রেডিও রাশিয়া!শুরু করছি আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’. এই অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকভা এবং স্টুডিওয় ভাষ্যকার ল্যুদমিলা পাতাকি ও কৌশিক দাস.

এই অনুষ্ঠানে আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর ওপর ভিত্তি করে আমরা রাশিয়া সম্পর্কে পাঠক ও শ্রোতাদের অবহিত করি.

তাই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসে আমাদের শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠানোর রাশিয়া সম্পর্কে. লিখুন, কোন বিষয় সম্পর্কে আপনারা জানতে আগ্রহী.

আজ আমরা নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলির উত্তর দেবঃ

১৫ই ফেব্রুযারী রাশিয়ার উরাল অঞ্চলে উল্কাপাত হয়েছে. এর আগে কখনো রাশিয়ায় এরকম ঘটনা ঘটেছে কি? - জানতে চেয়েছেন ভারতের ছত্তিসগড় রাজ্যের শোনপুর থেকে চুনীলাল কেইভার্ত.

ইউরোপে ও পৃথিবীতে উচ্চতম ভবন কোনটি? – এই প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের ঢাকা থেকে মাহমুদ আলি.

অতএব শুরু করছি চুনীলাল কেইভার্তের প্রশ্নটি দিয়ে, রাশিয়ায় উল্কাপাত সম্পর্কে.

গত ১০৫ বছরের মধ্যে উরালে উল্কার বিস্ফোরণ রাশিয়াতে প্রথম নয়. সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যজনক মহাজাগতিক বস্তুর পতন হয়েছিল ১৯০৮ সালে সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস্ক নদীর ওপর. ওটার নাম দেওয়া হয়েছে তুঙ্গুস্কের ধুমকেতু. কিন্তু বাস্তবিকই সেটা ধুমকেতু ছিল, নাকি অন্য কিছু – তা সঠিক করে কেউ বলতে পারে না. তার উত্স সম্পর্কে শতাধিক বিভিন্ন তত্ত্ব রয়েছে.

বাস্তবে কি ঘটেছিল তখন সেখানে? ১৯০৮ সালের ৩০শে জুন সকালবেলায় একটা আগুনে দেহ মধ্য সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে গেছিল. বহু গ্রামগঞ্জে তা দেখা গেছিল ও বজ্রের মতো শব্দ শোনা গেছিল. দেহটির আকৃতি ছিল গোল বা নলের মতো, রঙ ছিল লাল, হলুদ ও সাদা. উড়ান শেষ হয়েছিল মাটি থেকে ৭-৮ কিলোমিটার ওপরে জনশূণ্য প্রান্তরে, জঙ্গলে বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে. আধুনিক বিজ্ঞানীরা তার শক্তি হিসাব করেছেন এবং তা সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমার সমান ছিল. সারা পৃথিবী জুড়ে ভূমিকম্প মাপক সব কেন্দ্রে ঐ বিস্ফোরণের তরঙ্গ ধরা পড়েছিল, এমনকি পশ্চিম গোলার্ধে পর্যন্ত.

বিস্ফোরণের মুলকেন্দ্র থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে বাড়িঘরে জানালার কাঁচ চুরমার হয়েছিল এবং প্রায় ২০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়েছিল. প্রথম গবেষকরা তুঙ্গুস্ক নদীর তীরে পৌঁছে বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন, যে বিস্ফোরণের মুলকেন্দ্রের নীচে কিন্তু গাছপালা উপড়ে যায়নি. তাদের কান্ডগুলি খাড়া ছিল.

আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার এই, যে বিস্ফোরণের তিনদিন আগে রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে এক ব্যাখ্যাতীত প্রাকৃতিক ঘটনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল. রাশিয়ায় লক্ষ্য করা গেছিল সূর্যের চারিপাশে রুপালি মেঘ ও জ্বলজ্বলে ঔজ্বল্য. বৃটেনের জোতির্বিদ উইলিয়াম ডেনিং লিখেছিলেন, যে ৩০শে জুন বৃস্টল শহরের আকাশ এতটাই উজ্বল হয়ে উঠেছিল, যে নক্ষত্রদের দেখাই যাচ্ছিল না, আকাশের উত্তরাংশের রঙ হয়েছিল লাল আর পূর্বাংশের – সবুজ.

প্রথম গবেষনামুলক অভিযাত্রীদল তুঙ্গুস্কে গেছিল ১৩ বছর পরে – ১৯২১ সালে. তার আগে প্রাকৃতিক ঘটনাটি অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়নি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রাশিয়ায় বিপ্লবের কারণে. ১৯২৭ সাল থেকে ভূতত্ত্ববিদ লেওনিদ কুলিকের নেতৃত্বে ৬ বার অভিযাত্রীদল ঘটনাস্থলে গেছিল ও ঐ অঞ্চলের ওপর গবেষণা করেছিল. তারা ধুমকেতুর খন্ড খুঁজতো ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা সংগ্রহ করতো. ১৯৪১ সালের জন্য নির্ধারিত অভিযান বাস্তবায়িত হয়নি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দরুন. মাতৃভূমি রক্ষার্থে যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন ভূতত্ত্ববিদ কুলিক. তাঁর জীবত্কালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী থেকে জানা যায়, যে তারা মহাজাগতিক বস্তুর কোনো খন্ড আবিস্কার করতে পারেননি.

