ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় সঙ্ঘের এক নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র ইতালির জটিল হতে চলা সম্পর্কের প্রশ্ন গত সপ্তাহের শেষে বোধহয় কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে. ইতালি রাজী হয়েছে ভারতে তাদের দেশ থেকে দুই অভিযুক্ত নৌসেনাকে ফিরিয়ে দিতে, যারা ভারতীয় জেলেদের হত্যার জন্য দায়ী.

মনে করিয়ে দিই যে, এই ঘটনা ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কেরালার সামুদ্রিক তীরের থেকে অল্প দূরে হয়েছে গত বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারী. মাস্সিমিলিয়ানো লাতোর্রে ও সালভাতোরে জিরোনে নামের দুই নৌসেনা, যারা ইতালির ট্যাঙ্কার এনরিকে লেক্সি পাহারাদার দলে ছিল, তারা দুই ভারতীয় জেলেকে গুলি করে হত্যা করেছিল. অভিযুক্তরা বলেছে যে, এই জেলেরা খুবই আক্রমণাত্মক ভঙ্গী করেছিল, তাই তারা এদের জলদস্যূ মনে করে হত্যা করেছিল.

তারপর থেকে এই ঘটনার তদন্ত করছে ভারতের অভিশংসক দপ্তর.

ফেব্রুয়ারী মাসের শেষে জামিনের বিনিময়ে ভারতের প্রশাসন এই দুই ইতালীয় ব্যক্তিকে, যারা ভারতের কারাগারে বন্দী ছিল, তাদের নিজেদের দেশে যেতে দিতে রাজী হয়েছিল, যাতে তারা দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে ও ইস্টার পর্বের সময়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে পারে.

কিন্তু ইতালির প্রশাসন এই দুই ব্যক্তিকে ভারতে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিল, আর এই আপত্তি খুবই গুরুতর কূটনৈতিক স্ক্যান্ডালের সূচনা করেছিল. ব্যাপার এমন অবধি এগিয়েছিল যে, ভারত ইতালির রাষ্ট্রদূত দানিয়েলে মানচিনিকে দেশ ছেড়ে যেতে নিষেধ করেছিল আর ও বাস্তবে তাঁকে বিচার ব্যবস্থার আওতায় আনার হুমকি দিয়েছিল.

ফলে গত বৃহস্পতিবারে ইতালি নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেছে আর সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা ইস্টার পর্ব না মিটিয়েই শুক্রবারে ভারতে ফিরে এসেছে, যেমন আগে ঠিক ছিল.

এই ঘটনা পরম্পরায় খুবই ঘন সন্নিবদ্ধ ভাবে রয়েছে রাজনৈতিক ও আইন সম্মত অধিকারের বিষয় গুলি, প্রসঙ্গতঃ, শেষের বিষয়ই বেশী মুখ্য হয়েছে বলে উল্লেখ করে রাশিয়া স্ট্র্যাটেজিক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারত ও ইতালি কিছুতেই একমত হতে পারছে না যে, এই ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটেছিল. ইতালি জোর দিয়ে বলছে যে, এটা হয়েছে নিরপেক্ষ জলসীমায় ও তাই ভারতীয় আইনের আওতায় তা পড়ে না আর তার বিচার করা উচিত্ আন্তর্জাতিক আদালতে. আরও এক গুচ্ছ সূক্ষ্ম বিষয়ও রয়েছে, যা ভিয়েনা কনভেনশন ও কূটনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আইন নিয়ে.

প্রসঙ্গতঃ, এই সব সূক্ষ্ম আইনের বিষয়ও খুবই সহজে ব্যাখ্যা করা যায়, যদি সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, যে এই ক্ষেত্রে আইনের উপরে বৃহত্ রাজনীতিকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে. বর্তমানে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র (তার মানে বিশ্ব রাজনীতির ভর কেন্দ্রও) আরও বেশী করেই এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে. এই পরিস্থিতিতে ইতালি, যারা দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও তীব্র রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে, তারা স্রেফ এশিয়ার একটি সবচেয়ে স্থিতিশীল ভাবে উন্নতিশীল দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ করতে চাইতে পারে না”.

তাই এই নৌসেনাদের ভারতে ফিরে আসার বিষয় (প্রসঙ্গতঃ তাদের যে সময় সীমার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তার আগেই) দেখা হতে পারে এক প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না অথচ মোটেও আশ্চর্য রকমের নয় এমন ভারতীয় কূটনীতির জয় বলে. আপাততঃ ইতালির সরকার চেষ্টা করছে নিজেদের নির্বাচকদের চোখে এই পরাজয়ের প্রভাবকে কিছুটা কম করতে, এই কথা বলে যে, তাদের পক্ষে যেমন ভারতের কাছ থেকে কিছুটা ছাড় আদায় করা সম্ভব হয়েছে – যেমন একটা আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে যে, এই নৌসেনাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হবে না.

কিন্তু বাস্তব বাস্তবই থাকে: “পূর্ব- পশ্চিমের” কথাবার্তায় বড় ও ছোট ভাইয়ের ভূমিকা এবারে পুরোপুরিই পাল্টে যেতে বসেছে, এটা আরও একটা দেখার বিষয় বলে উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের সরকারি মন্তব্য যাঁরা করে থাকেন, তাঁরা এই বিষয়ে কিছু বলছেন না, কিন্তু সক্রিয় ভাবে ব্লগ লেখকরা এটা নিয়ে আলোচনা করছেন. সেই ঘটনা যে, স্ক্যান্ডালে জড়িত রয়েছে ইতালি, তা বক্র ভাবে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মর্যাদার উপরেই আঘাত করেছে. কারণ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী – জন্মসূত্রে ইতালির মেয়ে, আর এর অর্থ হল যে, তাঁর পুত্র রাহুল অর্ধেক ইতালীয়, যাঁকে প্রায় সমস্ত পর্যবেক্ষকই আসন্ন নির্বাচনের পরে সম্ভাব্য দেশের প্রধান হিসাবেই দেখছেন. আর, এটা স্বাভাবিক ভাবেই হতে পারত যে, স্ক্যান্ডাল দীর্ঘায়িত হলে, তা বিরোধী পক্ষের জন্যই সুবিধার হত”.

অন্য দিক থেকে, সমস্ত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পশ্চিমের চোখে সবচেয়ে পছন্দসই সহকর্মী বলেই দেখা হচ্ছে. আর তার মানে হল যে, ইতালির এই ছাড় দেওয়াকে তাদের (আর ইতালির হয়ে সমস্ত পশ্চিম ইউরোপেরই) ভারতে নিজেদের অবস্থান না হারানোর ইচ্ছা বলেই মনে হয়েছে.