স্মরণাতীত কাল থেকে সব দেশের মানুষ জুয়ো খেলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে. কঠোর নিষেধাজ্ঞা সবসময় কাজ দেয়নি. খেলুড়েরা পাশ কাটিয়ে যেত, খেলার জন্য গোপন সব জায়গায় জড়ো হয়ে.

রাশিয়ায় তাসের আবির্ভাব হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে ইভান দ্য টেরিবলের রাজত্বকালে এবং এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যে চাষীরা এমনকি গীর্জার পাশেও খেলতো.

ধর্মপ্রচারকদের উদ্যোগে তাস দিয়ে জুয়ো খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল. কিন্তু খেলা চলতেই থাকলো রুদ্ধদ্বারের অন্তরালে, যেমন বড়লোকদের বাড়িতে, তেমনই গরীব চাষীদের কুটীরে.

দুশো বছর পরে জুয়ো বেরিয়ে এল অন্তরাল থেকে. আবার জুয়ো খেলা শুরু হল সর্বত্র, ধনী পারিষদরা এমনকি তাদের সব সম্পত্তি বাজি রাখতো. সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনা এতে ইতি টানার জন্য জুয়োকে বেআইনী বলে ঘোষনা করেন. রাশিয়ার প্রজাদের জুয়ো খেলার অপরাধে সুদূরে নির্বাসিত হওয়ার আশংকা ছিল, বিদেশীদের পাততাড়ি গুটিয়ে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হতো. কিন্তু নিজের ও ঘনিষ্ঠ লোকেদের জন্য দ্বিতীয় একাতেরিনা ব্যতিক্রম রেখেছিলেন. সম্রাজ্ঞী তাসের টেবিলে সন্ধ্যা কাটাতে ভালোবাসতেন, পারিষদদের সাথে রাষ্ট্রীয় সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে. নিজের হার তিনি শোধ দিতেন দামী অলঙ্কার দিয়ে. কখনো কখনো সম্রাজ্ঞী ইচ্ছা করে হারতেন তাদের কাছে, যাদের পছন্দ করতেন ও উদার হাতে তাদের দামী দামী অলঙ্কার উপহার দিতেন. অন্য খেলুড়েরা একাতেরিনার নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে প্রবেশনিষিদ্ধ সব ক্লাবে খেলতো. শুধুমাত্র সেন্ট-পিটার্সবার্গেই ৭টা এরকম ক্লাব ছিল. সরকারীভাবে ক্লাবগুলিতে লোকে নাকি সমবেত হতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য, কিন্তু আসলে তারা খেলতো জুয়ো বিশাল অর্থ বাজি রেখে. গৃহস্থ বাড়িঘরেও আগের মতোই জুয়ো খেলা চলতে লাগলো.

একাতেরিনার নাতি জার প্রথম আলেক্সান্দর আরও একবার জুয়া খেলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন. সিংহাসনে আরোহন করে তিনি তাস খেলার উচ্ছেদের আদেশনামা স্বাক্ষর করেছিলেন. “ধূর্ত শিকারীরা এক সন্ধ্যার মধ্যে বড়লোকের অনভিজ্ঞ ছেলেদের নিঃস্ব করে দেয় –এটা বড় অন্যায়” – বলেছিলেন জার. মরিয়া জুয়াড়িদের কারারুদ্ধ হওয়ার ও সব সম্পত্তি খোয়ানোর ভয় ছিল. কিন্তু কোনো লাভ হল না, তাদের এমনকি কারাগারের ভয়ও দমন করতে পারতো না.

আলেক্সান্দরের পরে সিংহাসনে আসীন হলেন প্রথম নিকোলাই. তার রাজত্বকালে জুয়া খেলার এত বাড়াবাড়ি হল, যে বহু অভিজাত পরিবার দেউলিয়া হল. ক্রুদ্ধ জার জুয়াড়িদের সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেওয়ার আদেশ দিলেন. এতেও কোনো কাজ হল না. রাশিয়ার বহু কবি, সাহিত্যিক ছিলেন পাকাপোক্ত জুয়াড়ি. পুশকিন জুয়া খেলতে খুব পছন্দ করতেন, কিন্তু নিয়মিত হারতেন. কখনো কখনো তাকে জুয়ায় হারের ধার শোধ করতে হত পত্নীর গহনা বন্ধক রেখে. লেখক ফেওদর দস্তয়েভস্কি জার্মানীতে একটানা তিনদিন খেলে প্রচুর রোজগার করেছিলেন ও তার সুযোগ ছিল বকেয়া সব ধার মিটিয়ে দেওয়ার. কিন্তু সামলাতে পারলেন না, আবার খেলতে শুরু করলেন এবং সর্বশান্ত হলেন. মন্টে-কার্লোতে খুব উত্সাহ নিয়ে আন্তন চেখভ খেলতেন. তাঁর কপালও ছিল খারাপ. মহান লেখকের উদ্ধৃতি – “মন্টে-কার্লোতে কত রুশী অর্থ খোয়া যায়”.

আর রাশিয়ায় গোপনে খেলা চলতেই থাকলো. সবচেয়ে মর্যাদাজনক জুয়ো খেলার জায়গা ছিল মস্কোর ইংলিশ ক্লাব. সেখানে জড়ো হতো সমাজের উপরমহল, তাই পুলিশ তাদের ঘাঁটাতো না.

জুয়ার নেশা জুয়াড়িদের শুধু কপর্দকশূণ্য করতো না, জীবন হানিও করতো. গত শতাব্দীর সূচনায় ধনী বণিক নিকোলাই তারাসভ মস্কোর এক সুন্দরী যুবতীর প্রেমে আবিষ্ট ছিলেন, কিন্তু তার ছিল অল্পবয়সী প্রেমিক. একবার যুবকটি জুয়ায় হেরে প্রচুর অর্থ খোয়ালো. যুবতীটি তারাসভকে ধার শোধ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ, উপরোধ করলো. কিন্তু তারাসভ প্রতিদ্বন্দীকে সাহায্য করতে রাজি হলেন না. দুর্ভাগা জুয়াড়ি আত্মহত্যা করলো. শোককাতর সুন্দরীও আত্মাহুতি দিল এবং সেই খবর পেয়ে বণিক তারাসভ নিজেকে গুলি করে প্রাণ দিলেন.

শত শত বছর আগেকার মতোই রাশিয়ায় আইনতঃ জুয়ো খেলা নিষিদ্ধ. কিন্তু কে জানে, কত লোক গোপনে জুয়ো খেলে অর্থ, ব্যক্তিগত সম্মান এমনকি জীবনের বিনিময়ে!