প্রায় এক সপ্তাহ আগে, যখন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদ শ্রীলঙ্কার প্রশাসনকে সমালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তার পরেও ভারতে এই বিষয়ে উত্তেজনা কিছুতেই কমছে না. নিজের থেকেই এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট কড়া চরিত্রের, কিন্তু, ভারতের নেতৃস্থানীয় তামিল রাজনীতিবিদদের মতে, তা যথেষ্ট কঠোর নয়. তাতে শ্রীলঙ্কায় স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক পাঠানোর কথা নেই, আর এই দেশের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তামিল সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণকে “গণহ্ত্যা” বলে উল্লেখ করা হয় নি, যার জন্য জোর দিয়ে দাবী করেছিল ভারতের তামিল রাজনীতিবিদরা.

ভারতের ক্ষমতাসীন জোটের “ডিএমকে” দলের নেতা এম. কে. করুণানিধি তখন ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দলের জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা. জোট তখন দেশের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে বসেছিল.

এই সপ্তাহের শুরুতে দুটি নেতৃ-স্থানীয় তামিল দল “ডিএমকে” ও “এআইএডিএমকে” ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের কাছে আবেদন করেছিল নভেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো শহরে হতে যাওয়া কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার জন্য.

তামিলনাডু রাজ্যের ক্ষমতাসীন নেত্রী ও সর্ব ভারতীয় পরিসরে বিরোধী “এআইএডিএমকে” দলের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা বিশেষ ধরনের শান্তির বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন. তিনি বাস্তবে শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের তামিলনাডু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই (আগে মাদ্রাজ) শহরে ভারতীয় ক্রিকেটের “প্রিমিয়ার লীগের” খেলায় অংশ নিতে দেবেন না বলে জানিয়েছেন.

মঙ্গলবারে তামিলনাডু রাজ্যের প্রশাসন ভারতের সরকারকে আহ্বান করেছে ১৯৭৪ সালের শ্রীলঙ্কার সঙ্গে হওয়া সামুদ্রিক জলসীমা সংক্রান্ত চুক্তি প্রত্যাহার করে নিতে. এই চুক্তি বলে অংশতঃ, কাচ্চাদীভু দ্বীপ শ্রীলঙ্কার এক্তিয়ারে চলে গিয়েছিল.

আর বুধবারে জয়ললিতা রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে শ্রীলঙ্কার তামিলদের মধ্যে (মনে হচ্ছে, তিনি সব জায়গার তামিল জনতার কথাই মনে করেছেন) স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থির করার জন্যে জনমত গ্রহণের আবেদন করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন ও স্বাধীন ইলম সৃষ্টির কথা বলেছেন.

স্বাধীন তামিল ইলম গঠনের ধারণা ২০০৯ সালেই শ্রীলঙ্কার সরকারি ফৌজ কবর দিয়েছিল, যখন তারা তামিল ইলম স্বাধীনতার টাইগারদের ধ্বংস করেছিল, - এই কথাই মনে করিয়ে দিয়ে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সেই সময় থেকেই শ্রীলঙ্কার উত্তর ও উত্তর পূর্বের যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকা গুলিতে জাতীয় শান্তির প্রয়াস ও স্বাভাবিক জীবনের পুনরুদ্ধারের কাজ খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে করার চেষ্টা হচ্ছে. এই কাজ হচ্ছে খুবই কষ্টের মধ্য দিয়ে, কিন্তু কিছু ফল ইতিমধ্যেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. কেন তামিল রাজনীতিবিদেরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এখনও কষ্ট পাচ্ছে বলে মনে করে তাদের একই রক্তের তামিল ভাইদের জন্য শ্রীলঙ্কায় বিপ্লব করাতে চাইছে, তা বোধগম্য. ভারতে এখন সামনে নির্বাচন, আর প্রত্যেক রাজনৈতিক দলই চাইছে তামিলনাডু রাজ্যের নির্বাচকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে. শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি খারাপ হলে যে, প্রথমে সেখানে সংখ্যালঘু তামিল প্রজাতির লোকরাই যে বেশী কষ্ট পেতে পারেন – সেটা এই সব রাজনীতিবিদদের খুবই কম উদ্বিগ্ন করে.

কিন্তু মোটেও সম্পূর্ণ করে বোঝা যাচ্ছে না, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান. কারণ, তামিল রাজনীতিবিদদের ছুতো অনুসরণ করে চললে, তাঁরা শেষ অবধি দেশের নিরাপত্তার জন্য এক প্রধান প্রতিবেশী দেশ – শ্রীলঙ্কার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান যে নষ্ট করতে পারেন ও সেই দেশ আরও বেশী করেই চিনের রাজনীতির কক্ষপথে যেতে পারে, সেই ঝুঁকিই নিয়ে ফেলবেন”.

ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই ভারতের তামিল রাজনীতিবিদদের একাংশের মধ্যে হিন্দুস্থান উপদ্বীপের অংশ, যেখানে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মানুষরা থাকেন, তা আলাদা করে নিয়ে “দ্রাবিড়স্থান” বানানোর ধারণা খুবই সবল ছিল ও সেখানে শ্রীলঙ্কার এলাকাকেও জুড়ে নেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল. ১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি তামিলনাডু রাজ্যের নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি এই আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে বাতিল করেছিল. আর এখন প্রশ্নের উদয় হয়েছে: এই শ্রীলঙ্কায় আলাদা করে “ইলম” বানানোর দাবী আসলে আরও একটা অন্য প্রচারের সুর ধরার জন্য আলাপ করা হচ্ছে না তো, যা আসলে ভারতেরই একটা অংশ আলাদা করে নেওয়ার জন্য লক্ষ্য করে করা হয়েছে?