বৃহস্পতিবারে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে আয়োজিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময়ে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিমানে ভারতের আশি বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহকে প্রশ্ন করেছিলেন, যে, তিনি কি ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য যাবেন, যদি দলের নেতৃত্ব থেকে এটা চাওয়া হয় তাহলে. প্রশ্নকর্তা এই প্রশ্নের ভূমিকায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার কথা উত্থাপন করেছেন, যেখানে দেশের নেতারা আরও বেশী বয়সে নেতৃত্ব দিয়েছেন.

মনমোহন সিংহ সরাসরি উত্তর দেওয়া এড়িয়ে গিয়েছেন. তিনি বলেছেন- “এই সবই ধারণা মূলক প্রশ্ন, আমরা সেতু পার হবো তখনই, যখন আমরা সেখানে পৌঁছবো”. আর এই প্রসঙ্গে আরও একবার নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে, ২০১৪ সালেই সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচন হবে, তার আগে নয়.

প্রধানমন্ত্রীর এই সব ঘোষণা ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের জোরালো বক্তব্য ও কাজকর্মের পরিপ্রেক্ষিতেই করা হয়েছে, যারা বলছেন যে, পরিস্থিতি মোটেও এত সহজ নয়, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ দেখতে চেয়েছেন. আর প্রথম প্রশ্ন – ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তরফ থেকে কাকে প্রধান মন্ত্রী পদে এগিয়ে দেওয়া হবে, তা নিয়ে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কয়েকদিন আগে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সরকারি প্রতিনিধি রাশিদ আলভি সাংবাদিকদের কাছে দ্ব্যর্থহীণ ভাষায় জানিয়েছেন যে, “দল শুধু একজনকেই প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে পাচ্ছে, আর তিনি হলেন নেহরু-গান্ধী পরিবারের বংশধর রাহুল গান্ধী”. কিন্তু রাহুলকে নিয়ে সমস্যা শুধু এটাই নয় যে, তিনি নিজেই খুব একটা প্রার্থী হওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে নেই, বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হল যে, একবার, প্রায় এক বছর আগে তিনি দেশের সব থেকে ঘন জনসংখ্যা বিশিষ্ট রাজ্য উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে প্রচারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যে রাজ্যকে তাঁদের পরিবারেরই ঘাঁটি বলে মনে করা হয়ে থাকে. আর সেখানেই একেবারে বিধ্বংসী পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন. আজ, যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা নিয়মিত ভাবেই কমে যাচ্ছে, তখন নতুন পরাজয়ের অর্থ হতে পারে শুধু রাহুলেরই রাজনৈতিক অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া নয়, বরং তাদের সমগ্র পরিবারেরই. আর তাই ভারতের সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা চলছে যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল জোটের প্রার্থী হতে পারেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার”.

প্যারাডক্স এই খানেই যে, নিজের রাজ্যে নীতিশ কুমার ও তাঁর দল জনতা পার্টি (ঐক্যবদ্ধ) শাসন করছে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে জোট বেঁধেই. কিন্তু বিজেপির নেতৃত্বে চলা জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হতে যাওয়া কুমারের কপালে নেই – বিজেপি দলের থেকে সব থেকে সম্ভাব্য মনে হচ্ছে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রার্থী হবেন. তাই নীতিশ কুমারের ইউপিএ জোটে যাওয়া সম্পূর্ণ ভাবেই সম্ভব হতে পারে – তার ওপরে, যদি এর জন্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদের প্রার্থী করা হয়.

এই সবই হচ্ছে ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক দল গুলির সমর্থন হারানোর পরিপ্রেক্ষিতে. গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস. এক সপ্তাহ আগে তাদের পথ ধরেছে দুটি প্রধান তামিল দলের একটি - ডিএমকে.

আপাততঃ ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষে সম্ভব হয়েছে দেশের লোকসভায় নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার, জোটের সদস্য নয় অথচ সেই উত্তর প্রদেশেরই দুটি দলের সমর্থনের জন্য: সমাজবাদী দল ও বহুজন সমাজ দল. কিন্তু বৃহস্পতিবারে সমাজবাদী দলের নেতা মুলায়ম সিংহ যাদব ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের উপরে সমালোচনার বন্যা বইয়ে দিয়েছেন ও ঘোষণা করেছেন যে, ভারতে অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন এই বছরের নভেম্বর মাসেই হবে, আর তাতে জয় হবে তৃতীয় ফ্রন্টের – বোঝাই যাচ্ছে যে, সেটা তৈরী হবে আঞ্চলিক দল গুলির জোটে.

এই সবই শুধু একটাই কথা বলে: বর্তমানের ভারতে বিশেষ করে ওজন অর্জন করছে আঞ্চলিক দল গুলিই, আর আঞ্চলিক নেতারা লক্ষ্য করেছেন খুবই অদ্ভুত সব জোটে প্রবেশ করার জন্য, যাতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ে, তাই বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করেছেন:

“দেখাই যাচ্ছে যে, কোন রকমের তৃতীয় ফ্রন্টের সরকার বেশী দিন টিকবে না, যদি না তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অথবা ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে সমর্থন পায়. তাতে আগেই হোক বা পরেই হোক (খুব সম্ভবতঃ পরের থেকে আগেই হবে) আভ্যন্তরীণ বিরোধ হবেই, কারণ বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের নেতারা চাইবেন সারা দেশের “কেকের” সব থেকে বেশী অংশটাই নিজেদের জন্য কেটে নিতে”.

দেশের নেতৃস্থানীয় দলগুলির জায়গায় কেন্দ্রে আঞ্চলিক দল গুলির উত্থান আরও একটি ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে পারে, যা আরও বেশী বিপজ্জনক প্রবণতার লক্ষণ: ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব মিলিয়ে দেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা হারাচ্ছে, আর এর ফলে ভারত এক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের জায়গায় দুর্বল ভাবে নিয়ন্ত্রিত এক আঞ্চলিক স্বয়ংশাসিত এলাকাগুলির সংযুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, অন্তত তাই মনে করেছেন এই রুশ বিশেষজ্ঞ.