রাশিয়াতে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের সভাপতি শী জিনপিনের সরকারি সফরের প্রাক্কালে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি তাঁর কাছে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে উন্নতির সম্ভাবনা কি রকমের ও এই সম্পর্কের প্রভাব বিশ্বের পরিস্থিতিতে কি রকমের তা বলেছেন. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি তথ্য সংস্থা ইতার- তাস কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে একই সঙ্গে ব্রিকস নামক অস্তিত্বের বিষয়েও আলাদা করে বলেছেন – যা তৈরী হয়েছে অর্থনৈতিক ভাবে সবচেয়ে দ্রুত উন্নতিশীল পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে.

এই সাক্ষাত্কারের কিছু বাছাই করা অংশ উপস্থিত করা হচ্ছে.

প্রশ্ন ছিল – ব্রিকস অস্তিত্ব নিজেদের খুবই আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাসের কারণে সামগ্রিক ভাবেই বর্ধিত মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, বিশেষ করে বর্তমানের বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিস্থিতির সময়ে. বর্তমানের ও ভবিষ্যতের জন্য ব্রিকসের সংজ্ঞা কি?

ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তরে বলেছেন – ব্রিকস গোষ্ঠীর দেশ গুলির সাফল্যের পিছনে বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী চরিত্রের কারণ কাজ করছে,. ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি গুলি ইতিমধ্যেই দুই দশক ধরে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় কাজ করছে. এই প্রসঙ্গে ব্রিকস দেশ গুলির বার্ষিক গড় উত্পাদনকে জাতীয় মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতার সামঞ্জস্যের সঙ্গে তুলনা করলে, তা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের চেয়ে শতকরা ২৭ ভাগ বেশী – আর এই ভাগ ক্রমাগতই বৃদ্ধি পাচ্ছে.

ব্রিকস – বহু মেরু বিশিষ্ট বিশ্বের গঠনের একটি প্রধান মৌল. আমাদের দেশ গুলি কোন রকমের শক্তি প্রয়োগ করে রাজনীতি মেনে নিতে চায় না ও অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকেও ক্ষুণ্ণ করতে চায় না. আমাদের আন্তর্জাতিক বাস্তব সমস্যা গুলি নিয়ে একই রকমের প্রতিধ্বনি তোলা পদক্ষেপ রয়েছে – তার মধ্যে, সিরিয়ার সঙ্কট নিয়ে, ইরানের চারপাশ নিয়ে, নিকটপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়েও.

ব্রিকস গোষ্ঠীর অংশীদাররা বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশী করেই ভারসাম্য যুক্ত ও ন্যায় সঙ্গত ব্যবস্থার পক্ষে. তৈরী হতে থাকা বাজারগুলি নিয়ে রাষ্ট্রগুলি আগ্রহী নিজেদের জন্য বিশ্বের অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী, স্থিতিশীল বিকাশের জন্য, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কার সাধনের জন্য, তার ফলপ্রসূতা বৃদ্ধির জন্য. এরই প্রমাণ স্বরূপ – গত বছরে নেওয়া সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, যাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিনিয়োগ উপযুক্ত রসদের পরিমান আরও ৭৫০ কোটি ডলার বাড়িয়ে দেওয়া, যার ফলে দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতি গুলির তহবিলে অংশের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে.

দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল – আসন্ন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসাবে কি ধরনের কাজ রয়েছে ও ব্রিকস গোষ্ঠীর দেশ গুলির কোনও স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য সংক্রান্ত ধারণা কি রয়েছে?

উত্তরে পুতিন বলেছেন – আমরা আশা করছি যে, আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে সেন্ট পিটার্সবার্গের আগামী বৃহত্ কুড়ি দেশের শীর্ষ সম্মেলনে আলোচ্য তালিকার মূল বিষয় গুলিতে আমাদের পদক্ষেপগুলিতে যোগ সাধন করার, বেআইনি ভাবে মাদক উত্পাদন ও তার পাচারের বিরুদ্ধে সহযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধি করার, সাইবার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদী, অপরাধী ও সামরিক চরিত্রের বিপদ গুলিকে মোকাবিলা করার.

রাশিয়া খুবই বড় গুরুত্ব দেয় ব্রিকস গোষ্ঠীর সহকর্মী দেশ গুলির মধ্যে বাণিজ্য – বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে উন্নতির বিষয়ে, নতুন ধরনের বহু পাক্ষিক ব্যবসায়িক প্রকল্প গুলির প্রতি, যাতে আমাদের দেশ গুলির ব্যবসায়িক বৃত্তের লোকরা বেশী করে যোগদান করতে পারেন. এর জন্যই ব্রিকসের ব্যবসায়িক সভার আহ্বান করা হয়েছে, যার সরকারি ভাবে গঠন হওয়ার কথা আমরা পরিকল্পনা করেছি ডারবান শহরে ঘোষণা করার. এই শীর্ষ সম্মেলনের আগে সেখানে একই সঙ্গে হতে চলেছে ব্রিকসের ব্যবসায়িক সম্মেলন, যাতে অংশ নেবেন আমাদের দেশ গুলির নয়শোরও বেশী প্রতিনিধি ব্যবসায়িক মহল থেকেই.

