গত সপ্তাহের শেষে আমেরিকার ওয়াশিংটন “ফ্রি বেকন” সাইটে প্রকাশিত এক প্রবন্ধ খুবই গুরুতর প্রতিধ্বনি তুলেছে ভারতীয় ও আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে. এই প্রবন্ধে, যার নাম দেওয়া হয়েছে “চিন ও পাকিস্তান পারমানবিক চুক্তি করেছে”, তাতে কথা রয়েছে চিনের রাষ্ট্রীয় পারমানবিক কর্পোরেশন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের চাশমা পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন নতুন রিয়্যাক্টর বসাবে. বারাক ওবামার প্রশাসনের মতে এই চুক্তি বর্তমানে পারমানবিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে থাকা প্রসার রোধ চুক্তি লঙ্ঘণ করেছে.

চাশমা পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে ইতিমধ্যেই দুটি ৩০০ মেগাওয়াট শক্তির রিয়্যাক্টর চালু করা হয়েছে. ২০১৬ সালে পরিকল্পনা করা হয়েছে আরও দুটি রিয়্যাক্টর যোগ করার. তারই মধ্যে বিশ্বের পারমানবিক পদার্থ সরবরাহকারী গোষ্ঠীর চুক্তি অনুযায়ী, যে গোষ্ঠীর সদস্য চিনও, কিন্তু পাকিস্তান নয়, পারমানবিক যন্ত্রপাতি, এমনকি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেও, সেই সব দেশে সরবরাহ করা যেতে পারে না, যারা পারমানবিক অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি. পাকিস্তান এই চুক্তিতে যোগ দেয় নি. ঠিক এই পরিস্থিতিই, সমালোচকদের মতে, পারমানবিক সরবরাহকারী গোষ্ঠীর মধ্যে থাকা বর্তমানের নিয়ম লঙ্ঘণ করেছে.

চিন সরকারি ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার কথা স্বীকার করে নি, কিন্তু এটা করেছে আপাতঃ ভাবে. চিনের পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি প্রতিনিধি হং লেই সোমবারে উল্লেখ করেছেন যে, “চিন এই রিপোর্ট খেয়াল করেছে”, আর যোগ করেছেন যে, “চিন ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা বর্তমানে এই গোষ্ঠীর নিয়ম ভঙ্গ করে নি”.

এই ইতিহাসে কিছু আইনগত সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“চাশমা পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে প্রথম দুটি রিয়্যাক্টর এই গোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ চুক্তি স্বাক্ষরের চেয়ে আরও আগেই তৈরী করা হয়েছিল, আর তাই সেই দুটি এই গোষ্ঠীর গৃহীত নিয়মের মধ্যে পড়ে না. আর বর্তমানে তৈরী হতে যাওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ রিয়্যাক্টর চিনের পক্ষ থেকে দেওয়া যুক্তি অনুযায়ী এই গোষ্ঠীর নিয়মের বাইরেই রাখা হয়েছে, কারণ সেই বিষয়ে চুক্তি প্রথম দুটি রিয়্যাক্টরের চুক্তির সময়েই করা হয়েছিল. চিনের পারমানবিক সরবরাহকারী গোষ্ঠী বিষয়ে সমঝোতা কোনও পুরনো ঘটনাকে আওতায় আনতে পারে না, তাই এর আগে করা অন্য পারমানবিক বিষয়ে চুক্তি এর মধ্যে আসতে পারে না”.

প্রসঙ্গতঃ এই ধরনের স্পর্শকাতর প্রশ্নের ক্ষেত্রে যা প্রায়ই হয়ে থাকে, তা হল আইনের বিষয় গুলি খুব কমই পর্যবেক্ষকদের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয়ে থাকে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই যে ঘটনা, যে চিন – পাকিস্তানের চুক্তির বিষয়ে প্রথম মনোযোগ দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তা শুধু আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থার ভাল কাজ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে না, যত না যেতে পারে সেই বিষয় দিয়ে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের একচেটিয়া অধিকার পারমানবিক অস্ত্র প্রসারের ক্ষেত্রে হারাতে চায় না.

মনে করব: ভারত একই সঙ্গে পারমানবিক অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি আর পারমানবিক সরবরাহ গোষ্ঠীর সদস্য দেশও নয়. কিন্তু এটা জুনিয়র জর্জ বুশের প্রশাসনের জন্য একবিংশ শতকের প্রথম দশকে ভারত সরকারের সঙ্গে পারমানবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য এক গুচ্ছ চুক্তি করার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি, যা সামগ্রিক ভাবে “পারমানবিক কারবার” বলে উল্লেখ করা হয়েছিল.

আর বাস্তবে প্রায় একই সময়ে সেই সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে, তারা রাশিয়ার সহযোগিতায় প্রস্তুত ভারতের পারমানবিক কেন্দ্র কুদানকুলামের রিয়্যাক্টর চালু হওয়ার বিরুদ্ধে প্রবল প্রচার শুরু করেছে. এখানে কথা হচ্ছে রাশিয়াকে ভারত থেকে রাজনৈতিক ভাবে বের করে দেওয়ার জন্য চেষ্টার, আর খুবই নিম্ন মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায়ের, যা নেওয়া হয়েছে ভারতের সম্ভাবনাময় পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের বাজারে জায়গা করার জন্য”.

আর বাস্তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যাপারটা আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে. প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানে নিজেদের খুবই আগ্রাসী ধরনের কাজকর্ম দিয়ে ও প্রায়ই পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত হেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে এবং ইসলামাবাদকে বাধ্য করেছে এশিয়াতে বেজিংয়ের রাজনীতির কক্ষপথে প্রবেশ করতে. আর এবারে নিজেদের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার জায়গায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের খুব পছন্দ হওয়া রাস্তাই নিচ্ছে – রাজনৈতিক ভাবে চাপ সৃষ্টি করা ও হুমকি ও ব্ল্যাকমেল করার ভাষা ব্যবহার করা.

বরিস ভলখোনস্কি আরও একটি বিষয়ের উপরে মনোযোগ দিয়েছেন, তিনি বলেছেন:

“এমনই দাঁড়িয়েছে যে, বর্তমানের বিশ্বে, যাদের এখন বাস্তবিক ভাবেই নিজেদের পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে, সেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ করেছে খুবই দুঃখজনক কুখ্যাত “দ্বিমুখী নীতি”. একটি ক্ষেত্রে তারা আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে দেখছে, আর অন্য ক্ষেত্রে – বিশেষ করে যখন মুসলিম দেশের কথা ওঠে – তখন তারা এমনকি সব থেকে ছোটখাট রকমেরও পারমানবিক অস্ত্র আয়ত্ত করার বিষয়ে ওদের সম্ভাবনা সহ্য করতে পারে না.

তাই বলব যে, এই ধরনের অস্ত্র ইজরায়েলের কাছে থাকলে - এটা স্বাভাবিক. আর ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমানবিক পরিকল্পনা – এটা প্রায় “যুদ্ধের কারণ”. যেন ঐস্লামিক রাষ্ট্রের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আসার অর্থ, তা আল- কায়দা গোষ্ঠীর হাতে সেই ধরনের অস্ত্র আসার থেকে এক পা দূরে”.

বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন, আর এটা সেই দেশের প্রতিনিধিরাই বলছে, যারা পৃথিবীতে একমাত্র বাস্তব যুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে. প্রসঙ্গতঃ, তা বিরোধী পক্ষের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং জাপানের শান্তিপ্রিয় মানুষের দুই শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকির বিরুদ্ধে.