যুদ্ধের পরে তুঙ্গুস্ক অঞ্চলে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রীদল গেছিল. সেখানে তারা খুঁজে পেয়েছিল গলে যাওয়া ধাতব বলের মতো কয়েকটি দেহ, যার মধ্যে পৃথিবীতে বিরল, যেমন ইরিডিয়ামের মতো ধাতু ছিল. উপরন্তু তারা আবিস্কার করেছিল, যে বিস্ফোরণের এলাকার মাটিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি.

কোনো কোনো গবেষক ১৯০৮ সালে তুঙ্গুস্কের আকাশে গ্রহান্তরের মহাকাশযান ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা বাদ দেন না. এই অনুমান প্রথম প্রকাশ করেছিলেন প্রখ্যাত সোভিয়েত কল্পকাহিনী লেখক আলেক্সান্দর কাজানতসেভ সেই ১৯৪৫ সালে. তিনি তুঙ্গুস্কের আকাশে বিস্ফোরণের তুলনা করেছিলেন হিরোসিমার আকাশে আনবিক বোমা বিস্ফোরণের সাথে. হিরোসিমায়ও বিস্ফোরণের মুলকেন্দ্রের ঠিক নীচে অবস্থিত বাড়িঘরগুলির ক্ষয়ক্ষতি তুলনামুলকভাবে অনেক কম হয়েছিল. কল্পকাহিনী লেখকের ধারনা হয়েছিল, যে তুঙ্গুস্কে বিস্ফারিত হয়েছিল গ্রহান্তরের জীবদের মহাকাশযান, যাতে ছিল আনবিক জ্বালানী. সেই সময়ের অনুপাতে এই ধারনা ছিল বড্ড বেশি দুঃসাহসী, তার কড়া সমালোচনা করা হয়েছিল, কিন্তু ভুলে যাওয়া হয়নি.

এই ধারনা বাতিল করেননি বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সের্গেই কারালোভ, যিনি পৃথিবীতে প্রথম পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ করেছিলেন এবং সেই মহাকাশযান নির্মাণ করেছিলেন, যাতে চড়ে ইউরি গাগারিন প্রথম মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন. ১৯৬০ সালে কারালোভ তুঙ্গুস্ক নদী এলাকায় ভাবী মহাকাশচারীদের একটি অভিযাত্রী দল পাঠিয়েছিলেন এবং উল্কা বা ধুমকেতুর খন্ড অথবা গ্রহান্তরের মহাকাশযানের টুকরোর নমুনা সংগ্রহ করে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন. কিন্তু ঐ অভিযাত্রীদলের সদস্য, সুবিদিত মহাকাশচারী গ্রিগোরি গ্রেচকো জানিয়েছেন, যে নির্দেশ পালন তারা করতে পারেননি, কারণ কোনো নমুনাই খুঁজে পাননি.

২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী উরালে উল্কা বা ধুমকেতু পতন প্রমাণ করে দিল, যে পৃথিবীতে মহাজাগতিক বস্তুর পতনের থেকে মানবজাতিকে সুরক্ষা করার সমস্যা অত্যন্ত তীব্র. সবাই মিলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে, কোনো একটা দেশের পক্ষে একা এর সমাধান করা অসম্ভব.

এবার উত্তর দেব বাংলাদেশের ঢাকা থেকে মাহমুদ আলির পাঠানো প্রশ্নের. তিনি জানতে চেয়েছেন ইউরোপের ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভবনটি সম্পর্কে.

ইউরোপের কথা বলতে গেলে জানাই, যে এই মহাদেশে উচ্চতম ভবনটির নাম ‘মার্কারি-সিটি’, যেটি মস্কোয় ‘মস্কো-সিটি’ কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত. ঐ ভবনটি ৭৫ তলাবিশিষ্ট এবং উচ্চতা ৩৩৮ মিটার. এই বহুতল বাড়িটি কমলা রঙের কাঁচ দিয়ে নির্মিত. সেখানে আছে কেতাদুরস্ত সব অফিস, দামী দামী এ্যাপার্টমেন্ট, ফিটনেস ক্লাব, রেস্তোঁরা, লন্ড্রী প্রভৃতি. ঐ বাড়ির ভূগর্ভে গাড়ির গ্যারেজও আছে. ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারীতে সেখানে এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রয় করার কথা ঘোষনা করা হয়. দাম শুরু হয়েছে কমপক্ষে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ১১ হাজার ডলার. তারমানে ছোটোখাটো ৪০ বর্গমিটারের একটি ফ্ল্যাটের দাম পড়বে ৪৪০ হাজার ডলার

আর মার্কারি-সিটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত ইউরোপের উচ্চতম ভবন ছিল লন্ডনের ‘শার্ড লন্ডন ব্রীজ’. তার উচ্চতা ৩১০ মিটার. আর বিশ্বের উচ্চতম ভবন হচ্ছে দুবাইয়ে অবস্থিত ৮২৮ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ‘বুর্জ হালিফা’.

আর আপনারা কি জানতে চান, ইউরোপে ও বিশ্বে সবচেয়ে উঁচু টিভি টাওয়ার কোনটি?

ইউরোপে প্রথম স্থান অধিকার করে মস্কোর ‘ওস্তানকিনা টিভি টাওয়ার’. তার উচ্চতা ৫৪০ মিটার. কিন্তু বিশ্বে তার স্থান চতুর্থ. তার চেয়েও বেশি উঁচু টিভি টাওয়ার রয়েছে জাপানে, চীনে ও কানাডায়.

 

রাশিয়ার আদ্যোপান্ত অনুষ্ঠানটি আজকের মতো এখানেই শেষ করছি. আমরা আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নাবলী সম্বলিত নতুন নতুন চিঠির অপেক্ষায় থাকবো. আমাদের সাইটের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru