দেশের ইতিহাসে প্রথমবার সংবিধান সম্মত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ১৬ই মার্চ পাকিস্তানের পার্লামেন্ট খারিজ হওয়াতে এই ঘটনা, পাকিস্তানের ও লারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল গণতন্ত্রের জয় হয়েছে বলেই. এটাও সত্যি যে, গত ৬৫ বছরের স্বাধীন পাকিস্তানের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথমবার, আর তা আগে কখনও হয় নি: হয় সেই দেশে পার্লামেন্ট সময়ের আগেই বরখাস্ত করা হয়েছিল মন্ত্রীসভাকে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়ার জন্য অথবা –যেটা আরও বেশী বার হয়েছে - সামরিক অভ্যুত্থানের ফল হিসাবেই.

রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির নেতৃত্বে বর্তমানের পাকিস্তানের সরকারের পক্ষে একটা উদাহরণ তৈরী করা সম্ভব হয়েছে. যদিও বিগত পাঁচ বছরে সরকার প্রায়ই দেখিয়েছে যে, তারা বহু সমস্যার সঙ্গেই পেরে উঠছে না, যার ফলে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির ও রাষ্ট্রপতি জারদারির নিজের রেটিং খুবই তীক্ষ্ণ ভাবে নীচে নেমে গিয়েছে.

বুধবারে রাষ্ট্রপতির সরকারি মুখপাত্র নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করেছেন – ১১ই মে. আর তখনই বুঝতে পারা গেল যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিজয় নিয়ে ঘোষণা এখনও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে. সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ে ক্ষমতা চলে আসে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে. তাঁর প্রার্থী কে হবেন, সেটা ঠিক করে পার্লামেন্ট খারিজ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে পদত্যাগ করে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী পক্ষের নেতা. যদি এটা তাঁরা না করতে সক্ষম হন, তবে আরও তিন দিন সময় দেওয়া হয় পার্লামেন্টের পরিষদকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে এই পদে কাকে রাখা হবে, তা নির্বাচন করার. পরিষদের দুই তৃতীয়াংশের কাছ থেকে এই ব্যক্তির যদি সমর্থন না জোটে, তবে শেষ কথা বলে থাকে নির্বাচন কমিশন.

সহমতে আসার প্রথম অধ্যায় কোন পরিণামে পৌঁছে দেয় নি – প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী পক্ষের নেতার পক্ষে এই প্রার্থী পদে কাউকে একসাথে নির্বাচন করা সম্ভব হয় নি. বুধবারে এই প্রশ্ন নিয়ে পার্লামেন্টের পরিষদে আলোচনা করা শুরু হয়েছে, কিন্তু সেখানেও সাফল্যের আশা বেশী কিছু নয়. সুতরাং সব কিছুই সমাধান করতে হবে সেই নির্বাচন কমিশনকেই, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“পরিস্থিতি খুবই অনির্দিষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে. একই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা রাজনৈতিক দল গুলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তারা সমঝোতায় আসার ক্ষমতা রাখে না, আর এটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রকে ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানের চার দেওয়াল থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারে. এটা, সন্দেহ নেই যে, গণতন্ত্রের মজবুত হওয়াতে কোন ভাবেই সহায়তা করে না”.

আর ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের তেহরিক-এ-তালিবান আন্দোলন শান্তি স্থাপন করা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে গিয়েছে ও বিগত কয়েকদিনের মধ্যে হওয়া প্রতিধ্বনি তোলা অন্তর্ঘাত মূলক কাণ্ড কারখানার দায়িত্ব নিয়েছে.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে বিশে, করে জোরালো শুনিয়েছে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফের ঘোষণা, যে তিনি দেশে ২৪শে মার্চ রবিবারে ফিরে আসতে চান. প্রসঙ্গতঃ, তাঁর বিরুদ্ধে একসারি ফৌজদারী মামলা চালু রয়েছে, যেগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হল ২০০৭ সালে বেনজির ভুট্টোর হত্যা প্রসঙ্গে তাঁর যোগ সাজশ নিয়ে. মুশারফ, তখন রাষ্ট্রপতি থাকাকালীণ, তদন্তের মতে এই হত্যা বন্ধ করার জন্য তিনি কিছুই করেন নি, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কি আশা করছেন, তা বলা কঠিন. নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর ও তাঁর দল অল পাকিস্তান মুসলিম লীগের পক্ষে মনে তো হয় না যে, কেন রকমের গুরুত্ব দেওয়ার মতো সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে. কিন্তু হতে পারে যে, তাঁর হিসেব অন্য ব্যাপারে: নিজের গ্রেপ্তার হওয়াতে প্ররোচনা দেওয়া ও রাস্তায় নিজের পক্ষের লোকদের বের করা. পাকিস্তানের সমাজের একদল লোকের জন্য মুশারফের নাম এখনও জড়িত রয়েছে একটা আপেক্ষিক ভাবে স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিক ভাবে ভারসাম্য যুক্ত উন্নতির সময়ের সঙ্গে”.

নিজের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে চাইছেন তেহরিক-এ-ইনসাফ দলের নেতা ইমরান খানও. ২০১১ সালের শেষে তিনি লক্ষ লোকের সমাবেশ জড়ো করতেন ও তাঁকে মনে করা হত যে, পাকিস্তানের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বলে. কিন্তু তারপর থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে – বহু পর্যবেক্ষকই মন্তব্য করেছেন যে, ইমরান খানের শুরু করাটা খুবই তাড়াহুড়ো হয়ে গিয়েছিল.

দেশের ব্যবস্থার মধ্যেই থাকা বিরোধী পক্ষও সক্রিয় হয়েছে. এই সপ্তাহে নওয়াজ শরীফ পাঞ্জাব প্রদেশের সদর শহর লাহোরে খুবই প্রচারিত দ্রুতগতি মেট্রোবাস ব্যবস্থা চালু করার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, এই শহর তাঁর দল ও পরিবারের শহর, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“প্যারাডক্স হলেও, বিভিন্ন রকমের বিরোধী পক্ষের সক্রিয়তা বাড়াতে তা ক্ষমতাসীন পিপলস্ পার্টির লাভই বেশী করছে. এই সব দলই একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে ও লোকের প্রতিবাদী মনোভাবকেই সবাই মিলে খালি ভাগই করছে একই মঞ্চে উপস্থিত হয়ে. তারই মধ্যে পিপলস্ পার্টি বড় শহর গুলিতে সমর্তন হারালেও, তা গ্রামে হারায় নি. সেখানে নিজেদের ইচ্ছা প্রকাশের বিষয়ে দলের পরিকল্পনা কোন ভূমিকা নেয় না, সেখানে বেশী গুরুত্ব পায় স্থানীয় জমির মালিকদের কথাই”.

সুতরাং আগামী দুই মাসে সেই প্রশ্নেরই উত্তর মিলতে চলেছে যে, বিগত পার্লামেন্টের সংবিধান সম্মত মেয়াদ অবধি থেকে শেষ হওয়া ব্যাপারটা পাকিস্তানে কি গণতান্ত্রিক ছিল, নাকি তা এই দেশের প্রচুর উত্থান পতনের ইতিহাসে একটা অধ্যায় মাত্র. অথবা – সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে বিকাশের একটা শুরু মাত্র.