এই সপ্তাহের শুরুতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদ জাপানে এক সরকারি সফরে গিয়েছিলেন আর তিনি সেখানে জাপান – ভারত স্ট্র্যাটেজিক আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন. ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে জাপানে আলোচিত হওয়া একটি প্রশ্নকেই আলাদা করে প্রকাশ করেছে – সামুদ্রিক চলাফেরায় নিরাপত্তা নিয়ে.

“কোন সন্দেহ নেই যে, সেই ধরনের রাষ্ট্র, যেমন ভারতবর্ষ ও জাপান, বিশ্বের জনগনের নিরাপত্তার প্রশ্নে সহযোগিতা করতে বাধ্য, অংশতঃ খোলা সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের প্রশ্নে, যা দু দেশের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বহুল পরিমানে খনিজ তেল ও গ্যাস এই পথে নিয়ে আসা হয়ে থাকে” – বলেছেন ভারতের মন্ত্রী. – “আমাকে স্পষ্ট করেই ঘোষণা করতে দিন যে, ভারতবর্ষ জাপান ও অন্যান্য দেশকে সমর্থন করে থাকে, যারা এই ধরনের মতামতকে সমর্থন করে, এই লক্ষ্য ও কাজকে যারা বাস্তবায়িত করার কাজে অংশ নিয়ে থাকে”.

মনে হতে পারে যে, সবই স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে: সমুদ্রে চলাচলের স্বাধীনতা – আধুনিক বিশ্ব প্রকৃতির একটি ভিত্তিমূলক নীতি, আর মন্ত্রীর বক্তব্য স্রেফ কথার কথা বলেই ধরা যেতে পারত. কিন্তু সব কিছু এত সহজ নয় বলে উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

“সব মিলিয়ে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় পরিস্থিতি তীক্ষ্ণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাগুলি উচ্চারিত হয়েছে অংশতঃ, এক দিকে চিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে, আর তাদের দক্ষিণ চিন সাগরের প্রতিবেশীদের এবং তাদের মধ্যে জাপানের পরিপ্রেক্ষিতে.

এই পরিস্থিতি আজকের দিনে বোধহয় বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সর্বাধিক তীক্ষ্ণ পরিস্থিতি আর তা আরও গুরুতর ভাবে জটিল হতে চলেছে বলেই মনে হয়, এমনকি সেই সমস্ত পরিস্থিতির চেয়েও, যা বৃহত্ মধ্য প্রাচ্যে হচ্ছে. ব্যাপার হল যে, এখানে একসাথে জড়িয়ে গিয়েছে প্রায় বিশ্বের সমস্ত নেতৃস্থানীয় বৃহত্ রাষ্ট্রের স্বার্থ, তার মধ্যে অর্থনৈতিক ভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের স্বার্থও. আর গত বছরে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল নিজেদের পররাষ্ট্র নীতিতে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দিকে “স্ট্র্যাটেজিক দিক পরিবর্তনের” কথা, তখন থেকেই চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে”.

জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের বিশ্বব্যাপী বিরোধের ক্ষেত্রে তাদের মহা সমুদ্র পারের সহকর্মী দেশের ও বড় ভাইয়ের বিশ্বস্ত সহকর্মীর ভূমিকা পালন করছে. ভারতের বিষয়ে জাপান- আমেরিকা জোট বিশেষ ধরনের পরিকল্পনা করে রেখেছে, তারা চাইছে ভারতকে পশ্চিমের তরফ থেকে চিনের শক্তিশালী বিরোধী শক্তিতে পরিণত করতে, তাই বরিস ভলখোনস্কি আরও বলেছেন:

“ভারতের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ নির্দিষ্ট কিছু স্তর পর্যন্ত এই পথে চলতে পারে. তার ওপরে বিগত বছর গুলিতে নিজেদের “পূর্বের দিকে দেখো” স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী ভারতবর্ষ বেশী করেই নিজেদের মনোযোগ দিয়েছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ গুলির দিকে, অংশতঃ, বৃহত্ ব্যবসায়িক প্রকল্প বাস্তবায়িত করছে দক্ষিণ চিন সাগরে (যেমন, ভিয়েতনামের সঙ্গে), যাদের চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে.

আর যদি মনে করা হয় যে, এই বিরোধ গুলি চিনের পক্ষেই সমাধান করা হচ্ছে, যারা অনেক গুলি দ্বীপের উপরেই দাবী করেছে, যা আজ প্রতিবেশী দেশ গুলি নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে দক্ষিণ চিন সাগর বাস্তবে পরিণত হবে এক আভ্যন্তরীণ জলাশয় হিসাবেই ও কোন রকমের খোলা সমুদ্রের কথা আর এর পরে বলতে হবে না, এই কারণেই ভারতের মন্ত্রীর পক্ষ থেকে “খোলা সমুদ্রে” জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে”.

এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা যেতে পারে ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ভারতীয় একটি জাহাজ, যা ভিয়েতনামে সফরে যাচ্ছিল, তাকে বিতর্কিত জলসীমা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, চিনের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছিল বলে. স্বাভাবিক ভাবেই এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ভারতের স্বার্থের উপযুক্ত নয়.

পূর্ব এশিয়াতে পরিস্থিতি সত্যই এক বিশ্বজোড়া ভূমিকা নিতে চলেছে. চিন প্রাথমিক ভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সক্রিয়ভাবে ভারত মহাসাগরে ঢুকেছে, ভারতকে চার পাশ থেকে এক গুচ্ছ বন্দর ও লক্ষ্য রাখার স্টেশন দিয়ে ঘিরে ধরেছে. আর এটা বাধ্য করেছে ভারতকে চিনের সঙ্গে যারা বিরোধ করছে, সেই সমস্ত দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে.

0আর এখানেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়, যা নিয়ে আপাততঃ, কেউই উত্তর দিতে চাইছে না. বোঝাই যাচ্ছে যে, নিজেদের স্বার্থকে রক্ষা করা – যে কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই প্রাথমিক কর্তব্য. কিন্তু কতদূর পর্যন্ত তৃতীয় দেশ গুলির অন্যদের এলাকায় নাক গলানো উচিত্? কারণ জাপানের এই প্রসঙ্গে স্বার্থ স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে – চিনের সঙ্গে নিজেদের বিরোধের প্রশ্নে ভারতের পক্ষ থেকে সমর্থন পাওয়া. কিন্তু উত্তেজনা বৃদ্ধি করা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যখন পারস্পরিক সহযোগিতার জায়গায় আর এই এলাকায় শান্তির বদলে খোলাখুলি বিরোধ শুরু হতে পারে, যা নতুন করে বড় যুদ্ধে পরিণত হতে পারে.