে দেখতে পাওয়া গিয়েছে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সামরিক পদক ও তাঁর বহু বিখ্যাত বক্তৃতার পাণ্ডুলিপি. ধান্ধাবাজ লোকরা তাঁর ব্যক্তিগত ক্যামেরা ও প্রায় একশরও উপরে দুস্প্রাপ্য ফোটো নিয়েও একসঙ্গে পালাতে পারত.

ঘটে যাওয়া ঘটনা – স্রেফ একটা অপরাধের ধারা বর্ণনার সাধারণ ঘটনা নয়, এটা আরও একবার সেই বিপদেরই উদাহরণ, যা ইজিপ্টের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের উপরে ঝুলে রয়েছে – এই কথা উল্লেখ করে পর্যবেক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ বলেছেন:

“ইজিপ্টের সালাফিতদের এক নেতা কয়েকদিন আগে গিজার স্ফিংক্স ধ্বংস করার কথা বলেছিল. সে বলেছে – যখন আমরা তালিবান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম – আমরা তখন বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করেছি. সে আফগানিস্তানে তালিবান প্রশাসনের সময়ে দুটি দৈত্যাকার বুদ্ধ মূর্তির স্থাপত্য ধ্বংস করার কথাই বলেছে, যা ইউনেস্কো সংস্থার সংরক্ষিত তালিকায় ছিল. এটা ঠিক যে, ইজিপ্টের সালাফিতদের আহ্বান – এটা আপাততঃ শুধু হুমকি. কিন্তু এই হুমকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ – অন্যান্য, ততটা ভাল করে সংরক্ষণ না করা ঐতিহাসিক স্মৃতি সৌধ গুলি ইতিমধ্যেই ধ্বংস করা হয়ে গিয়েছে অথবা তা এই সব চরমপন্থীদের পছন্দ মতো করে বানানো হয়ে গিয়েছে. মানসুর নামের জায়গায় উমম কুলসুম স্মৃতি সৌধ ঢেকে দেওয়া হয়েছে ত্রিপল দিয়ে. মিনিয়া শহরে বদমাশ লোকরা প্রখ্যাত লেখক তাহে হুসেইনের আবক্ষ মূর্তি চুরি করে নিয়ে গিয়েছে. অনেকে মনে করেন যে, গত বছরের অগ্নিকাণ্ড, যা কায়রো শহরে ইজিপ্টের ইনস্টিটিউটের ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে, যেখানে দুই লক্ষেরও বেশী বই ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল, তা কোন অঘটন নয়. এই সব আলাদা ঘটনাই একটা নির্দিষ্ট ঘটনার পরম্পরায় গাঁথা হয়ে যাচ্ছে”.

কোন গোপনীয় কথা নয় যে, ইজিপ্টে এখন খুবই সক্রিয়ভাবে নিজেদের ধারণা সেই সব লোকরা তুলে ধরছে, যারা ঐতিহাসিক প্রাসাদ গুলিকে সম্মান করা ব্যাপারকে মনে করে পাপ বলে – তা এমনকি প্রাচীন মসজিদ হলেও – আর তার ওপরে, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হলে তো বটেই. এই সব লোকরা ইজিপ্টের ইতিহাস শুরু করতে চায় এক ফাঁকা পৃষ্ঠা থেকে, তাদের জন্য যেমন তাহে হুসেইন নেই, তেমনই নেই উমম কুলসুম, গামাল আবদেল নাসের. বোধহয়, এই সব ধারণা যারা প্রচার করছে, তারা নিজেরা কোন স্মৃতি সৌধ ভাঙছে না, তারা পাণ্ডুলিপির সংরক্ষণ শালা পুড়িয়ে দিচ্ছে না, আর ইজিপ্ট প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতার জিনিষপত্র চুরি করছে না. কিন্তু তারা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে করা এই সমস্ত রকমের অপরাধের বিষয়ে একটা তত্ত্বগত প্রমাণ খাড়া করতে চাইছে. আর মনে হচ্ছে যে, তারা এই কাণ্ড থেকে পেছনে হঠে যেতে চাইছে না.

এই সমস্যা শুধু আলাদা কোনও গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে নেই, যারা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে আজ অসম্মান করছে. এই সমস্যা যথেষ্ট প্রসারিত, আর তার একটা রাজনৈতিক চরিত্র রয়েছে, - এই রকম মনে করে এই এলাকা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন- রায়েভস্কি বলেছেন:

“বিগত কয়েক বছর ধরে আরব দেশ গুলিতে ও উত্তর আফ্রিকাতে ঘটনা পরম্পরা বহু দেশের জন্যই হয়েছে খুবই গুরুতর রকমের পরিণতির. সেখানে শিল্প ধ্বংস করা হচ্ছে, সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষা নষ্ট হচ্ছে. একটি দৃষ্টান্ত সুলভ উদাহরণ এই রকমের. মুহাম্মেদ ইউসেফ – কায়রোর শহরতলিতে দাখশুর এলাকার পিরামিড কমপ্লেক্সের ডিরেক্টর কয়েকদিন আগে সেখানের পরিস্থিতিকে বলেছেন বিপর্যয়ের কাছাকাছি বলে. তাঁর কথামতো, দাখশুর এলাকার জমিতে আরও অনেক এখনও না উদ্ধার করা বিরল বস্তু রয়েছে, আর একদল গুণ্ডা সেই গুলিকে একেবারে দিনের আলোতেই লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে. এই সব লুঠেরা যারা আসছে, তারা সাধারণ গরীব লোক – যারা স্রেফ রোজগার করতে চায়. কিন্তু তাদের কেউই থামাচ্ছে না. ইউসেফ বলেছেন, বর্তমানের সরকার নিজেদের কোন রকমের কাজ না করা দিয়ে বিশ্ব উত্তরাধিকারের স্মৃতি লুঠ হয়ে যেতে দিচ্ছে. আর এটা করা হচ্ছে মোটেও কাতার রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে নয়, যারা সংস্কৃতির বিষয়ে বর্তমানে নেতৃত্বের দাবী করছে, তার মধ্যে নিজেদের দেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর তৈরী করা দিয়েও করতে চাইছে”.

এটা কোন আলাদা বিষয় নিয়ে আলাদা ব্যক্তির মত বলে তো মনে হচ্ছে না. গত ১০ বছর ধরেই এই এলাকায় প্রভাবের ক্ষেত্র ভাগ করা হচ্ছে. পশ্চিমের শক্তিশালী চাপের কাছে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে তাদের হাতে, যারা এই কদিন আগেও চিল দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারিতে. আর সবচেয়ে উন্নত দেশ গুলি, যারা কয়েকদিন আগেও এখানের প্রভাবশালী ও সম্মানীয় দেশ ইজিপ্ট, সিরিয়া, ইরাক এখন পরিকল্পনা মাফিক ভাবেই নীচে টেনে নামানো হচ্ছে, তা যেমন অর্থনৈতিক ভাবে, তেমনই সাংস্কৃতিক ভাবেও.

কোথাও এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সামরিক শক্তি, কোথাও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক চাপ. এই সবই একসাথে খুবই অপ্রিয় ফল দিয়েছে. নতুন নিকট প্রাচ্য ধীরে হলেও এমন এক এলাকায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে শাসন করছে কুশিক্ষা, আর যেখানে ইতিহাসের প্রতি কোনও শ্রদ্ধা নেই, সংস্কৃতির প্রতিও কোনও সম্মান নেই.