জার প্রথম পাভেলের গোটা জীবনটা ছিল গোলকধাঁধা. এমনকি তার জন্মও রহস্যে মোড়া. রাজসভায় কানাঘুষো করা হতো, যে তিনি নাকি জার তৃতীয় পিটারের সন্তান ছিলেন না, তাঁর জন্ম নাকি হয়েছিল সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনার প্রেমিক কাউন্ট সালতিকোভের ঔরসে. জার পাভেল এই গুজব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং সারাজীবন এতে তাঁর হৃদয় বিদারিত হয়েছে.

পাভেল সিংহাসনে আসীন ছিলেন ১৭৯৬ সাল থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত. সম্রাটের নিজস্ব দেহরক্ষী বাহিনীর অফিসাররা ও সর্বোচ্চস্তরের আমলারা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল. এর পর থেকে পাভেল সম্পর্কে মৌন থাকা হতো অথবা তার দুর্বলতাগুলি, যেমন রগচটাপণা বা খামখেয়ালীপণা নিয়ে উপহাস করা হত. হ্যাঁ, পাভেল অবশ্যই আদর্শ ছিলেন না. কিন্তু বোধহয় অন্য কোনো জার জীবত্কালে বা মৃত্যুর পরে এত পরিহাসের শিকার হননি. দুর্বল শরীরের, খিটখিটে ও সন্দেহপ্রবণ পাভেল ছিলেন সম্রাজ্ঞী মায়ের স্নেহবঞ্চিত. দ্বিতীয় একাতেরিনা একসময় এমনকি পুত্র পাভেলের সিংহাসনে আসীন হওয়ার অধিকার খর্ব করে পৌত্র আলেক্সান্দরকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন. কিন্তু পাভেল শেষপর্যন্ত মায়ের ৩৪-বছরব্যাপী শাসনের পরে সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন. একাতেরিনার শাসনকালকে রাজসভার চাটুকার ঐতিহাসিকরা ‘স্বর্ণযুগ’ বলে অভিহিত করেছিল. বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট জটিল. রাশিয়ার সব সীমান্তে এবং দেশের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি ছিল উত্তেজনাকর, রাজকোষ ছিল শূণ্য. ক্ষমতায় এসে পাভেল কড়াহাতে শৃঙ্খলা স্থাপণ করতে শুরু করেন – যেভাবে তিনি বুঝতেন. একাতেরিনার প্রশ্রয়প্রাপ্ত অভিজাতরা কঠোর জারকে ঘৃণা করতো. পাভেল নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, খোলাখুলি পারিষদদের পাত্তা না দিয়ে. উদ্ধত জার বলতেন – “রাশিয়ায় শুধু সেই মহান, যার সাথে আমি কথা বলি, এবং শুধু যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কথা বলি”.

কিন্তু পাভেলের নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই হত চটজলদি. তিনি কোনো ব্যক্তিকে ঘনিষ্ঠ করে, তাকে দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শন করে, তারপর আচমকা নির্বাসনে বা কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারতেন. বড়মাপের সংস্কারের চিন্তাভাবনা করে, তারপর প্রজাদের ফরাসী গোল টুপি পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার মতো খুচরো ব্যাপারে আদেশ জারি করেছিলেন তিনি. জারের বিদেশনীতিও ছিল খামখেয়ালীঃ এই তিনি ইংরেজদের সাথে জোট বেঁধে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তারপরই হঠাত্ ফরাসীদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের সঙ্গে আঁতাত করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শুরু করলেন. বৃটিশদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জার পাভেল কাজাকদের ৪০টি ব্রিগেড ভারতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন(তাঁর ম়ত্যুর পর কাজাকদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয়). সহজেই বোঝা যায়, যে এরকম শাসকের অসংখ্য শত্রু হয়েছিল আর যেহেতু ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা, তাই প্রজাদের দ্বারা উত্খাত হওয়া জার পাভেলকে ভাঁড় হিসাবে উপস্থাপণ করা হয়েছে আমাদের সামনে.

কিন্তু এই ব্যাঙ্গাত্মক ভাবমূর্তি পাভেলের আসল রুপের থেকে অনেক দূরেঃ তাঁর ছিল সহজাত আভিজাত্যশীল শালীনতা ও সহমর্মীতা. তিনি নিহত সৈনিকদের অনাথ সন্তানদের জন্য স্কুলের পত্তণ করেছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের বিনা পয়সায় জমি দান করতেন. ভূমিদাসদের জমিদারের জন্য সপ্তাহে শুধু তিনদিন কাজ করার আইন জারি করেছিলেন. অভিজাতদের বৈপরীত্যে, সাধারণ মানুষ জার পাভেলকে ভালোবাসতো ও শ্রদ্ধা করতো.

পাভেল আগে থেকেই অনুভব করেছিলেন, যে তাঁর মৃত্যু হবে মর্মন্তুদ. একদিন তিনি তাঁর পত্নীকে এক অদ্ভুত কাহিনী বলেছিলেন. তার সামনে হাজির হয়েছিল নাকি তাঁর প্রপিতামহ মহান জার প্রথম পিটারের ছায়া. হ্যামলেটের পিতার ছায়ার মতোই, ঐ ছায়া পাভেলকে সম্বোধন করে সতর্ক করে দিয়েছিল, যে তাঁর আয়ু আর বেশি দিন নেই. এই কারণে কোনো কোনো রুশী ঐতিহাসিক পাভেলকে অভিহিত করেন ‘রুশী হ্যামলেট’ বলে. শেক্সপীয়রের নাটকের কাহিনী বাস্তবিকই পাভেলের জীবনবৃত্তান্তকে মনে করিয়ে দেয়ঃ তাঁর পিতা জার তৃতীয় পিটার খুন হন তাঁর মা, দ্বিতীয় একাতেরিনার উদ্যোগে, আর সিংহাসনের আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী, তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়.

হ্যামলেটের মতোই অত্যন্ত বিয়োগান্তক ছিল পাভেলের অদৃষ্ট. খুন হওয়ার প্রাক্কালে শয্যাকক্ষে যাওয়ার পথে পাভেল আয়নার সামনে দাঁড়ান. “আশ্চর্য্য, আমি আয়নায় নিজেকে ঘাড়মটকানো অবস্থায় দেখছি” – বলে উঠেছিলেন তিনি. তার কয়েকঘন্টা পরেই পাভেলকে ষড়যন্ত্রকারীরা গলা টিপে খুন করবে তাঁর শয্যাকক্ষে.

পাভেলকে মৃত্যু ছোঁয় তাঁর মিখাইলভ প্রাসাদে. এটাও একটা রহস্যজনক মিল. প্রাসাদটির সিংহদুয়ারের ওপর ব্রোঞ্জ দিয়ে খোদাই করা স্বাগত বাণীতে ৪৭টি অক্ষর ছিল. ঠিক ৮৭ বছরই বেঁচে ছিলেন পাভেল. আর রাশিয়াকে তিনি শাসন করেছিলেন ৪ বছর ৪ মাস ও ৪ দিন ধরে.

পাভেলের মৃত্যুর পরে রাজসভা মিখাইলভ প্রাসাদ ছেড়ে চলে যায়, যেন ওখানে ঘটানো অপরাধকর্মকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে. বর্তমানে রুশী হ্যামলেটের শেষ আশ্রয়নিবাসে অবস্থিত রুশী মিউজিয়ামের সংগ্রহশালা – শিল্পসম্পদের এক অনন্য ভান্ডার.