তৃতীয় প্রশ্ন ছিল – ব্রিকস দেশ গুলির ক্ষমতা বর্তমানে শুধু তাদের অর্থনৈতিক রাজনীতিতে যোগ সাধনের প্রশ্নই তোলে নি, বরং আরও তুলেছে ঘনিষ্ঠভাবে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যোগ সাধনের. এর ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা কি, ব্রিকস দেশ গুলির আধুনিক বিশ্বে লক্ষ্য কি হতে চলেছে?

ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর হয়েছে – ব্রিকসের দেশ গুলি লক্ষ্য স্থির করেছে, প্রাথমিক ভাবে, বিশ্ব অর্থনীতিকে এক স্থিতিশীল, নিজেই নিজের ভর রাখতে সক্ষম এমন এক উন্নতির গতিপথে উন্নীত করার, আন্তর্জাতিক আর্থ-বিনিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করার.

একই সঙ্গে, আমরা আমাদের সহকর্মীদের প্রস্তাব করেছি ধীরেধীরে ব্রিকসকে এক আলোচনা-পরামর্শের সম্মেলন থেকে, কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিষয়ে যোগাযোগের মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয়ের মঞ্চ থেকে আন্তর্জাতিক আর্থ-বিনিয়োগ কাঠামোতে পরিণত করার.

ডারবান শহরের শীর্ষ সম্মেলনের জন্য আমাদের সম্মিলিত ভাবে তৈরী করা হচ্ছে এক ঘোষণা, যাতে বিশদ ভাবে আমাদের নীতিগত অবস্থানের কথা বলা থাকবে বিশ্বের বাস্তব আলোচ্য বিষয় সমূহকে নিয়ে, যেমন সিরিয়ার সঙ্কটের প্রশ্ন, আফগানিস্তান, ইরান ও নিকটপ্রাচ্যের সমস্যা গুলি নিয়ে.

আমরা ব্রিকস গোষ্ঠীকে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলির অথবা তাদের সংস্থা গুলির কোন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখছি না – বরং উল্টো, আমরা খোলা রয়েছি সকলের সঙ্গেই আলোচনার জন্য, যারাই এই বিষয়ে আগ্রহী হবেন – বহু মেরু বিশিষ্ট বিশ্বের সামগ্রিক আঙ্গিকে.

চতুর্থ প্রশ্ন ছিল – রাশিয়া ও চিন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও স্ট্র্যাটেজিক সহকর্মী দেশ. আপনি এই ধরনের সহযোগিতার সংজ্ঞা কিভাবে দেখেন, যা শুধু দুই দেশের উন্নতির জন্যই নয়, বরং সমস্ত আধুনিক বিশ্ব সম্পর্ক ও বিশ্ব অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে?

ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর ছিল – রাশিয়া ও চিন – এরা দুই প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদেরও স্থায়ী সদস্য দেশ, বিশ্বের এক একটি বৃহত্তম অর্থনীতিও বটে. তাই আমাদের মধ্যে তৈরী করা স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা যেমন দ্বিপাক্ষিক ক্ষেত্রে, তেমনই বিশ্বের পরিসরে খুবই বড় অর্থ বহন করে.

আজ রাশিয়া- চিনের সম্পর্ক রয়েছে উন্নতির পথে ও তা নিজেদের বহু শতকের ইতিহাসে সবচেয়ে ভাল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে. তাদের একে অপরের প্রতি বিশ্বাসের উচ্চ মাত্রা, একে অপরের স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, জীবনের পক্ষে অপরিহার্য বিষয় গুলিতে সমর্থন, একেবারেই সঠিক সহকর্মী সুলভ সামগ্রিক চরিত্র লক্ষ্য করা উপযুক্ত.

এই দিন গুলিতে রাশিয়াতে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের সভাপতি শী জিনপিনের সরকারি সফর চলছে. সেই বাস্তব ঘটনা যে, চিনের নতুন নেতার প্রথম বিদেশ সফর আমাদের দেশেই হচ্ছে, তা আবার করে প্রমাণ করে দেয় রাশিয়া ও চিনের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার বিশেষ চরিত্রকেই.

এখানে বিশ্ব রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতার কারণ হয়েছে আমাদের বিশ্ব নির্মাণের ভিত্তিমূলক প্রশ্নাবলী ও প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলি নিয়ে অবস্থানের বিষয়ে ঐক্যমত. রাশিয়া ও চিন সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্নগুলি, যেমন – উত্তর আফ্রিকা এবং নিকটপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, কোরিয়ার উপদ্বীপ এলাকার পারমানবিক সমস্যা, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে পরিস্থিতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমাধানের জন্য ভারসাম্য যুক্ত ও বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেওয়া দিয়ে সকলের জন্যই উদাহরণ দেখিয়ে দিয়েছে.