কোন অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে এখনও এক বছরের বেশী দেরী রয়েছে ভারতে সারা দেশ জোড়া লোকসভা নির্বাচনের আর আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাজনৈতিক শক্তি গুলির অবস্থান কি হতে চলেছে, তা বলা বোধহয় সময়ের আগেই হয়ে যাবে. কিন্তু আপাততঃ সমস্ত রকমেরই ভিত্তি রয়েছে বলার যে, বর্তমানের বিরোধী পক্ষ অর্থাত্ ভারতীয় জনতা পার্টি, আর তাদের নেতা – বর্তমানের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সমস্ত রকমের সম্ভাবনাই রয়েছে.

ভারতবর্ষ সাধারণ দেশ নয়, আর সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন সারা বিশ্বের জন্যই কোন পার্থক্য নেই এমন ব্যাপার নয়. আর নরেন্দ্র মোদী চরিত্রটি বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মোটেও একই রকমের অনুভূতির উদ্ভব করে না. গুজরাটে হিন্দু – মুসলমান দাঙ্গার সময় থেকে তার পিছনে খুবই অপ্রিয় এক ছায়া পা টেনে চলেছে. যখন তিনি একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কম করে হলেও কিছুই করেন নি এই মানব নিধন যজ্ঞ বন্ধের জন্য, আর বেশী করে হলে, নিজেই তাতে ইন্ধন জুগিয়েছেন, দুটি বিষয়েই এখনও প্রমাণের অপেক্ষা রয়েছে.

এতদিন অবধি, যতদিন মোদী বহু জনের মতই স্রেফ একজন আঞ্চলিক নেতা ছিলেন, পশ্চিম কোন রকমের বিপদের অপেক্ষা না করেই তাঁকে বয়কট করতে পারত, তাই রাশিয়া স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার মোদীকে তাদের দেশে প্রবেশের ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে. কিন্তু এখন, যখন মোদী প্রধানমন্ত্রীর আসন দখলের জন্য একজন অন্যতম প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন পরিস্থিতি একেবারেই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া সংক্রান্ত সেই “বৃহত্ রাজনীতির” পরিকল্পনাতে ভারতবর্ষকে বিশেষ জায়গা দেওয়া হয়েছে তাদের এক প্রধান “প্রক্সি” বা “বিশ্বস্ত প্রতিনিধির”, যা প্রয়োজন চিনের সঙ্গেই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে. আর যদি ভারতের সরকারের নেতৃত্বে এমন একজন রাজনীতিবিদ উপস্থিত হন, যাঁকে একাধিকবার সমুদ্রপারের সহযোগীর কাছ থেকে বিক্ষুব্ধ হতে হয়েছে, তাহলে এটা খুবই শক্তিশালী আঘাত হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতবর্ষের স্ট্র্যাটেজিক জোটের উপরে.

এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমের দুটি রাজনৈতিক পথ নেওয়ার উপায় রয়েছে: হয় নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতার আসনে বসার পথ বন্ধ করার জন্য সব কিছুই করতে হবে, অথবা অপেক্ষা করে তার সঙ্গেই আবার সম্পর্ক তৈরী করতে হবে. আর এখানে মনে হয়, আপাততঃ পশ্চিমের দেশ গুলির মধ্যে কোন ঐক্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না”.

মার্চ মাসের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবার করে নরেন্দ্র মোদীর তাদের দেশে আসা বন্ধ করেছে. তাঁর কথা ছিল হোয়ার্টন স্কুল অফ দ্য ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া আয়োজিত এক ভারতীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তৃতা করার, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই সম্মেলনের আয়োজকরা তাঁর আমন্ত্রণ পত্র ফিরিয়ে নিয়েছে, আর নরেন্দ্র মোদীকে বাধ্য হতে হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় লোকদের সঙ্গে স্কাইপের মাধ্যমেই আলাপ করতে.

অন্য পথে চলেছে গ্রেট ব্রিটেন. তাদের দেশের রাষ্ট্রদূত জেমস বিভানের গুজরাট সফর ও মোদীর সঙ্গে গত বছরের হেমন্ত কালে দেখা দিয়ে, ঠিক সেই আঞ্চলিক বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে, যখন আরও একবার – পরপর তৃতীয়বার বিজেপি ও মোদীর নিজের বিজয়ের পথে আর কোন কিছুই বাধা দেওয়ার মত ছিল না, নরেন্দ্র মোদীর উপরে কূটনৈতিক বাধা তুলে নেওয়া হয়েছিল. এর পরে পরপর অনেক উচ্চপদস্থ পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিনিধির সঙ্গেই মোদীর দেখা সাক্ষাত্ হয়েছে.

বুধবারে গুজরাট ঘুরে গেলেন গ্রেট ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব হুগো স্যয়ার, যিনি নিজেই এই সফরের নাম দিয়েছেন “একটি যুক্তি সঙ্গত পরবর্তী পদক্ষেপ” বলে, যা তার দেশ থেকে গুজরাট প্রসঙ্গে নেওয়া হয়েছে. এই প্রসঙ্গে তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন সেই বাস্তব ঘটনাকে যে, গুজরাট রাজ্যের নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক মতেই নির্বাচিত হয়েছে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আপাততঃ, বোঝাই যাচ্ছে যে, নরেন্দ্র মোদীর বিদেশী আলোচনা সঙ্গীরা কোন রকমের ঘোষণা থেকে বিরত রয়েছেন, যা ভারতের ভবিষ্যত নেতা হিসাবে মোদীকে স্বীকার করে নেওয়া বলে মনে করা যেতে পারত. তার ওপরে মিস্টার স্যয়ার সেই প্রশ্নই এড়িয়ে গিয়েছেন যে, তিনি মোদীকে গ্রেট ব্রিটেনে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন কি না. কিন্তু সেই সম্ভাবনা নিয়ে যে পশ্চিমে এর মধ্যেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে, তা দেখাই যাচ্ছে”.

বৃহস্পতিবারে নরেন্দ্র মোদী সংবাদ মাধ্যমে আরও একটি প্রসারিত ভাবে আলোকপাত করা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন – তিনি দিল্লীতে “গুগল বিগ টেন্ট অ্যাক্টিভেট সামিটে” “অন লাইন” সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন. এই সম্মেলনের সময়ে নরেন্দ্র মোদী আধুনিক নেতার “ইমেজ” তৈরী করার জন্য আর তিনিও যে সময়ের সঙ্গে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা বোঝানোর জন্য বিশ্বে তথ্য প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সম্ভাবনা নিয়ে অনেক বলেছেন ও এমনকি একটা “ফর্মুলা” পেশ করেছেন “আইটি প্লাস আইটি ইক্যুয়ালস টু আইটি” (ভারতীয় প্রতিভার সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তির যোগ করা হলে তৈরী হবে আগামীর ভারত).

মোদীর নিজের নামের সঙ্গে জোড়া “আগামী কাল” কি আসবে, তা সারা দেশ জোড়া নির্বাচনের পরেই বুঝতে পারা যাবে, আর এটা ভারতের বাকী বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কেও কি রকমের প্রভাব ফেলবে – তা আমরা খুব শীঘ্রই জানতে পারব. অপেক্ষার অল্পই বাকী রয়েছে.